অদৃশ্য ক্ষমতা!

Send
হারুন উর রশীদ
প্রকাশিত : ১৩:২১, মে ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৮, মে ২৮, ২০১৯

হারুন উর রশীদনিখোঁজ হওয়া মানুষের মতো এখন বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমও নিখোঁজ হচ্ছে। আর কারা নিখোঁজ করছেন, কেন করছেন, তাও জানা যাচ্ছে না। যেমন—অনেক নিখোঁজ মানুষকে কারা নিখোঁজ করেছেন, কেন করেছেন তা আমরা জানি না বা জানতে পারছি না।
শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গত ৬-৭ বছরে যারা নিখোঁজ হয়েছেন তাদের ২০ জনের পরিবারের সদস্যরা সমবেত হয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন মানবাধিকার কর্মী এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা। তারা ‘মায়ের ডাক’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন। প্রতিবছরই এক বা একাধিকবার প্রেস ক্লাবে সমবেত হয়ে তারা তাদের নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ জানতে চেয়েছেন। জানতে চেয়েছেন তারা কোথায় কেমন আছেন। 
এবারও মানববন্ধন থেকে সরকারের কাছে একটিই আবেদন জানানো হয়েছে। তারা জানতে চেয়েছেন নিখোঁজদের চূড়ান্ত পরিণতি কী হয়েছে, সরকার তা নিয়ে অন্তত একটা ব্যাখ্যা দিক। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, গত ৭ বছরে ৫-৬শ’ মানুষ নিখোঁজ বা অপহরণের শিকার হয়েছেন। কিন্তু তাদের কারা অপহরণ করেছে, কোথায় নিয়ে গেছে, শেষ পরিণতি কী, তা জানা যাচ্ছে না। কেউ বলতেও পারছেন না। যারা নিখোঁজের পর ফিরে এসেছেন তাদের অনেকের সঙ্গেই সাংবাদিকরা কথা বলেছেন। তারাও তাদের নিখোঁজ বা অপহরণের ব্যাপারে তেমন কোনও তথ্য দিতে পারেননি বা দেননি। কেউ কেউ ফিরে আসার পর চুপচাপ হয়ে গেছেন। এই অবস্থায় কিছু প্রশ্ন তোলা যায়:

১. যারা অপহরণ করছেন তারা কি অদৃশ্য?

২. তাদের কি চেনা বা ধরার কোনও উপায় নেই?

৩. তাদের চিহ্নিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি অক্ষম?

৪. তারা কি অদৃশ্য কোনও ক্ষমতা?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা সব সময়ই প্রকাশ্য। সরকার এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ জনগণের কল্যাণে, ন্যায়বিচারে ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে। ক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে দেখার কোনও সুযোগ নেই। কারণ, গণতান্ত্রিক আদর্শে দেশের মানুষ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটান।

তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অদৃশ্য ক্ষমতা, অদৃশ্য সমাজ ও হাতের কোনও জায়গা নেই। সেখানে যা ঘটে তা জানা যায়। কেন হয়েছে, কারা করেছে, তাও গোপন থাকে না। যদি সেরকম হয়, তাহলে তা গণতন্ত্র ও ন্যায় রাষ্ট্রকে বাধাগ্রস্ত করে।

শুরুতেই বলেছিলাম বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমও নিখোঁজ হতে শুরু করেছে। কিন্তু কারা এটা করছেন তা জানা যাচ্ছে না। কেন করছেন তাও জানা যাচ্ছে না। কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিবর্তনডটকম নামের নিউজ সাইটটিতে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। ওয়েবসাইটটি কারা বন্ধ করলো, কীভাবে বন্ধ করলো এবং কেন বন্ধ করলো তার কোনও জবাব পাওয়া যাচ্ছে না সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। বিটিআরসি বলতে পারছে না। এর আগে দুয়েকটি ঘটনায় আমরা জানতে পেরেছি কারা এবং কেন করেছেন। তা যৌক্তিক ছিল কিনা সেই প্রশ্ন না তুলেও বলা যায়, গোপনে করা হয়নি, যা করা হয়েছে প্রকাশ্যে। কিন্তু এবার সবই গোপন থাকছে!

নিউজ পোর্টালটির অপরাধ জানতে পারলে তাদের জবাবদিহির জায়গাও নিশ্চিত করা যেত। কারণ, যা খুশি তা লেখা বা প্রকাশ করার মানে তো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়। তারা কী করেছে, তাও আমাদের জানা দরকার।

শাস্তি যদি দিতে হয়, তা প্রকাশ্যে স্বচ্ছতার মাধ্যমেই দিতে হবে। আর সংবাদমাধ্যমকে বিচারের আওতায় আনার আইন এবং প্রতিষ্ঠান আছে। অপরাধ না জানিয়ে, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তো শাস্তি দেওয়া যায় না। শাস্তি প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ হতে হবে প্রকাশ্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনও গোপন শাস্তি প্রদানকারী থাকতে পারে না।

তাই রাষ্ট্রের কাছে, সরকারের কাছে আমার আবেদন—ওই নিউজ পোর্টাল কারা বন্ধ করলেন, কেন বন্ধ করলেন, তা খুঁজে বের করে জানানো হোক। তা না হলে আরও কোনও সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্র ও সরকারের অগোচরেই ‘গায়েব’ হয়ে যেতে পারে। নিশ্চয়ই সেটা কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা চাইবে না। 
আগেই বলেছি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রকাশ্য। কোনও গোপন ক্ষমতা থাকে না। থাকে না অদৃশ্য ক্ষমতা। থাকে না অদৃশ্য সমাজ। তাই ওপরের প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে চাই স্বচ্ছতার সঙ্গে।

লেখক: সাংবাদিক
ইমেইল:swapansg@yahoo.com

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ