নুরের ওপর হামলা, অতঃপর

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:৩৪, মে ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৯, মে ২৯, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাদীর্ঘ ২৯ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হয়েছে। ছাত্রলীগের প্রচণ্ড দাপটের মধ্যেও ভিপি পদে একজন প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা, বর্তমানে ‘অছাত্রলীগ’, কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর নির্বাচিত হয়েছেন। এই নির্বাচন নিয়ে কিছু বাম সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়েরই কিছু শিক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন। তবু একটি নির্বাচন হয়েছে, এটাই সান্ত্বনা। ডাকসু নির্বাচন হলেই ছাত্ররাজনীতি একটু ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হবে, নতুন এক বিকাশের পথে অগ্রসর হবে বলে আমরা যারা ভাবছিলাম, তারা আসলে বুঝতে পারিনি এই জগতে অন্ধকার বড় লম্বা সময়ের জন্য এসেছে।
ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের ছাত্রদের নেতা। তিনি সারাদেশের ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করেন না নিশ্চয়ই, কারণ এটি সব ছাত্র সংসদের এপেক্স বডি নয়। কিন্তু নুরুল হক নুর'র নিজস্ব ধারণার মাঝে কিছু ঘাটতি আছে বলেই মনে হয়। বনানীতে এফআর টাওয়ারে আগুন লাগলে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন। সাধারণের ধারণা ছিল তিনি সহমর্মিতার জন্য গিয়েছেন। কিন্তু তার ও তার সহকর্মীদের সেলফিবাজি প্রমাণ করলো তিনি ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হয়ে হিরোইজমের রোমান্টিকতায় ভুগছেন। সেই একই ধারাবাহিকতায় তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া বা সারাদেশ ঘুরছেন কিনা জানা নেই। এটাও জানা নেই, এসব সফরে তার কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা বিরাজনীতিকরণের কোনও অভিলাষ আছে কিনা।

কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও বগুড়ায় ছাত্রলীগ যেভাবে তার ওপর আক্রমণ করেছে সেটি বড় অন্যায়। ডাকসু একটি প্রতিষ্ঠান, তার নির্বাচিত ভিপিকে এভাবে শারীরিক আক্রমণ ছাত্রলীগের প্রান্তিক ক্যাডারদের কর্তৃক ডাকসুকেই আক্রমণ করার মতো, যে প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নিজেও আবার নির্বাচিত জিএস। ডাকসু জিএস ও ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী তার ভিপির ওপর আক্রমণকে যদি এমন নীরবে সয়ে যান, নিবৃত্ত করার চেষ্টা না করেন, তাহলে বলতে হবে তিনি নিজেই ডাকসুকে অপমানিত হতে দিচ্ছেন বারবার। যারা বলছেন, নুরকে মারতে মারতে ছাত্রলীগ ভিপি বানিয়ে দিলো, এখন আরও বড় নেতা বানাবে, তারাও পরোক্ষভাবে এই আক্রমণকে এক ধরনের বৈধতা দিচ্ছেন।

নুরুল হক নুর'র নেতৃত্বাধীন কোটা আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন আছে। সেই সহিংস আন্দোলনের মূল দর্শন ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারগুলোকে হেয় করা। সেই আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমি তখন তীব্রভাবে সেই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছি। কিন্তু সেই আমি,এবং জানি অনেকেই, যেমন লেখক, সাংবাদিক প্রভাষ আমিনসহ যারা কোটা আন্দোলনের ধরন নিয়ে নুরদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তারা ছাত্রলীগের এই আচরণ মেনে নিতে পারছেন না।

যে ছাত্রলীগ নুরকে আক্রমণ করছে, সেই ছাত্রলীগ নিজে কোনও রাজনীতি করছে কিনা, সেটা এক বড় প্রশ্ন। প্রায় এক বছর পর একটি বিশাল আকারের কমিটি করেছে, কিন্তু সংগঠনের ভেতরকার অভ্যন্তরীণ কলহ এখন সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। সংগঠনের ভেতরে শৃঙ্খলা, গণতান্ত্রিকতা, শুদ্ধ রাজনৈতিক আচরণ যে একেবারেই বিলুপ্ত হয়েছে, তার প্রমাণ দেশবাসী দেখে চলেছে। কতটা সহিংসতা হলে পদবঞ্চিতদের ওপর, বিশেষ করে নারী নেত্রীদের ওপর হামলা হতে পারে?

এসব দেখে কেবলই মনে হয় রাজনীতিই কি তাহলে অবাঞ্ছনীয় এখন এদেশে? এদেশে ছাত্ররাজনীতির গৌরবের ইতিহাস আছে। স্বাধীনতার জন্য, স্বৈরাচার হটানোর জন্য, ছাত্ররা পড়াশোনা ফেলে রাস্তায় আইন অমান্য করতে গিয়েছে বারবার। সেটা তো বৃহত্তর রাজনীতির ব্যাপার। এখন কি দেশে সেই বৃহৎ রাজনীতি আছে? ছাত্ররা, বিশেষ করে গত প্রায় তিন দশক ধরে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলে ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা অহেতুক জড়িয়ে পড়ছে অনেক কলহে, কোন্দলে, সন্ত্রাসে। এই সূত্র ধরেই আজ বিতর্কটা উঠেছে– কী হবে ছাত্ররাজনীতি দিয়ে?

ছাত্ররাজনীতি ছিল, থাকবেও। সংবিধান মতে আঠারো বছর বয়স হলেই যেকোনও নাগরিক নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার অর্জন করেন। ভোট দিতে পারলে রাজনীতি সচেতন হয়েই ভোট দেবেন, এটাই প্রত্যাশা। ভোটের অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি মৌলিক সাংবিধানিক অধিকারের স্বীকৃতি অপরিহার্য হয়ে যায়। সেটি হলো সমিতি বা সংগঠন তৈরির অধিকার এবং তার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার অধিকার। সেই নিরিখে সমাজের যেকোনও গোষ্ঠী বা শ্রেণির বেলায় সমাবেশ বা সংগঠন করার যে অধিকার প্রযোজ্য, ছাত্রদের বেলায়ও সেই একই মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার প্রযোজ্য। এখানে অন্য কোনও যুক্তি টেনে আনার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।

ছাত্ররাজনীতি থাকবে। কিন্তু সেটি কী রকম হবে, সেটিই প্রশ্ন। সমাজের অন্যান্য অংশের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সক্রিয়তা অনেকটাই বেশি। সেখানে ছাত্র আন্দোলন হবে, বিভিন্ন একাডেমিক ইস্যুতে ও ক্যাম্পাসের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্র ধর্মঘট হলে, এটা মোটেই বিরল ঘটনা নয়। কিন্তু ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি প্রবেশ করলেই সমস্যা হয়। ছাত্ররাজনীতির যে সৌন্দর্য আমরা চিন্তা করি, তার সঙ্গে এখনকার রাজনীতির বড় ফারাক আছে। বিশেষ করে স্বৈরাচার পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ থেকে যে চর্চা শুরু করেছিল বিএনপি’র জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, তা ছাত্ররাজনীতি ছিল না কোনোভাবেই। সেটিই এখন ক্যাম্পাস সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন মানেই নিজেদের ভেতর হালুয়া রুটির ভাগভাটোয়ারা নিয়ে কোন্দল, কলহ, খুনাখুনি, মারপিট, হল দখল, সিট বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমাতে এরা পেটোয়া বাহিনীর ভূমিকায় থাকে। হলে নিরীহ ছাত্রের কাছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতার একমাত্র পরিচয় নিপীড়ক।  

ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের স্বাতন্ত্র্য কীভাবে হারিয়েছে, তার প্রমাণ ছাত্রলীগ। তার কমিটি করে দেয় মুরব্বি দলের মুরব্বি নেতারা। নিজেদের প্রত্যক্ষ ভোটে কেউ নির্বাচিত হয় না। তারপর শুরু হয় পদবঞ্চিত আর পদ সঞ্চিতদের মারামারি। এই অবস্থা দেখেছি ছাত্রদলে, এখন দেখছি ছাত্রলীগে। বাইরের নেতাদের উপদেশে বা নির্দেশে ক্যাম্পাস কর্মীরা চালিত হতে থাকলে ক্রমে তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে নানা দুর্নীতি এবং অর্থকরী কার্যক্রম। আর সেটাই সব মূল্যবোধকে নির্বাসিত করতে থাকে। রাজনৈতিক দলের কাছে ছাত্র শাখা দখল করা বা দখলে রাখা জরুরি হয়ে উঠলে যে ক্যাম্পাসে চত্বরে দলাদলি, বিশৃঙ্খলা আর হিংসা প্রবলভাবে বাড়ে, সেটাই দেখে চলেছি আমরা।

ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে বহু বছরের একটা বন্ধ্যত্ব কেটেছে। কিন্তু আপাতত কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থাও সৃষ্টি করা যাচ্ছে না ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নিজস্ব অচলাবস্থায়। সমস্যা আরও বাড়ছে নানাদিক থেকে। গভীরে গিয়ে সমাধান খোঁজা প্রয়োজন। নুরকে মেরে ছাত্রলীগ তার কোন্দল ভুলে থাকতে পারবে না বা দূর করতে পারবে না। প্রয়োজন রাজনীতি করা, যে রাজনীতি ছাত্র-ছাত্রীরা চায় সংগঠনের কাছে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ