হিন্দুত্বকে বরণ করলো ভারতীয় ভোটাররা

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৭:০০, মে ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৬, মে ৩০, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী১৯৫৬ সালে জওহরলাল নেহরু একবার রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীকে অটল বিহারি বাজপেয়ির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে ‘ফিউচার প্রাইম মিনিস্টার অব ইন্ডিয়া’ বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সম্ভবত নেহরু তখনই বুঝেছিলেন, কংগ্রেসের পর অটল বিহারি বাজপেয়ির দল জনসংঘ (বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টি—বিজেপি) ভারতের ক্ষমতায় আসবে। নেহরুর মৃত্যুর বহুদিন পর অটল বিহারি বাজপেয়ি তার দল বিজেপির নেতৃত্বে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) গঠন করে একবার নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন তিনি। মনে রাখতে হবে, বিজেপি হচ্ছে আরএসএস, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। আরএসএস, বজরং দল, শিবসেনা, হিন্দু মহাসভা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ—এসব দলকেই সম্মিলিতভাবে বলা হয় সংঘ-পরিবার।
এখন সর্বভারতীয় পর্যায়ে ভারতে দল রয়েছে কংগ্রেস আর বিজেপি। কংগ্রেসও শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলোর আত্মপ্রকাশের পর একটা ন্যাশনাল প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স নামে জোট গঠন করেছিল। উভয় জোটের অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান। চতুর্থদশ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল। মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাজার অর্থনীতিতে ভারতকে টেনে এনেছিলেন।

ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠীর উপলব্ধি সম্ভবত ঠিক ছিল। নেহরু সমাজতন্ত্রের গোড়াপত্তন করতে গিয়ে ধনতন্ত্রের বিকৃতিসাধন করেছিলেন। মনমোহন সিং বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ। তিনি অর্থনীতিতে নেহরুর সময়ের দ্বিচারিতার অবসান ঘটিয়ে পরিপূর্ণভাবে বাজার অর্থনীতির জন্য ভারতীয় অর্থনীতির দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। মনমোহন সিংয়ের এই সংস্কারচিন্তা ফলপ্রসূ হয়েছিল এবং ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতি দৃশ্যমানও হয়েছিল। ভারতের অর্থনীতি যখন অগ্রসরমান হলো, তখন পার্শ্ববর্তী চাইনিজ অর্থনীতির দেং-এর সংস্কার দ্রুত অগ্রগতির দিকে ধাবমান হয়েছিল। বিশ্ববাজারে এমন কথা রটেছিল, চীন আর ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অর্থনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।

ভারতীয়রা এতদিন পাকিস্তানকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনা করতো, এখন তারা প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনা করতে লাগলো চীনকে। মনমোহনের সময় ভারতের সাধারণ মানুষ এই আত্মতৃপ্তিটুকু লাভ করেছিল, যার ফলে পঞ্চদশ লোকসভা নির্বাচনে পুনরায় ন্যাশনাল প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স জিতেছিল, আর দ্বিতীয়বারের মতো মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

রাজনীতিতে ১৩ বাড়ির এক উঠান ব্যবহার খুবই কঠিন। মনমোহন সিং দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অ্যালায়েন্সের অংশীদার দলগুলোর মন্ত্রীরা ইচ্ছেমতো দুর্নীতি করেছিল। ফ্যামিলি নিয়ে কোনও কোনও মন্ত্রী সরকারি বাসভবনে না থেকে পাঁচ তারকা হোটেলেও ছিলেন, যার বিল পরিশোধ করতো সরকার। দুর্নীতির বর্ষণের সময় বর্ষাতি পরে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং নিজের সততা রক্ষা করলেও মন্ত্রিসভার সদস্যদের দুর্নীতি দৃষ্টিকটুভাবে মানুষের নজরে এসেছিল। যে কারণে ষষ্ঠদশ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে বড় পরাজয় মেনে নিতে হয়। ষষ্ঠদশ লোকসভা নির্বাচনে ভারতের ধনবাদী গোষ্ঠী নরেন্দ্র মোদিকে বিজিপির প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী হিসেবে প্রেজেন্ট করে বিজেপিকে নির্বাচনে সহযোগিতা করেছিল।

ইকোনোমিস্ট আর টাইম ম্যাগাজিন উল্লেখ করেছিল, ষষ্ঠদশ লোকসভা নির্বাচনে ধনবাদী গোষ্ঠী নরেন্দ্র মোদিকে জিতিয়ে এনে প্রধানমন্ত্রী করার জন্য ৭-৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছিল। নরেন্দ্র মোদি দু’বার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ষষ্ঠদশ লোকসভায় তিনি বিজেপির প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অবতীর্ণ হন। তার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ থাকলেও শিল্পবান্ধব হিসেবে নরেন্দ্র মোদির সুনাম ছিল। তার সময়ে গুজরাট রাজ্যের সর্বভারতীয় রফতানিতে ১৭ শতাংশ কন্ট্রিবিউশন ছিল। অবশ্য গুজরাট ব্রিটিশের সময় থেকে শিল্পে উন্নত ছিল। বস্ত্র-নগরী আহমদাবাদকে ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার বলা হতো।

ষষ্ঠদশ লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে, পর্বত প্রমাণ বেকারত্বের অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, কৃষকের মঙ্গলের কথা বলে জিতেছিলেন। আসন পেয়েছিল বিজেপি এককভাবে ২৮২টি। সরকার গঠনের জন্য আসন প্রয়োজন ২৭২টি। ভারতীয় ভোটাররা নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, শুধু তাই নয়, যেন কারও মুখাপেক্ষী হতে না হয়, সেই পরিমাণ বিজেপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠও দিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, যে বছর নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় ছিলেন, কিন্তু কোনও সফলতা ছিল না। একজন ভালো অর্থমন্ত্রী পর্যন্ত তার ছিল না। নিজেরও অর্থনীতিতে ভালো জ্ঞান ছিল না।

এমন পরিস্থিতিতে সপ্তদশ লোকসভার নির্বাচন এলো। অনেকে মনে করেছিল নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবেন না। কিন্তু গত ২৩ মে ভোটগণনায় দেখা গেলো, নরেন্দ্র মোদি ৩০৩ আসন পেয়ে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। এবারও বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে এবং ষষ্ঠদশ লোকসভার চেয়ে ২১ আসন বেশি পেয়েছে। এ ম্যাজিক ফলের কারণ কী, তার একটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন।

সপ্তদশ লোকসভার নির্বাচনি প্রচারে নরেন্দ্র মোদি কিন্তু পূর্বের লোকসভার মতো সাধারণ ভোটারকে কোনও প্রতিশ্রুতি দেননি। এবার অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদি মুসলিমবিরোধী উগ্র-মৌলবাদ প্রচার করেছেন মাত্র। সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগরিষষ্ঠদের জন্য হুমকি বলে প্রচার করেছেন। নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহ ভারতের এখন সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল মানুষ, তাদের কথায় তো মানুষকে আস্থা স্থাপন করতে হয়। আর তারা তো অনুরূপ কাজে ২০০২ সালে গুজরাট রাজ্যে দক্ষতা দেখিয়েছেন। ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গায় যখন হাজার হাজার মুসলমান হত্যা করা হয় তখন নরেন্দ্র মোদি ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, আর অমিত শাহ তার মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্র দফতরের মন্ত্রী।

ভারতে কোনও অসাম্প্রদায়িক নেতা তো নেই। গান্ধী, নেহরু আর সুভাষচন্দ্র বসু ছাড়া গত দেড় শত বছরে বড় মাপের কোনও অসাম্প্রদায়িক নেতা আমরা দেখিনি। রাজীব গান্ধীও নির্বাচনের আগে সুপ্রিম কোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাবরী মসজিদে রাম লালার শিলা বিন্যাস করেছিলেন। বালগঙ্গাধর তিলক, মদনমোহন মালব্য, লালা রাজপথ রায়, শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী, রাজেন্দ্র প্রসাদ, গোবিন্দ বল্লভ পন্থ, বল্লভভাই পেটেল, সবাই তো সাম্পদায়িক নেতা ছিলেন। তাদের সাম্প্রদায়িকতা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। সমান্তরালভাবে আরও একটা ধারা উদ্ভব হলো। বিনায়ক দামোদর সাভারকার এবং মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার ওই ধারাকে বিকৃত করলো।

নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ হলেন সাভারকার আর গোলওয়ালকারের ধারাটির অনুসারী। আরএসএসের প্রতিষ্ঠা সাভারকার আর গোলওয়ালকারদের হাতেই। রাজা রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখরা হিন্দু জাতীয়তাবাদের একটা আধুনিক ধারার পত্তন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সাভারকার, গোলওয়ালকার আর আর্য সমাজের স্বামী দায়ানন্দরা ধারাটাকে বাধাগ্রস্ত করে হিন্দুত্ববাদের পুনর্জীবন চেয়ে বসলেন। কট্টর এ ধারাটি কখনও ভারতের জন্য কল্যাণকর হবে না। অনেকেই মনে করেন, মহাত্মা গান্ধী কাস্ট স্ট্রাগল বিলুপ্ত করে যে মহাজাতি গঠন করতে চেয়েছিলেন, সেটিই ছিল উত্তম পন্থা। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্য, আধুনিককালে ভারতীয় ভোটাররা হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদকে রায় দিয়ে দিলেন। আমরা মোদি আর অমিত শাহের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া ছেড়ে কতদূর অগ্রসর হয়, দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

বেনারসে মোদি বলেছেন, পাটিগণিত নয়, রসায়নই তাকে জিতিয়েছে। এ রসায়ন এমন একসময় আসবে, যখন ভারতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। রসায়ন হয়তো হলাহলের রূপ নেবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ