মেরে মেরে নুরকে নেতা বানানোর প্রকল্প ছাত্রলীগের!

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৪:৫২, জুন ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪০, জুন ০১, ২০১৯

প্রভাষ আমিনঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর নিজেই দাবি করেছেন, একসময় তিনি ছাত্রলীগ করতেন। স্কুলে থাকতেই তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মহসীন হল শাখা ছাত্রলীগের নেতাও ছিলেন তিনি। কিন্তু পরে ছাত্রলীগের নানা আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে সংগঠন ত্যাগ করেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে লাইমলাইটে চলে আসেন পটুয়াখালী থেকে আসা এই নুরুল হক নুর। কথাবার্তায় তেমন পটু নন, উচ্চারণ আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট, শহুরেদের মতো স্মার্টও নন। কিন্তু এই তথাকথিত ‘আনস্মার্ট’ নুরুল হক নুরকেই ভোট দিয়ে ডাকসুর ভিপি বানিয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। নুরের মধ্যে নেতৃত্ব গুণ অবশ্যই আছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবিটি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এবং সে দাবি আদায়ে তাদের সঙ্গে ছিলেন শেষ পর্যন্ত। তার সবচেয়ে বড় গুণ হলো, লেগে থাকা। ছাত্রদল যেখানে একদিন ধাওয়া খেয়ে ক্যাম্পাস ছেড়েছে, নুর সেখানে বারবার মার খেয়েও মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন। নুরকে পুলিশ মেরেছে, আর বার বার মেরেছে ছাত্রলীগ। সাধারণ শিক্ষার্থী নুরের ডাকসুর ভিপি বনে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব যদি কারও থাকে, তবে সে ছাত্রলীগেরই। লাইব্রেরি চত্বরে ছাত্রলীগের হামলা থেকে বাঁচতে এক শিক্ষকের পা জড়িয়ে থাকা নুরের সেই ছবি তার প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সহানুভূতি বাড়িয়ে দিয়েছিল। ডাকসু নির্বাচনের দিন দুপুরেও রোকেয়া হলের সামনে ছাত্রলীগের নারী নেত্রীদের হাতে মার খান নুর। তার জয়ে ছাত্রীদের হাতে খাওয়া সেই মারের ভূমিকাও কম নয়। ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পরদিনও টিএসসিতে মার খেতে হয়েছে তাকে। এমনই তার কপাল, বারবার মার খেতে হয় তাকে।

তবে নুরও বোধহয় মার খাওয়াটা মেনেই নিয়েছেন। মারেই যেন লক্ষ্মী। নির্যাতিত মানুষের পাশে থাকাটা সাধারণ মানুষের সহজাত প্রবণতা। আর এই প্রবণতায় ভর করে নুরুল হক নুর এখন সবার আগ্রহের কেন্দ্রে। ছাত্রলীগ মারতে মারতে  নুরকে ডাকসুর ভিপি বানিয়ে দিয়েছে। এখন আরও বড় নেতা বানানোর জন্য মাঠে নেমেছে মনে হয়। অবশ্য ছাত্রলীগের দাবি, নুরুল হক নুর যত বড় নেতা, তার চেয়ে বড় অভিনেতা। ফুলের ঘায়েই মূর্ছা যান তিনি। ছাত্রলীগের দাবি যদি সত্য বলেও ধরে নেই, নুরকে ফুলের ঘা দেওয়ার অধিকার ছাত্রলীগকে কে দিয়েছে?

কেউ ভাববেন না, শুধু ছাত্রলীগ মেরেই নুরকে ভিপি বানিয়ে দিয়েছে। নেতা হওয়ার মতো সব যোগ্যতা তার আছে। লেগে থাকার কথা তো আগেই বলেছি। তিনি শিক্ষার্থীদের আবেগটা বুঝতে পারেন দারুণভাবে। তাই তো সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে কোটা সংস্কারের আন্দোলন করে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারাদেশেই আলোড়ন তুলেছিলেন। কোটা সংস্কারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করেছিলেন তিনি। আমি বরাবরই কোটার পক্ষের লোক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বারবার কোটার পক্ষে তার অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। নুরদের আন্দোলনের মুখে অনেকটা অভিমান করে তিনি কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। শেষ পর্যন্ত সরকার দাবি মেনে নিলেও নুরদের উত্থান সহ্য হয়নি ছাত্রলীগের। রাজনীতি দিয়ে ঠেকাতে না পেরে তাকে মেরে দমাতে চেয়েছিল তারা। ঘটনা ঘটেছে উল্টো। কোটা সংস্কার আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ছিল অভিযোগ এনেই এই আন্দোলনের নেতাদের গায়ে শিবির ট্যাগ লাগানো হয়েছিল। নুরুল হক নুরকেও শিবির প্রমাণের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু পরে দেখা গেছে, নুর আসলে শিবির নয়, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। দলের একজন সাবেক নেতার এই উত্থান হয়তো পছন্দ হয়নি ছাত্রলীগ নেতাদের। নুরকে দেখলেই বোধহয় তাদের হাত নিশপিশ করে। কিন্তু আপনি পছন্দ করুন আর নাই করুন, নুরুল হক নুর এখন ডাকসু ভিপি। ছাত্রলীগের সভাপতিকে হারিয়ে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটে ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে অপছন্দ করতে পারবেন, কিন্তু উপেক্ষা করতে পারবেন না। গায়ে হাত তোলার তো প্রশ্নই আসে না।

ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর নুরুল হক নুর নিজের যোগ্যতা আরও বেশি করে প্রমাণ করছেন। বিভিন্ন টকশো’তে তার সাবলীল অংশগ্রহণ ছাত্রলীগ নেতাদের মেজাজ আরও খারাপ করে থাকবে। বনানীর এফআর  টাওয়ারের আগুনে তিনি ছুটে যান। ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবিতে রাজপথে নামেন সবার আগে। নুরের আঞ্চলিক উচ্চারণের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে ছাত্রলীগ ট্রল করে। কিন্তু মেরে বা ট্রল করে তাকে দমানো যায়নি। বরং যত মার খাচ্ছেন, তত বড় নেতা হচ্ছেন তিনি। যত ট্রল হচ্ছে, তত প্রচারণা হচ্ছে।

ক’দিন আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এক ইফতার আয়োজনে আমন্ত্রণ পান ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর। কিন্তু তার সঙ্গে ডাকসুর আর কোনও নেতাকে দেখা যায়নি। বরং তার পাশে ছিল সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা। তাহলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত কোন বিবেচনায় নুরুল হক নুরকে আমন্ত্রণ জানালেন? যদি ডাকসু ভিপি হিসেবে নুর আমন্ত্রণ পেয়ে থাকেন, তাহলে তো তার সঙ্গে জিএস-এজিএসসহ ডাকসুর অন্য নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো উচিত ছিল। আর যদি সংগঠন হিসেবে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, তাও বেখাপ্পা। ছাত্রলীগসহ সক্রিয় সব সংগঠনকে বাদ দিয়ে একটি অরাজনৈতিক সংগঠনকে এভাবে আমন্ত্রণ জানানোর মানে কী? এটা তো মিলারের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ নয়, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের আমন্ত্রণ। তবে নুরুল হক নুরের নানান তৎপরতায় একটা জিনিস পরিষ্কার, তিনি নিজেকে নিছক ডাকসুর গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখতে চান না। তাই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছেন তিনি। বনানীর আগুনে তিনি ছুটে যান, কৃষকের ধানের দাম নিশ্চিত করতে মাঠে নামেন। ছুটে যেতে চান ঢাকার বাইরেও। কিন্তু নুরুর এই উড়ে বেড়ানোর আকাঙ্ক্ষা সইবে কেন ছাত্রলীগের! সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছিল সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, যার প্রধান অতিথি ছিলেন নুরুল হক নুর। তার সফরকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আগের স্টেশনে ট্রেন থেকে তাকে নামিয়ে আলাদাভাবে শহরে নিয়ে যায়। বিকেলে তিনি ইফতারের জন্য নির্ধারিত রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই ছাত্রলীগ রেস্টুরেন্টটি বন্ধ করে দেয়। পণ্ড হয়ে যায় ইফতার আয়োজন। পরদিন বগুড়ায়ও একই ঘটনা ঘটেছে। তবে বগুড়া ছাত্রলীগ শুধু ইফতার পণ্ড করেই ক্ষান্ত থাকেনি, নুরকে মারও দিয়েছে।

ডাকসুর ভিপি হিসেবে তো বটেই, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেও নুরুল হক নুরের দেশের যে কোনও জায়গায় যাওয়ার, ইফতার করার অধিকার আছে। তাহলে ছাত্রলীগ তাদের বাধা দিচ্ছে কেন? আইন হাতে তুলে নিচ্ছে কেন? আসলে ক্যাম্পাসে একতরফা নুরদের উত্থানে ছাত্রলীগ নেতাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তাই নুরকে ঠেকানোর এমন মরিয়া ও বেআইনি চেষ্টা। নুরুল হক নুরের অপরাধ কী? বেআইনি কিছু হলে, সেটা দেখার জন্য পুলিশ আছে। ছাত্রলীগকে কে এই ক্ষমতা দিয়েছে নুরকে ঠেকানোর, আইন হাতে তুলে নেওয়ার?

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও বগুড়ায় যারা ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরের ইফতার আয়োজন পণ্ড করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি, কারণ তারা সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। একবার ভাবুন, যদি ছাত্রলীগ কোনও বাধা না দিতো, তাহলে কেউ কি জানতো, নুরুল হক নুরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও বগুড়া সফরের কথা। অথচ নুরুল হক এখন সারাদেশে আলোচনার কেন্দ্রে। তার ওপর হামলার বিচারের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সোচ্চার, দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধনও হচ্ছে।

নুরুল হক নুর তার প্রাণহানির শঙ্কার কথা বলে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ছাত্রলীগ তাকে কেন্দ্রীয় কমিটির ১ নম্বর সহ-সভাপতি, বাড়ি-গাড়ি ও টাকা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সে অফার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বলেই তার ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। এ অভিযোগ ছাত্রলীগ অস্বীকার করছে। পদ-পদবি, বাড়ি-গাড়ির অফার দেওয়া হয়েছিল কিনা জানি না, তবে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, সংগঠনের সাবেক নেতা নুরুল হক নুরকে জাতীয় নেতা বানানোর একটা প্রকল্প হাতে নিয়েছে ছাত্রলীগ। তাকে মেরে মেরে ডাকসুর ভিপি বানিয়েছে। এখন দেশজুড়ে মেরে মেরে জাতীয় নেতা বানাবে।

যা ইচ্ছা বানাক। আমার আপত্তি শুধু এক জায়গায়। একজন মানুষের গায়ে হাত তোলার, তার চলাচলের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার কোনও অধিকার কারও নেই।

নুরুল হক নুর দেশের যে কোনও স্থানে যেতে পারবেন, যা ইচ্ছা বলতে পারবেন, করতে পারবেন। যদি বেআইনি কিছু করেন, তাহলে সেটা দেখার জন্য পুলিশ আছে। তাকে নিয়ে ছাত্রলীগের না ভাবলেও চলবে। শুধু নুরুল হক নুর কেন, দেশের কোনও নাগরিকের গায়ে হাত তোলার অধিকার ছাত্রলীগ কেন, কারোরই নেই।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ