যানজটমুক্ত শহরের প্রত্যাশায়

Send
বিনয় দত্ত
প্রকাশিত : ১৮:০৭, মে ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১১, মে ২৭, ২০১৯

বিনয় দত্তছোটবেলায় কবিতা পড়েছিলাম  ‘শহর শহর ঢাকা শহর, আজব শহর ঢাকা’। এই শহর আসলেই আজব শহর। এই শহরে যানজটে ধুঁকতে ধুঁকতে আমাদের জীবন যায় কিন্তু এর থেকে উত্তরণের রাস্তা নেই। এই শহরে প্রতিদিন যানজটে থেকে আমাদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়াসহ শারীরিক, মানসিক ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু এ থেকে উত্তরণের উপায় নেই।
গণমাধ্যমের বরাতে বলা যায়, ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী আর এই রাজধানীতে যানজটে অতিষ্ঠ নগরবাসী। দৃশ্যত শহরের অধিক জনসংখ্যা যানজটের কারণ মনে হলেও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার কারণে এই যানজট নিরসন সম্ভব হচ্ছে না।
অব্যবস্থাপনার নমুনা পাওয়া যায় রাস্তায় নামলে।  বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্যমতে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত যানবাহন আছে ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার ৪২২টি। আর বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহনের জন্য চালক লাইসেন্স আছে প্রায় ২৮ লাখ। এরমধ্যে একই লাইসেন্সে মোটরসাইকেল ও অন্য যানবাহনের লাইসেন্সও আছে। এদের বাদ দিলে মোট চালক সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ। অর্থাৎ হিসাব অনুযায়ী ১৮ লাখের বেশি যানবাহন চালাচ্ছেন ‘ভুয়া’ চালকরা।

এই ভুয়া চালকরা কখনোই নিয়ন্ত্রিত বা সুশৃঙ্খলভাবে গাড়ি চালায় না। কারণ, তারা তো গাড়ি চালানোর যে সেই প্রক্রিয়া তার মধ্য দিয়েই যায়নি, তাই তারা খেয়ালখুশি মতো গাড়ি চালায় আর এতে করে প্রতিদিন অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনাসহ মারাত্মক প্রাণহানি হচ্ছে। এই ভুয়া চালকদের নির্ধারিত কোনও স্থান নেই। আজ তারা এই গাড়ি চালাচ্ছে তো কাল অন্য গাড়ি চালাচ্ছে। আজ এই প্রতিষ্ঠানে চালকের চাকরি করছে তো কাল অন্য প্রতিষ্ঠানে চালকের চাকরি করছে। এসব ভুয়া চালক যেহেতু নিয়মতান্ত্রিকভাবে গাড়ি চালায় না, তাই তারা সড়কে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করে রাখে, যার কারণে সড়ক অস্থিতিশীল হয় এবং যানজট তৈরি হয়।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, যানজটের বড় কারণ হলো যত্রতত্র বাস স্টপেজ। গণপরিবহন, বিশেষ করে বাসগুলোর জন্য রাজধানীতে কোনও সুনির্দিষ্ট ও নির্ধারিত বাস স্টপেজ চিহ্নিত নেই। কথাটা একটু পরিষ্কার করে বলি, রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বাস থামার জায়গা নির্ধারিত করে দিলেও গণপরিবহন চালকরা সেই নির্ধারিত স্থানের বাইরেও বাস থামায়। যখনই কোনও যাত্রী হাত দেখাচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে বাস থামিয়ে যাত্রী তুলছে চালকরা। এতে করে একের পর এক গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে অন্য গাড়ির চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, ফলে যানজট তৈরি হচ্ছে।

২.

বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নামবিও’। তারা ‘ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৯’ প্রকাশ করেছে। তাতে যানজটের শহরের তালিকায় প্রথম অবস্থানে আছে রাজধানী ঢাকা। বিশ্বের ২০৭টি শহরের মধ্যে যানজটে শীর্ষে অবস্থান করছি আমরা। যানজটের জন্য ঢাকার স্কোর হচ্ছে ২৯৭ দশমিক ৭৬, যা সর্বোচ্চ।

‘নামবিও’র তথ্য এতটাই সঠিক যে, তাদের পরিসংখ্যান বিবিসি, ফোর্বস, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, টাইম, দ্য ইকোনমিস্ট, বিজনেস ইনসাইডার, চায়না ডেইলি, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এবং দ্য টেলিগ্রাফসহ বিশ্বের খ্যাতনামা সংবাদপত্র ব্যবহার করে থাকে।

পরিসংখ্যান মতে, শুধু যে যানজটের শহর হিসেবে ঢাকা শহরের শীর্ষে অবস্থান তা-ই নয়, সময় অপচয় ও ট্রাফিক অদক্ষতা সূচকেও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা।

অনলাইনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নামবিও’র এই তথ্য অনেকেই মিথ্যা বানোয়াট বলতেই পারেন। ধরে নিলাম এ ধরনের তথ্য মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু দেশের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা কি আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট? তারা প্রতিনিয়ত বলছেন, একমাত্র আমাদের দেশে অবৈজ্ঞানিকভাবে বাসের রুট পারমিট দেওয়া হয়।

যারা এভাবে কোনও কিছু না মেনে বাসের রুট পারমিট দিচ্ছেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, ক্ষতিটা কার হচ্ছে? অবৈজ্ঞানিকভাবে বাসের রুট পারমিট দেওয়ার ফলাফল হলো রাজধানীর বসুন্ধরা গেট এলাকায় সুপ্রভাত বাসের চাপায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার আহম্মেদ চৌধুরীর মৃত্যু। তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর, রাজীব, দিয়াসহ অসংখ্য নাম বলে শেষ করা যাবে না, যারা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, গত চার বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৯ হাজার ৩১৫ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে সড়কে। এরমধ্যে ২০১৮ সালে মারা গেছেন ৭ হাজার ২২১ জন।

একটি রুটে কতগুলো বাস চলাচল করতে পারবে তার হিসাব না করে শুধু বাসের রুট পারমিট দিলে তাতে যে চলাচলের অসুবিধা হচ্ছে এই বিষয়টা বোঝার মতো জ্ঞান আমার ধারণা যারা রুট পারমিট দেন তাদেরও আছে। কিন্তু তারা কেন এইভাবে বিশৃঙ্খলভাবে যত্রতত্র বাসের রুট পারমিট দেন তা আমি বুঝি না।

‘ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বহু মাধ্যমভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্ব’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহ-সভাপতি আকতার মাহমুদ। প্রবন্ধে তিনি বলেন, রাজধানীতে গণপরিবহন চলার উপযোগী সড়কের বেশিরভাগ থাকছে ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে। ৪৪ শতাংশ সড়কে ফুটপাত নেই। ৮০ শতাংশ ফুটপাত রক্ষণাবেক্ষণ নিম্নমানের। সড়কের ৯৫ শতাংশ জায়গায় পারাপারের ব্যবস্থা নেই।

একটি শহরে যখন এত অসুবিধা থাকে সড়কে তখন সেই শহরে যানজট সৃষ্টি হবে না তো কোথায় হবে।

৩.

২০১৭ সালে রাজধানী ঢাকার যানজট নিয়ে বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, ঢাকা মহানগরীতে যানজটে প্রতিদিন ৩৮ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) করা গবেষণায় ‘মিটিগেটিং ট্রাফিক কনজেশন ইন ঢাকা: অ্যাপ্রোপ্রিয়েট পলিটিক্যাল অ্যাজেন্ডা’ (ঢাকার যানজট কমানো: কার্যকর রাজনৈতিক কর্মসূচি) শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এতে বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। গবেষকদের মতে, যদি রাজধানীর যানজট ৬০ শতাংশ কমানো যায়, তাহলে বছরে ২২ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো যাবে।

যদি আমরা এই ৩৭ হাজার কোটি টাকা বাঁচাতে পারতাম তবে আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্রসহ বড় বড় যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ করতে পারতাম। এই ৩৭ হাজার কোটি টাকা বাঁচাতে পারলে আমরা পদ্মা সেতুর মতো আরেকটি বৃহৎ সেতু বানাতে পারতাম। আমার বিশ্বাস যানজট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। শুধু সদিচ্ছা এবং আন্তরিক আগ্রহ দিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলে আমাদের যানজট দূর করা সম্ভব।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

benoydutta.writer@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ