পাটকল শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৬:২৮, মে ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৭, মে ২৩, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীগত মঙ্গলবার (২১ মে ২০১৯) রাতে কয়েকটি টেলিভিশন খবর প্রচার করলো, খুলনায় পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলনে উসকানি দিতে স্থানীয় বিএনপি নেতাকে নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী। তার ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে, এটা শোনাচ্ছে টিভিগুলো। আমিও শুনলাম। বুঝলাম আন্দোলনরত পাটকল শ্রমিকদের তারা আন্দোলন চালিয়ে যেতে টাকা বিলি করেছেন।
ফোনালাপে খুলনার বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু তিন লাখ টাকা বিলিরও হিসাব দেন। নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘খালিশপুরে আমাদের বিএনপি অফিসে বসে তিনটি স্পট—খালিশপুর, খানজাহান আলী থানার দুটি মিল এবং নওয়াপাড়ার দুটি মিল এখানকার মোট পাঁচটি মিলকে ভাগ করে ৯০ হাজার, ৩০ হাজার এবং ৯৫ হাজার করে মোট তিন লাখ টাকা মিটিং করে দিয়ে আসছি।’ রুহুল কবির রিজভী বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। মঞ্জু আরও বললেন, ‘কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কী, এখানে যে মঞ্চ আছে সেটা আওয়ামী লীগের। ওখানে শ্রমিক লীগ লেখা আছে। যার কারণে আমরা মঞ্চের দিকে যাই নাই। দূর থেকে কাজ করি আর আলাদা প্রোগ্রাম করি মূল শহরে। মঞ্চের ওইখানে অ্যালাউ করে না, গেলে বাজে পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।’

জবাবে রিজভী বললেন, ‘আপনারা একটা কন্ট্রিবিউট করেছেন দ্যাটস এনাফ। আপনার সাথে কাল অমিত আর জয়ন্ত থাকবে। আপনি যেখানে যাবেন, ওরা সঙ্গে থাকবে। সব বলে দিবেন আপনি।’

সত্যি কথা বলতে, টিভিওয়ালারা এটাকে উসকানি মনে করলেও আমার কাছে তা মনে হয়নি। একটি রাজনৈতিক দল আন্দোলনকারীদের আন্দোলন চালাতে সহায়তা করছে মনে হচ্ছে। ক্ষমতার খেলায় এটা অস্বাভাবিক নয়। বিরোধী দল শ্রমিক আন্দোলনে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ফায়দা নিতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। কতটা নিজেদের ফায়দা আর কতটা শ্রমিকের জন্য দরদ—বিরোধী দলের অতীত-বর্তমান ভূমিকা দেখে এটা বিচারের দায়িত্ব জনগণের। সরকারের দায়িত্ব আন্দোলনে যেন জানমালের ক্ষতি আর নাশকতা না হয়, সেটা দেখা। দাবি ন্যায্য হলে মেনে নেওয়া।

দেশের সরকারি খাতের ২২টি জুট মিলের ৬০ হাজার শ্রমিক গত দুই সপ্তাহ ধরে ধর্মঘট করে যাচ্ছেন। তাদের দাবি বকেয়া বেতন পরিশোধ করা এবং ২০১৫ সালে ৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা যে পে-স্কেল অনুমোদন করেছিল, সে অনুপাতে বেতন দেওয়া। এ মিলগুলো বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের অধীন। করপোরেশনের কর্মচারী-কর্মকর্তারা ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর অনুমোদিত পে-স্কেলে জুলাই মাস থেকে বেতন পেয়ে আসছেন। তাহলে একই করপোরেশনের শ্রমিকরা সে স্কেলে বেতন পাবেন না কেন! তাদের দাবি যুক্তিসঙ্গত। অথচ তারা থালা-বাসন নিয়ে গত ১৫ দিন ধরে রাস্তা অবরোধ করে ধর্মঘট করছেন, কেউ তাদের দাবি দাওয়ার কথা শুনছেন মনে হচ্ছে না। রমজান মাস চলছে, ক’দিন পর ঈদ। এ বিষয়টা এরই মাঝে সমাধান হওয়া দরকার। ঈদ ঘনিয়ে আসলে উত্তাপ-উত্তেজনা আরও বাড়বে।

আমরা জানি, বিএনপি যখন ক্ষমতায়, তখন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ৩০০ কোটি টাকা ধার নিয়ে গোপনে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের কিনে হঠাৎ করে আদমজী জুট মিলস বন্ধ করে দেন। শ্রমিক নেতারা যেহেতু আগেই কেনাবেচা হয়ে গেছেন, তাই কোনও ধর্মঘট ইত্যাদি হয়নি। ন্যায়-অন্যায়ভাবে পাওনা নির্ধারণ করে শ্রমিকদের বিদায় করে মিল বন্ধ করে দেন।

আদমজীর ঘটনা যখন ঘটে, তখন আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের আসনে। সেদিন কিন্তু আওয়ামী লীগ খালেদা জিয়া সরকারের আদমজী বন্ধ করে দিয়ে ৩০ হাজার শ্রমিককে যেনতেনভাবে বিদায় করে দেওয়ার ঘটনাটিকে সমর্থন করেনি। আওয়ামী লীগ শ্রমিকবান্ধব দল, কিন্তু পাটকল শ্রমিকদের গত ১৫ দিনের ঘটনায় ৬০ হাজার শ্রমিকের ব্যাপারে নির্বাক থাকা তার জন্য সমীচীন হচ্ছে না। আমরা আশা করবো সরকার অচিরেই বিষয়টি সুরাহা করবে।

আমরা জানি জুট মিল ব্যবসা কখনও লাভজনক নয়। পাকিস্তানের সময়ে সরকার ৭২টি জুট মিলকে তাদের এক্সপোর্টের বরাবর বোনাস ভাউচার দিয়ে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিল। যেহেতু জুট মিল সেক্টরে সর্বোচ্চ এমপ্লয়মেন্টের ব্যবস্থা ছিল, সেহেতু এ সেক্টরকে বাঁচানোর প্রয়োজনও ছিল। সরকার কখনও বাণিজ্য করার জন্য নয়। সরকারের কাছে মানুষের কল্যাণই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার। পাকিস্তানের সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আয় ছিল জুট ব্যবসা থেকে। এলাকায় এলাকায় জুটের মোকাম ছিল, জুট বেলিং ইন্ডাস্ট্রিজ ছিল, জুট মিল ছিল- গত ৪৮ বছরে ধীরে ধীরে সব নিঃশেষ হয়ে গেলো। কেউ এ সেক্টরটির পুনরুত্থানের কোনও পরিকল্পনা করলেন না। অথচ ভারতে গত ৫-৭ বছর আগেও বড় বড় বেশ কয়েকটা জুট মিলস হতে দেখেছি। ৬০-৭০ বছরের পুরনো মেশিনারিজ দিয়ে এ মিলগুলোকে লাভজনকভাবে চালানো তো কঠিন হবেই।

নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হলেই যিনি পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী হন তিনি আশ্বাস বাণী শুনিয়ে বলেন, পাটের সুদিন আসতেছে। কিন্তু সুদিন আনার জন্য কাউকেও কাজ করতে দেখলাম না। ক’দিন আগে পত্রিকায় দেখেছি অতলান্ত সাগরে ডুবুরিরা নাকি তলা স্পর্শ করেছিল, সেখানেও নাকি পলিথিন দেখেছে। ভূমধ্যসাগর তো এখন পলিথিন আর প্লাস্টিকের সাগরে পরিণত হয়েছে। পলিথিন আর প্লাস্টিকের অনাচার থেকে বাঁচাতে হলে পাটই হচ্ছে একমাত্র বিকল্প। পাটের সুদিন আসবে তা বুঝি, তবে ততদিন আমাদের পাট আর পাটশিল্প বাঁচবে কিনা, সেটাই প্রশ্ন।

প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো, রমজান চলছে। সামনে ঈদ। এ মজলুম মানুষগুলোর প্রতি যেন সদয় দৃষ্টি দিন। পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী নিজেই একজন শিল্পপতি। ধর্মঘটে যাওয়া শ্রমিকগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিতে এত বিলম্ব করছেন যেন বুঝে আসছে না। মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য নতুন। তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে থাকবে তা তো কখনও সমীচীন হচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এ যাবৎ নাকি পাট সেক্টরে ৭ হাজার কোটি টাকা দিয়েছেন। লোক রাখলে তো বেতন দিতে হবে, লাভ-লোকসান সরকারের ব্যাপার। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চুরি করে শিল্পকে রুগ্‌ণ করে ফেললে শ্রমিকদের করার কী আছে!

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ