ইসলামি ওয়াজ বিতর্ক

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৫:২৬, মে ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৯, মে ২৮, ২০১৯

মো. জাকির হোসেনসম্প্রতি ওয়াজ মাহফিল নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন ও সুপারিশে আলেমরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, ‘ওয়াজ মাহফিলসহ দিনের দাওয়াত আলেমদের গুরুত্বপূর্ণ কর্ম। এর তদারকির জন্য শীর্ষস্থানীয় আলেমরাই যথেষ্ট।’ প্রশ্ন হলো, ওয়াজের নামে যদি ইসলামকে বিকৃত-বিতর্কিত করা হয়, বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, অন্য ধর্মকে অবজ্ঞা করা হয়, ফিতনা সৃষ্টি করা হয়, সমাজ-রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করা হয়, উগ্রবাদকে উসকে দেওয়া হয়, কারও চরিত্রহনন করা হয়, তখন কি সরকারের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ আছে?
ওয়াজ-মাহফিলের তদারকির জন্য শীর্ষস্থানীয় আলেমরাই যথেষ্ট–এ দাবি কি বাস্তবসম্মত? কারণ ইসলাম ধর্মের ব্যাখ্যার নাম করে আলেম সমাজ এতটাই বিভক্ত হয়ে গিয়েছে, এক উপদলের আরেক উপদলের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা দূরে থাক, তাদের মধ্যে কথাবার্তা, ওঠবোস এমনকি ন্যূনতম সামাজিক সম্পর্কও নেই। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপদলের মধ্যে বৈবাহিক ও আত্মীয়তার সম্পর্কও অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে। এমনকি রক্তের সম্পর্কেও টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে, কিংবা অতি সীমিত হয়ে পড়েছে। এক দল আরেক দলকে কাফের ঘোষণা করছে। ওয়াজের মধ্যে যাচ্ছেতাই ভাষায় এক দলের বক্তা আরেক দলকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন, অশ্রাব্য ভাষায় হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। ‘ইহুদি-নাসারাদের দালাল, জাহান্নামি, ‘নাস্তিক-মুরতাদদের দোসর’, নানাভাবে বিষোদগার করছেন। তাহলে আলেমরা কীভাবে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করবেন?

আমি ওয়াজ-মাহফিলের বিপক্ষে নই। কিন্তু ওয়াজ মাহফিল যেন বল্গাহীন, স্বেচ্ছাচারিতায় পর্যবসিত হয়ে ইসলাম পরিপন্থী না হয়ে পড়ে, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে, জঙ্গিবাদকে উসকে না দেয়, ইসলামের বিষয়ে মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি না করে, সেদিকে সরকারি নজরদারি অস্বীকার করার উপায় নেই।
যেসব কারণে ওয়াজ মাহফিলে সরকারের সতর্ক নজরদারি থাকা জরুরি তা হলো:

এক. এক শ্রেণির বক্তার বয়ানের প্রধান অংশ হয়ে ওঠে কবি, সাহিত্যিক, নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকাদের নিয়ে বিষোদগার, গিবত। গিবত অর্থ বিনা প্রয়োজনে কোনও ব্যক্তির দোষ অন্যের কাছে উল্লেখ করা। রাসুল (স.) গিবতের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘গিবত হলো তোমার ভাইয়ের এমন আচরণ বর্ণনা করা, যা সে অপছন্দ করে।’ (মুসলিম) গিবত কবিরা গুনাহ‌র অন্তর্ভুক্ত। গিবত ব্যভিচার থেকেও ভয়ানক। রাসূল (স.) বলেন, কোন লোক যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। কিন্তু গিবতকারী যার গিবত করেছে সে ক্ষমা না করা পর্যন্ত ক্ষমা পাবে না (বায়হাক্বী)। অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘পরনিন্দাকারী বেহেশতে প্রবেশ করবে না’। (মুসলিম)

রাসুলের (স.) কাছে আয়েশা (রা.) ছাফিইয়ায় (রা.) সমালোচনা করতে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল (স.)! আপনার জন্য ছাফিইয়ার এরকম হওয়াই যথেষ্ট। এর মাধ্যমে তিনি ছাফিইয়ার বেঁটে আকার বোঝাতে চেয়েছিলেন। রাসুল (স.) বললেন, ‘হে আয়েশা! তুমি এমন কথা বললে, যদি তা সাগরের পানির সঙ্গে মেশানো যেতো, তবে তার রঙ তা বদলে দিতো।’ (আবু দাউদ, তিরমিযী, সহিহুল জামে; মিশকাত)।

গিবত মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার শামিল। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন কারও গিবত না করে, তোমাদের কেউ কি চায়, সে তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করবে? তোমরা তো এটাকে ঘৃণাই করে থাকো।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত ১২) গিবত জাহান্নামের শাস্তি ভোগের কারণ। রাসুল (স.) বলেন, ‘মিরাজকালে আমি এমন কিছু লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করলাম, যাদের নখগুলো পিতলের তৈরি, তারা তা দিয়ে তাদের মুখমণ্ডল ও বক্ষগুলোকে ছিন্নভিন্ন করছিল। আমি জিজ্ঞাস করলাম, এরা কারা হে জিবরাইল? তিনি বললেন, এরা তারাই, যারা মানুষের গোশত খেতো (গিবত করতো) এবং তাদের ইজ্জত-আবরু বিনষ্ট করতো।’ (আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ)। অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একদা রাসুলুল্লাহ (স.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘এই দুই কবরবাসীকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে তাদের তেমন বড় কোনও অপরাধে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না (যা পালন করা তাদের পক্ষে কষ্টকর ছিল)। তাদের একজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, গিবত করার কারণে,  অন্যজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে পেশাবের ব্যাপারে অসতর্কতার কারণে (আহমাদ, সহিহ আত-তারগিব)। একজন ইসলামি বক্তা ওয়াজের নামে যখন কবিরা গুনাহ করে, তখন সে কেবল নিজের জন্যই জাহান্নাম ক্রয় করছে না, বরং যারা তার ওয়াজ শুনছেন, তাদেরও বক্তার ওয়াজে প্রভাবিত হয়ে গিবতে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করছে।

দুই. মৃত ব্যক্তিদের নিয়েও এক শ্রেণির বক্তা বিষোদগার করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন সংগীত ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর পর এক বক্তা ওয়াজে বলেছেন, ‘কিছুদিন আগে একজন অলি মইরা গেছে। ওই শয়তান কবরে এখন আপেল খাচ্ছে।’ আরেক বক্তা বলেছেন, ‘কিছু কুলাঙ্গার, যাদের জন্মের ঠিক নেই।’  এদিকে, একজন সংগীতশিল্পী মারা যাওয়ার পর কিছু বক্তা ওয়াজের নামে বিষোদগার, কুৎসা করেছেন। ইসলাম বলে মৃত ব্যক্তির নামে কোনও খারাপ কথা বলা যাবে না। ইসলামে মৃত ব্যক্তির দোষ চর্চা বা তার ওপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেছেন, মৃত ব্যক্তিদের গালমন্দ করো না। কারণ তারা যা করেছে তার প্রতিফল পাওয়ার স্থানে পৌঁছে গেছে (বুখারি)।

তিন. ওয়াজের নামে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে এমনকি ইসলামের এক উপদলের বক্তা আরেক উপদলকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে ওয়াজ করে। তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক কথা বলে উপস্থিত শ্রোতাদের অন্য দলের বিরুদ্ধে উসকে দেয়। এমনকি নাম বিকৃত করে উপহাস করে। জাতি, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব, শাসক-শাসিত—নির্বিশেষে সব মানুষের সম্মান রক্ষায় ইসলাম দিয়েছে এক অভূতপূর্ব সর্বাঙ্গীণ বিধান। আল্লাহ কারও কুৎসা রটানো, পরনিন্দা ও পরচর্চা করা, কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। গোপন দোষ তালাশ করাকে হারাম করেছেন। ইসলামের বিধান অনুযায়ী মান-সম্মান রক্ষার নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা লাভ করা মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। এ অধিকার সম্পর্কে কোরআনে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। সুরা হুজুরাতের ১১ ও ১২নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যকার এক দল যেন আরেক দলকে নিয়ে হাসি-তামাশা বিদ্রূপ না করে। তোমরা একজন অন্যজনকে মন্দ উপাধি দিয়ে ডেকো না। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না। তোমরা অন্যের বিষয়ে অনুমান থেকে দূরে থাকো, কারণ কোনও কোনও ধারণা পাপ। তোমরা একে অন্যের পশ্চাতে নিন্দা (গিবত) করো না। অন্যের দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করো না।’ সুরা হুমাযার ১নং আয়াতে পশ্চাতে পরনিন্দা করা এবং সামনাসামনি দোষারোপ করা ও মন্দ বলাকে মারাত্মক গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে সামনে নিন্দাকারী ও পেছনে গিবতকারী।’ কোরআনের এ আয়াতগুলোর মূল কথা হলো, মানুষকে আল্লাহ আদেশ দিচ্ছেন, মানুষকে ঘৃণা, হেয়জ্ঞান, অবজ্ঞা না করতে, গিবত না করতে, গোপনীয়তার অধিকারে হস্তক্ষেপ না করতে, অপমান না করতে। রাসুলের (স.) হাদিসে ‘মানুষকে তুচ্ছ মনে করাকে অহঙ্কার বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।’ (মুসলিম, তিরমিযী, হাকেম)। কোরআনে উল্লেখ আছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ পাক অহঙ্কারকারীদের পছন্দ করেন না’ (সুরা নাহল, আয়াত ২৩)। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘এমন কোনও ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে শস্যদানা পরিমাণ ইমান থাকবে এবং এমন কোনও ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে শস্যদানা পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে’ (মুসলিম)। পবিত্র কোরআনে কারও মন্দ বিষয় প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে— ‘আল্লাহ কোনও মন্দ বিষয় প্রকাশ করা পছন্দ করেন না। তবে কারও প্রতি জুলুম হয়ে থাকলে সে কথা আলাদা। আল্লাহ শ্রবণকারী, বিজ্ঞ।’ (সুরা নিসা, আয়াত ১৪৮) রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনও মুসলমানের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন।’ (বুখারি) পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অন্য ভাইয়ের দোষত্রুটি গোপন রাখতে বলা হয়েছে আর ওয়াজে বক্তারা তা রসিয়ে রসিয়ে বয়ান করছেন, এটি কি ইসলামসম্মত?
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (স.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সে-ই যার জিহ্বা এবং হাত থেকে সব মুসলমান নিরাপদ থাকে’ (বুখারি)। যিনি ওয়াজের নামে অন্য ভাইয়ের গিবত করছেন, হাসি-তামাশা-বিদ্রূপ করছেন, তিনি কেমন মুসলমান? হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাক। কেননা হিংসা মানুষের ভালো গুণগুলো এমনভাবে ধ্বংস করে দেয়, যেমনিভাবে আগুন শুকনো কাঠ জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দেয়’ (আবু দাউদ, মিশকাত)। ইসলামে নিষেধ থাকার পরও ওয়াজের নামে যদি ঘৃণা-বিদ্বেষ উসকে দেওয়া হয়, সে ওয়াজ প্রচারে বাধা দেওয়া কি অনুচিত হবে?

চার. ওয়াজ এখন বিনোদন হয়ে গেছে। বিনোদনের জন্য শ্রোতাকে আকর্ষণ করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়। বানোয়াট গল্প, তথ্যসূত্র ছাড়া মনগড়া কেচ্ছা কাহিনি,  নাট্যাভিনয় করে লোক হাসানো— ওয়াজ-মাহফিল জমাতে এখন এসবই করে থাকেন অনেক ধর্মীয় বক্তা। ওয়াজ এতটাই হাসি আর বিনোদনপূর্ণ যে, ভিডিওকৃত ওয়াজের ক্যাপশন বা শিরোনামে ‘ফানি ওয়াজ’ ‘হাসির ওয়াজ’, ‘হাসতে হাসতে লুঙ্গি খুলে যাবে’ এসব লেখা থাকে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘ধ্বংস ওই ব্যক্তির জন্য, যে মানুষকে হাসানোর জন্য কথা বলে ও মিথ্যা বলে, তার ধ্বংস অনিবার্য, তার ধ্বংস অনিবার্য’ (তিরমিজি, আবু দাউদ)। অন্য এক হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, ‘আমি যা জানি তোমরা যদি জানতে তাহলে হাসতে কম, কাঁদতে বেশি’ (বুখারী)।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মিথ্যা কথন থেকে দূরে থাক’ (সুরা হজ, আয়াত ৩০)।

পাঁচ. ওয়াজে নতুন ধারা শুরু হয়েছে— হিন্দি ছবি ও বিশেষত টিভি সিরিয়ালের প্রসঙ্গ টানার পাশাপাশি ওয়াজে গান গেয়ে শোনানো। বক্তারা সুর, তাল, লয় হুবহু ঠিক রেখে  বিভিন্না শিল্পীর গান গেয়ে শোনান। এমনকি কোনও কোনও বক্তা হিন্দি গান ‘লাড়কি আঁখ মারে’, এমন গানও গেয়ে শোনান। এই যে গায়কদের গান নকল করা হয়, তার মানে গান মুখস্থ করতে হয়েছে, গান শুনতে হয়েছে বারবার। না হলে কীভাবে গানের কথা মনে রেখে ও সুর, তাল, লয় ঠিক রেখে গাইবে? সিনেমা-টেলিভিশন দেখা, গান শোনা ইসলামে হারাম বলে যিনি ওয়াজ করছেন তিনি নিজেই কিন্তু দেখছেন, শুনছেন, গাইছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা কেন এমন কথা বলো, যা তোমরা নিজেরাই মেনে চলো না? তোমরা যা করো না, তোমাদের তা বলা আল্লাহর কাছে অতিশয় অসন্তোষজনক।’ (সুরা সফ, আয়াত ২-৩)।  হজরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রাসুল (স.) বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে এনে দোজখে নিক্ষেপ করা হবে। এর ফলে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসবে। সে এটা নিয়ে বারবার চক্কর দিতে থাকবে, যেভাবে গাধা চক্রের মধ্যে বারবার ঘুরতে থাকে। দোজখিরা তার চারপাশে জড়ো হয়ে জিজ্ঞাসা করবে, হে (অমুক) লোক! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি কি লোকদের সৎ কাজের আদেশ দিতে না এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকার কথা বলতে না? জবাবে সে বলবে, ‘হ্যাঁ আমি সৎ কাজের আদেশ দিতাম, কিন্তু আমি নিজে তা পালন করতাম না। আমি অন্যদের খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলতাম, কিন্তু আমি নিজে তা মানতাম না,’ (বুখারি ও মুসলিম)। হজরত আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (স.)বলেছেন, মি’রাজের রাতে আমি এমন কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম, যাদের জিহ্বা ও ঠোঁট আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছিল। আমি জিব্রাইলকে (আ.) জিজ্ঞেস করলাম এরা কারা? জিবরাঈল (আ.)বললেন, এরা আপনার উম্মতের পার্থিব স্বার্থপূজারি উপদেশদানকারী, যারা অপরকে সৎ কাজের নির্দেশ দিতো, কিন্তু নিজের খবর রাখতো না’ (কুরতুবী)।

পাঁচ. এক শ্রেণির বক্তা ওয়াজের জন্য আর্থিক রেট নির্ধারণ করেছেন। রীতিমতো রশিদ বই ছাপিয়েছেন। কোরআন বলছে, এমন রেট নির্ধারণের কোনও সুযোগ নেই। নবী-রাসুলরা আল্লাহর নির্দেশে মানুষের কাছে গিয়ে ওয়াজ করেছেন। ওয়াজের ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের মূলনীতি হলো, এজন্য প্রতিদান দাবি করা যাবে না। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে জাতি! আমি তোমাদের কাছে (ওয়াজের) বিনিময় চাচ্ছি না। আমার বিনিময় আমাকে আমার আল্লাহই দেবেন.’ (সুরা হুদ, আয়াত ৫১)।

সূরা ইয়াসিন অনুযায়ীও ওয়াজের বিনিময় মূল্য নির্ধারণের সুযোগ নেই, ‘নবীদের অনুসরণ করো। অনুসরণ করো তাদের যারা তোমাদের কাছে কোনও বিনিময় বা প্রতিদান চান না,’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত ২০-২১)। একইভাবে সুরা সোয়াদ (আয়াত ৮৬), সুরা সাবা (আয়াত ৪৭), সুরা ফুরকান (আয়াত ৫৭), সুরা আনআম  (আয়াত ৯০) ও সুরা শুআ’রা (আয়াত ১০৯)-এ ওয়াজের মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে, ‘বলুন, আমি তোমাদের কাছে কোনও প্রতিদান চাই না।’ রেট নির্ধারণ করে ওয়াজ ইসলামসম্মত কী?

ছয়. ওয়াজে প্রায়ই অন্য ধর্মের বিষয় নিয়ে সমালোচনা করা হয়। অন্য ধর্মের বিষয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। সাম্প্রদায়িকতা উসকে দেওয়া হয়। অথচ আল্লাহ ঈমানের দাবিদার প্রতিটি মুসলিমকে নির্দেশ দিয়েছেন পরমতসহিষ্ণুতা ও পরধর্মের বা মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহর বদলে যাদের ডাকে, তাদের তোমরা কখনো গালি দিয়ো না, নইলে তারাও শত্রুতার কারণে না জেনে আল্লাহকে গালি দেবে, আমি প্রত্যেক জাতির কাছেই তাদের কার্যকলাপ সুশোভনীয় করে রেখেছি, অতপর সবাইকে একদিন তার মালিকের কাছে ফিরে যেতে হবে, তারপর তিনি তাদের বলে দেবেন, তারা দুনিয়ার জীবনে কে কী কাজ করে এসেছে,’ (সূরা আনআম, আয়াত ১০৮)। কোনও মুসলিম যদি কোনও অমুসলিমের প্রতি অন্যায় করে, তবে রোজ কিয়ামতে খোদ রাসুল (স.) তার বিপক্ষে লড়বেন বলে হাদিসে এসেছে। একাধিক সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সাবধান! যদি কোনও মুসলিম কোনও অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে তার অধিকার খর্ব করে, তার ক্ষমতার বাইরে কষ্ট দেয় এবং তার কোনও বস্তু জোরপূর্বক নিয়ে যায়, তাহলে কিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ উত্থাপন করবো,’ (আবু দাউদ)।

সাত. কোনও কোনও বক্তা ওয়াজে নবী, রাসুল, সাহাবিদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা-মশকরা করে থাকেন। এক বক্তা মুসা (আ.) সম্পর্কে বলেন, ‘উনি রেগে গেলে, এই মিয়া চেইত্যা গেলে মাথার চুলগুলা টুপি, পাগড়ি ভেদ করে এরকম (আঙুল সোজা করে ইশারা দিয়ে) খাড়া হইয়া দাঁড়াইয়া যেতো।’ নবীকে মিয়া বলে সম্বোধন করা, মশকরা করা আদবের বরখেলাপ। নবী-রাসুলদের আদব-ইহতিরামের বিষয়ে কোরআন-হাদিসে মানুষকে সাবধান করা হয়েছে। এর অন্যথা হলে আশঙ্কা রয়েছে, সব আমল বিনষ্ট হবে, (সুরা আরাফ, সুরা ফাতহ, সুরা হুজুরাত, সুরা নুর, সুরা আহজাব, সুরা তাওবা, সুরা বাকারা, সুরা নিসা)।

আট. হিকমা প্রয়োগ করে সবচেয়ে সুন্দর কথা দ্বারা দিনের দাওয়াত দিতে বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আপনি মানুষকে দাওয়াত দিন আপনার রবের পথে হিকমত ও উত্তম ওয়াজের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করুন উত্তম পদ্ধতিতে। নিশ্চয়ই আপনার রব, তার পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়েছে, সে সম্বন্ধে তিনি বেশি জানেন এবং কারা সৎপথে আছেন, তাও তিনি ভালোভাবেই জানেন,’ (সুরা নাহল, আয়াত ১২৫)।

অথচ ওয়াজে দাওয়াতের নামে অন্যদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা, গিবত, বিদ্বেষ, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে। এসব কি কোরআন বর্ণিত উত্তম কথা?

নয়. কিছু ওয়াজ মাহফিলে কয়েক কিলোমিটার এলাকায় মাইক লাগিয়ে সারা রাত কিংবা গভীর রাত অবধি ওয়াজ করা হয়। ফলে অসুস্থ, পরীক্ষার্থী, কর্মজীবীদের কষ্টে ফেলা হয়। বাসায় বসে ওয়াক্ত নামাজ ও তাহাজ্জুত নামাজ আদায়কারীর একাগ্রতা নষ্ট করা হয়। ইসলাম যেখানে পশু-পাখির অধিকারের বিষয়েও আমাদের সতর্ক করেছে, সেখানে কোনও অসুস্থ মুসলমান, পরীক্ষার্থীকে কষ্ট দেওয়া, কারও ব্যক্তিগত কাজে ব্যাঘাত ঘটানো, নামাজ আদায়কারীর একাগ্রতা নষ্ট করা কি ইসলামে বৈধ হতে পারে?

রাসুলের (স.) পদাঙ্ক অনুসরণ করে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়া উম্মতের ওপর ফরজ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে একটি দল এমন থাকা উচিত, যারা মানুষকে কল্যাণের প্রতি দাওয়াত দেবে (অর্থাৎ) সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজের নিষেধ করবে,’ (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৪)।

অন্য আয়াতে আছে, ‘আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম যে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানায় এবং সৎকাজ করে। আর বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত?’ (সূরা হা মীম সাজদাহ, আয়াত ৩৩)।

আল্লাহর পথে আহ্বান অবশ্যই কোরআন ও হাদিস অনুসারেই হতে হবে। কোরআন-হাদিসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ওয়াজের ক্ষেত্রে সরকারের নজরদারি ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা আলেম সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা বোঝায় না। বরং ইসলাম ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থেই এমন নজরদারি জরুরি।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

zhossain1965@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ