‘আমাকে কয়টি ভালো বালিশ দাও’

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৫:৫৪, মে ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫৮, মে ৩০, ২০১৯

আহসান কবিরআগে কখনও মনে হয়নি, কিন্তু ইদানীং মনে হয় আমার জীবন ধন্য এ কারণে, ছোটকালে ‘বালিশপাগল’-এর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। আমরা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করলে সে গালি দিতো, ইটপাটকেল মারলে সে বালিশ দিয়ে ঠেকাতো, আর আমাদের দিকে তেড়ে আসতো। ‘বালিশপাগল’ ছড়া বলতে বলতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেত। ছড়াটা এমন—
পঞ্চায়েতে দিছি নালিশ
হইছে মেলা বিচার সালিশ
পাইছি শেষে শুধু বালিশ
হেই বালিশে মাথা রাইখ্যা আমি এহন কান্দি

হায়রে আমার বউ হইয়াছে পরের ঘরের বান্দি!

বহুদিন পর বালিশপাগলের কথা মনে পড়লো। বালিশপাগলের বালিশটা ছিল সুন্দর। কত টাকা দাম, আর এই বালিশ ঘরে উঠাতে-নামাতে কত টাকা লাগতো, তা কখনও জিজ্ঞাসা করে দেখিনি। তবে বালিশের কাভারে লাল সুতো দিয়ে মজাদার একটা ছড়া লেখা ছিল–

ডালিম পাকিলে এমনি ফাটিয়া যায়
ছোটলোক বড় হলে বন্ধুরে কাঁদায়!

কেউ বন্ধুকে না কাঁদাক, সেই কামনাই করি। বালিশপাগলের সেলাইয়ের কাজ করা বালিশের মতো কিছু বালিশ আলোচনায় থাকে সবসময়। যেমন—নায়িকার বালিশ। এই বালিশের নাম দুঃখিনী বালিশ। প্রেমে ব্যর্থ হলে কিংবা বাবা-মা অথবা ভিলেন নায়িকাকে ‘রুমবন্দি’ করে রাখলে নায়িকা ছুটে যায় বিছানায়। তারপর বালিশ জড়িয়ে ধরে কাঁদে। বাংলা বা হিন্দি ছবির নায়িকাদের তাবৎ দুঃখ এবং কান্নার সাক্ষী এই দুঃখী বালিশ! তবে ইউরোপ আমেরিকায় এক ধরনের বালিশ পাওয়া যায়, যার নাম ‘টিস্যু ডিসপেনসার’ বালিশ। এই বালিশ দুঃখী বালিশের মতোই, তবে পার্থক্য শুধু টিস্যুতে। টিস্যু ডিসপেনসার বালিশে টিস্যু থাকে, কান্না শেষে আপনি সুন্দর করে চোখ মুছতে পারবেন।

বিপরীতে আছে ‘সুখী স্বপ্ন বালিশ’। এই বালিশ চারকোনা, কখনও-সখনও কোলবালিশও হতে পারে! ‘সুখী স্বপ্ন বালিশটা’কে শুধু জড়িয়ে ধরে ঘুমোবেন। স্বপ্নে চলে আসবে কাঙ্ক্ষিত রাজকন্যা বা রাজকুমার। রাজকন্যা বা রাজকুমারকে জড়িয়ে ধরবেন। স্বপ্নে নাচগান কিংবা আরও বেশি কিছু করবেন (কারণ আপনি তো বিছানাতেই ঘুমুচ্ছেন), ঘুম ভালো হবে, সময় সুখেই কাটবে! শুধু ভালোবাসার ‘চাপ’টা পড়বে ‘সুখী স্বপ্ন বালিশে’র ওপর!

এমন বালিশ আদিকাল থেকেই আছে। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে জেনে রাখুন। আমরা যাকে কোলবালিশ বলছি, একাকী মানুষদের সঙ্গী এই কোলবালিশকে কোনও কোনও জায়গায় বলা হয়ে থাকে ‘আলিঙ্গনের বালিশ’। ফিলিপাইনে এই আলিঙ্গনের বালিশকে বলা হয় আব্রাজদর, ইন্দোনেশিয়ায় গালিং, আর জাপানে ডাকিমাকুরা। শত শত বছর ধরে এমন আলিঙ্গনের বালিশ চালু আছে। সুখী স্বপ্ন বালিশের মতো আলিঙ্গনের বালিশ ঘরে ঘরে আরও বেশি প্রচলিত হোক। কারণ, শেষমেশ স্বপ্ন আর ভালোবাসাই বদলে দিতে পারে সবকিছু।

আসলে কয়েক শত বছর ধরেই মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বালিশের বসবাস। খ্রিস্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগে থেকেই বালিশের প্রচলন দেখা যায়। সে সময়ে কাঠ আর পাথরের বালিশের প্রচলন ছিল। বালিশ সে সময়ে ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। বালিশ দেখে বংশ আর বিয়ের পাত্র পাত্রী নির্ণয় করা হতো। প্রাচীন মিশরে মানবদেহ দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য যে মমী করা হতো সেসব মমীর মাথার নিচে পাওয়া যেতো কাঠ বা পাথরের বালিশ। বিশ্বাস করা হতো বালিশ মানবদেহের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গ মাথাকে সুন্দরভাবে বাঁচিয়ে রাখে। ঘাড় ব্যথা, মাথাব্যথা দূর করা আর মেরুদণ্ডের হাড়-মাংসপেশি সোজা ও শক্ত রাখার জন্যই বালিশের ব্যবহার দ্রুত জনপ্রিয় হয়। 

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার জীবনযাত্রায় বালিশের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। গ্রিক ও রোমানদের পরে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে নরম বালিশের ব্যবহার। ক্রমশ শক্ত বালিশের বদলে নরম বালিশের (প্রথম প্রথম নরম করার জন্য গাছের বাকল, লতা-পাতা, খড় এবং পরে পাখির পালক ব্যবহৃত হতো। মূলত শিল্পবিপ্লবের পরে তুলার প্রচলন হয় বালিশে) প্রচলন হয়। মানুষের জীবনযাত্রায় বালিশ এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় একটা উপাদান।

রোমান বা গ্রিকদের মতো চীনা সভ্যতায়ও বালিশের বিচিত্র ব্যবহার রয়েছে। ৬১০ থেকে পরবর্তী তিনশ’ বছর চীন শাসন করেছিল সুই ও ট্যাং রাজবংশ। এরা সিরামিকের বালিশ ব্যবহার করতো এবং সিরামিকের এসব বালিশে জীবজন্তু গাছপালার ছবি আঁকা হতো। ১১০০ সালের পরে চীনা রাজারা (জিন রাজবংশ) মাটির বালিশ ব্যবহার করতো। চীনের জাদুঘরে চীনা রাজাদের ব্যবহৃত ‘কান বালিশ’ও দেখা যায়। মাথার আরামের জন্য বালিশ ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও কানের জন্য আলাদা বালিশ ব্যবহারের রেওয়াজ চীনাদের মধ্যেই বেশি ছিল।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের বালিশের প্রচলন দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মার্কিন মুলুকে জনপ্রিয় একটা বালিশের নাম ‘বয়ফ্রেন্ড বালিশ’। পুরুষের হাত, গলা ও বুকের অংশের মতো করে বানানো বালিশটি জড়িয়ে ধরে নারীরা দারুণ অনুভূতি নিয়ে ঘুমাতে পারে। বলাই বাহুল্য, এই বালিশ শুধু নারীদের জন্য। বিপরীতে পুরুষদের জন্য গার্লফ্রেন্ড বালিশটা একটু অন্যরকম। মেয়েদের দুই পা ও কোমরের আদলে এটা তৈরি হয়। যেন এই বালিশে মাথা রেখে যেকোনও পুরুষ ভাবতে পারে সে তার প্রিয়তমার কোলে ঘুমুচ্ছে। এছাড়া মেয়েদের ভেতর জনপ্রিয় হয়েছে ‘মেকআউট’ বালিশ। এই বালিশে পুরুষের কৃত্রিম নরম ঠোঁট যুক্ত (তুলা, প্লাস্টিক আর স্পঞ্জ দিয়ে তৈরি) থাকে। এই বালিশের সঙ্গে খুনসুটি করতে করতে ঘুমুতে ভালোবাসেন অনেকে। আর বাচ্চাদের মধ্যে জনপ্রিয় ‘হাত বালিশ’। বাচ্চাদের কোলে নেওয়ার মতো দুই হাতের আদলে এই বালিশ তৈরি হয়, যেন বাচ্চারা অনুভব করতে পারে তারা মা-বাবার কোলেই আছে!

বালিশ নিয়ে মানুষের আদিখ্যেতার অন্ত নেই! এদেশের গরিব ধনী নির্বিশেষে বাসর রাতে যেমন নতুন বালিশ খোঁজে, ঠিক তেমনি কখনও কখনও খুনের পর কেউ কেউ  হুংকার দিয়ে বলে, দিছি শালারে বালিশ ছাড়া শোয়াইয়া! কবরে বালিশ থাকে না, সেটাই বাস্তবতা। পাঠ্যবইয়ে পড়েছিলাম সুখী মানুষের পোশাক থাকে না, আর স্বাস্থ্যবান মানুষ গাছের ছায়ায় মাথার নিচে ইট দিয়েও দিব্যি ঘুমাতে পারে। আগে বুকের নিচে বালিশ দিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকারা চিঠি লিখতো, এখন মোবাইলের মাধ্যমে এসএমএস কিংবা সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ করে। বালিশ রয়ে গেছে আগের মতোই। কখনও চোখের জলের আধার হয়ে, কখনও প্রেম কিংবা বাসরের মধুর স্মৃতি হয়ে। বালিশের কাভারে তাই জমতে পারে চোখের জলের লবণাক্ততা, মৃত কোষ, মাথার খুশকি ও তেল। বালিশ তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়, নিয়মিত বিরতিতে বালিশের কাভার ধুয়ে মুছে শুকোতে দিতে হয়, বালিশ রোদে শুকানো লাগে!

২০১৯ সালের মে মাসে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের গ্রিনসিটি প্রকল্পের (২০ তলা ভবন নির্মাণ হচ্ছে সেখানে। ২০ তলায় বালিশ তুলতে ৭৬০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে) কর্মকর্তাদের বালিশ কেনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। বালিশ হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এবং সমালোচনার ইস্যু। যারা কুলিগিরি করেন তারা নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে শুরু করেন। তারা দাবি তোলেন, নরম মোলায়েম বালিশ নিচ থেকে ওপরে তুলতে যদি ৭৬০ টাকা লাগে তাহলে আমাদের বোঝা বহনের ন্যূনতম মজুরিও ৭৬০ টাকা করতে হবে। উল্লেখ্য, এই রূপপুর প্রকল্পে একটা বালিশের মূল্যমান দেখানো হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। যারা এটা নিয়ে সমালোচনা করছেন তাদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও একটি তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে। নেদারল্যান্ডসের এক ফিজিওথেরাপিস্ট থিস ভ্যান ডার হিস্ট ১৫ বছর পরিশ্রম করে এক অভিনব বালিশ তৈরি করেছেন, যার মূল্যমান ৪৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। মালবেরি রেশম আর মিশরের তুলা দিয়ে বালিশটি তৈরি করেছেন হিস্ট। এই বালিশে চব্বিশ ক্যারেট গোল্ড আর বালিশের চেইনে বাইশ ক্যারেটের নীল রত্ন ব্যবহার করা হয়েছে। এই তথ্য সম্ভবত এ কারণে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ৪৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা একটা বালিশের দাম, সেখানে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা তো একবারেই নস্যি। এ দেশের এক অর্থমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, ‘চার হাজার কোটি টাকা তেমন বেশি না!’

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখাটির সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের আলোচিত বালিশের কোনও সম্পর্ক নেই। তবে ‘প্রমোদ বালিশ’ বলেও একটা বালিশ আছে। আগের কালের রাজা-জমিদাররা এই বালিশের ওপর ভর রেখে শরাব পান করতেন আর বাঈজির নাচ দেখতেন। যাই হোক, এক রাজদরবারে এক চোর ধরা পড়েছে। তাকে চাবুক মারার পর গারদে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, তোর কিছু বলার আছে? চোর বললো, জি রাজা মশাই। আপনার ওই প্রমোদ বালিশটা যদি আমারে দিতেন তাইলে ওই বালিশে ভর দিয়া ভাব নিয়া গারদে বইসা থাকতাম। ভাবতাম আমার সামনে দাঁড়ানো বাঈজি। তারে হুংকার দিয়া বলতাম নাচো...।

সবার প্রমোদ বালিশ থাকে না। যার থাকে, তার কাছে এই পৃথিবীটা রূপপুরের মতো।

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ