সাগর পাড়ি দেওয়ার নিষিদ্ধ নেশা

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৬:৫৬, মে ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১০, মে ২৫, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহউড়োজাহাজে আসন নেওয়ার আরও চল্লিশ মিনিট বাকি। দরজার নম্বর জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কফি হাতে নিয়ে সেদিকেই হাঁটছি। সহযাত্রীরা তখনও কেনাকাটা শেষ করতে পারেননি। নিজেও গিয়ে শুল্কমুক্ত দোকানে ঢু দিয়ে আসলাম। কী কিনবো, কেন কিনবো? সমাধানে পৌঁছাতে না পেরে বেরিয়ে এলাম। হাঁটতে শুরু করি গন্তব্যের দরজার দিকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দরের দাবিদার এখন ইস্তাম্বুলের নতুন বিমানবন্দরটি। কফির দোকান থেকে দীর্ঘ যাত্রাপথ সেই দরজা। যেতে যেতে বাংলাদেশি যাত্রী খুঁজি। এখানে দুবাই, দোহা, মাসকাট, সিংগাপুর এমনকি জেএফ কেনেডি বিমানবন্দরের মতো বাংলা যাত্রী সুলভ নয়। দিনে একটি বিমানের ঢাকার সঙ্গে যাওয়া-আসা থাকায়, বাংলাদেশি যাত্রী পাওয়া যায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। তাও ইউরোপের লাখো যাত্রীর ভিড়ে বাঙালির মুখ খুঁজে পেতে হয়রান হয়। দীর্ঘ চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে দেখি উড়োজাহাজে আসন নেওয়ার আগের শেষ পাসপোর্ট নিরীক্ষার কাজ শুরু হয়ে গেছে। এ-৩ দরজা চলন্ত সিঁড়ির একটু বাম দিকেই। নামতে নামতেই দেখলাম দু’জন ইমিগ্রেশন পুলিশ একজনকে জাপটে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। দু’জনের বন্ধনীর মধ্যে ছটফট করতে থাকা মানুষটি বাংলাদেশি। মুহূর্তেই অনেক দূরে চলে গেলেন তারা। পরক্ষণে আরো দু’জন ইমিগ্রেশন পুলিশের বন্ধনীর মধ্য আরেক বাংলাদেশি। দু’জনই তরুণ। আমি গন্তব্যের দরজার দিকে না গিয়ে দুই তরুণের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে দেখার জন্য সেদিকে পা বাড়াই। ইমিগ্রেশন এলাকায় গিয়ে দুই তরুণকে কোন কক্ষে রাখা হয়েছে বুঝতে পারলাম না। কেউ কোনও তথ্যও দিতে চাচ্ছেন না। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। এর মধ্যে দেখি একজন ভেতরের একটি কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসছেন। মেজাজ মর্জি ভালো না। তারপরও দুই তরুণের কথা জানতে চাইলাম। তিনি কোনও উত্তর না দিয়ে হাঁটতে থাকেন। আমি তার পেছন পেছন হেঁটে নিজের পরিচয় দিই। তিনি আমার দিকে না তাকিয়েই জানালেন, ওই দুই তরুণকে ফিরতি ফ্লাইটে ঢাকা পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দু’জনেরই নকল পাসপোর্ট। তিনি আর কোনও কথা বললেন না। আমি ফিরতে থাকি আমার গন্তব্যের দরজার দিকে। এসে দেখি উড়োজাহাজের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। উড়াল দেওয়ার জন্য উড়োজাহাজ ধীরে ধীরে রানওয়ে ধরে এগিয়ে যাচ্ছে।

ইস্তাম্বুলের নতুন বিমানবন্দরে ২৪ ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে হলো পরের দিনের উড়োজাহাজের জন্য। একই সময়ে যাত্রা। একা থাকায় বিমানবন্দরের আয়েশি হোটেলেও দীর্ঘ সময় সুখের ঘুম হলো না। ঘুরে বেড়াতে থাকি। বাংলাদেশি দুই-একটি পরিবার পেলাম। তারা ইতালি, ইরাকে থাকে। কিন্তু আমার বাচালতা পছন্দ নয় তাদের। কত দিন আছেন, কেমন আছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলেন না। পরের দিন আমি একটু বেশি সচেতন হয়ে সম্ভাব্য দরজার কাছাকাছি আগেই পৌঁছে যাই। যাত্রার তিন ঘণ্টা আগে। আশপাশে বেশ কয়েক বাংলাদেশিকে দেখতে পেলাম। তারা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে আছে। কেউ ইরাক থেকে ফিরছেন, কেউ ইতালি বা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ থেকে ফিরছেন ইস্তাম্বুল হয়ে। একটি দলের কাছে গেলাম। সেখানে তিন জনের বাড়ি নরসিংদী। দু’জনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তারা ফিরছেন ইরাক থেকে। জানতে চাইলাম কতদিন আছেন? একজন বললেন, ‘এই কথা জানতে চাইয়েন না।’ বললাম কেন? তাদের উত্তর, দুই মাসও হয়নি এসেছেন তারা। ফিরছেন কেন? বললেন, ‘ধরা খাইছি। দালাল ধরা দিয়া দিছে।’ জানতে চাই কত দিলেন? তারা জানান, পাঁচ লাখ। বললাম এই টাকা দিয়ে গ্রামে দোকান দিলেও ভালো থাকতেন। ততক্ষণে তারা আমার পরিচয় জেনে গেছেন। আমার ওপর ক্ষোভ ঝেড়ে বললেন, ‘আপনারা কেন টিভিতে পত্রিকায় দালালগো এইসব খবর দেন না। আমরা আইসা ধরা খাই এই খবর দেন?’ আমি বললাম, শুধু কি আমরা? সরকারও যেভাবে চিৎকার করে বলে, তারপরও তো আপনাদের থামানো যায় না। এক ধরা খাওয়ার পর আরেকবার রওনা হন। দেশে বসে কাজ করতে খারাপ লাগে আপনাদের। তারা আমার কাছ থেকে দূরে সরে যান। ইতালিতে পিজ্জা ডেলিভারি করেন এমন একজনের সঙ্গে চা নিতে গিয়ে পরিচয় হলো। তিনি বললেন, প্রায় এগারো বছর আছেন সেখানে। খুব ভালো আছেন এমন বলা যাবে না। কিন্তু গ্রামের মানুষকে বলতে হয় ভালো আছেন। না হলে সম্মান থাকে না। এখানে খারাপ থাকার পরেও গ্রামে দালান তুলতে হয়। ইজ্জত রাখতে। তিনি জানালেন, ইতালি, গ্রিস ঢুকতে গিয়ে বাংলাদেশি কেমন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, প্রাণ হারাচ্ছেন, একেকটি পরিবার কীভাবে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।

উড়োজাহাজে ওঠার ডাক পড়লো। সেদিকে হেঁটে যেতে যেতে দেখি দালাল দ্বারা প্রতারিত হয়ে দেশে ফেরা স্বদেশিদের দীর্ঘ সারি। তাদের কারো কারো পাসপোর্টটিও দালালরা রেখে দিয়েছে। দূতাবাসের দেওয়া বিকল্প ছাড়পত্রের মাধ্যমে দেশে ফিরছেন তারা। বিমানের দরজার কাছে গিয়ে দেখি আগের দিনের সেই দুই তরুণ। ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের ঘিরে আছে। শুনলাম আমাদের উড়োজাহাজেই তাদের তুলে দেওয়া হচ্ছে। কাছে গিয়ে বললাম, একটু যাচাই করে আসবেন না। এতগুলো টাকা। তরুণদের একজন জানালেন, এর আগেও তিনি দু’বার চেষ্টা করেছেন। এবার নিয়ে তিনবার। তার চেষ্টা নাকি অব্যাহত থাকবে। দেশে ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই ভূমধ্যসাগরে লিবিয়া, তিউনিসিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য তিনটি নৌকাডুবির খবর পেলাম পর পর। তাতে আটক ও নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশিরা আছেন বড় সংখ্যায়। সংখ্যা গুনি আর আমার চোখে ওই দুই তরুণের ছবি ভেসে ওঠে।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ