হায় কিশোর!

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৫:৩৬, জুন ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৭, জুন ০১, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহপরিচিত এক মহল্লার গলিপথ দিয়ে হাঁটছিলাম। মহল্লার মানুষেরা আমার অনেক দিনের পরিচিত। অভিজাত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পাল্টে যেতে চেয়েছিল, পারেনি। পুরনো নিম্ন-মধ্যবিত্তের রঙ রয়ে গেছে আগের মতোই। মানুষগুলোর মিশ্র পরিবর্তন ঘটেছে। কেউ ভাবছেন, উঁচু দালান আর লোহার গেট দিয়ে তিনি এখন অভিজাত মানুষ। দোটানায় আছেন অনেকে। নিজেকে কোথায় রাখবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না। আরেকদল আগের মতোই। নিজেদের গলির মানুষ ভাবতেই ভালোবাসেন। তাদের সঙ্গেই কুশল বিনিময় হচ্ছিল। সন্ধ্যের পর মহল্লার দোকান, বাড়ির সামনে ছোট ছোট জটলায় আড্ডা। আগের মতোই। একটু বদলেছে তো বটেই। মহল্লার কিশোর-তরুণদের কেমন অপরিচিত ঠেকছে। কারও মধ্যে উচ্ছ্লতা নেই। আছে চিৎকার। সেই চিৎকারে তারুণ্যের উদ্দামতা নেই। আছে ভয় ও আতঙ্কের কালো ছোপ। তারা মোবাইল ফোনে ব্যস্ত। হুমড়ি খেয়ে পড়ছে একে অন্যের মোবাইল ফোনে। কথা বলছে ফিসফিসিয়ে। মহল্লার পরিচিত এক মুখ বললেন, ‘ওদের দিকে তাকাইয়েন না। চুপচাপ হেঁটে চলে যান। ওরা মুরব্বি মানে না। পরিচিত-অপরিচিতের ধার ধারে না।’ শুনলাম তাদের প্রত্যেকে নানারকম নেশায় আসক্ত। আমি এক গলি থেকে অন্য গলি পেরিয়ে যাই। সব গলির রঙ এখন এক। অন্ধকার। হঠাৎ দেখি দু’জন আনসার সদস্য এক কিশোরকে ধরে নিয়ে আসছে। আমাকে ডিঙিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম ছেলেটির দুই হাত হাতকড়া দিয়ে বাঁধা। আঁতকে উঠি। তাদের পেছনে আসা মহল্লার মা-খালার বয়সীদের কাছে শুনলাম, কিশোরটি মহল্লার এক মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। বুক কেঁপে ওঠে। বলে কী? জানলাম, এমন ঘটনা মহল্লায় হরহামেশাই ঘটছে।

মন খারাপ করে মহল্লা থেকে বেরিয়ে আসি। সঙ্গে আশপাশের মহল্লার আরও কয়েকজন আছেন। তাদের সঙ্গে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়াই। জানলাম, কিশোররা সব মহল্লাতেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। মাদক এর জন্য প্রধানত দায়ী। মাদকের টাকা জোগাড় করতে নিজ বাড়িতেও চুরি-ডাকাতি-খুন করছে তারা। বন্ধুর হাতে বন্ধু। ভাইয়ের হাতে ভাই খুন হচ্ছে। ধর্ষণ তো আছেই। শুনলাম, সারাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানেও তাদের দমানো যায়নি। তাদের কাছে মাদক আসছে আগের মতোই সরল পথে। মাদকসেবী, ব্যবসায়ীদের এলাকার মানুষ চেনে। তারা চোখের সামনেই শিশু থেকে কিশোর, তরুণ হয়েছে, কিন্তু এখন তারাই ভয়ঙ্কর। অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে তারা। কোনও কোনও পরিবারে অভিভাবকরাও মাদকাসক্ত। পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে তারা বেপরোয়া। ইদানীং ধর্ষণের প্রবণতা বেড়েছে। বেশিরভাগ ধর্ষণের কথা ধর্ষিতা নিজে এবং পরিবার গোপন রাখে। কোনও কোনোটি প্রকাশ পেয়ে যায়। কিন্তু খুব একটা লাভ হয় না। গ্রেফতার হলেও মাস ছয়েক পর ধর্ষক ছাড়া পেয়ে আবার বুক ফুলিয়ে মহল্লায় ঘুরে বেড়ায়।

এই খবরগুলো আমার অজানা তেমন নয়। গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে যত খবর আমাদের দফতরে আসে, তার চেয়ে অনেক বেশি খবর অজানা থাকে। বিশেষ করে ধর্ষণের খবর। অনেক পাঠক, দর্শকের মনে হতে পারে, দেশে হঠাৎ ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে গেলো নাকি? কিছুটা বেড়েছে সত্যি। তবে আগে এর চেয়ে খুব কম এ ধরনের ঘটনা ঘটতো বলে মনে করি না। নিকট অতীতেও ধর্ষিতা এবং তার পরিবার নিজে থেকে এ ঘটনা চেপে যেতো। সমাজ বাধ্য করতো চেপে যাওয়ার জন্য। থানা পুলিশও ধর্ষকের হয়ে ধর্ষিতা ও তার পরিবারের মুখ চেপে ধরতো। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে থানা পুলিশ অভিযোগ না নিলেও ঘটনা চেপে রাখা যাচ্ছে না। মূলধারার পত্রিকায় জায়গা না পেলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি উঠে আসছে। সেই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়ার কারণেও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন যিনি, তিনিও সোচ্চার হচ্ছেন। এ কারণে ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে আসছে অনেকটা। তবে বেড়েছে যে প্রবণতাগুলো, সেগুলোর কথা তো আমরা জানি। চলন্ত বাসে চারটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এটি নতুন প্রবণতা। এর বাইরে কর্মস্থলে, পথে, বিয়েতে রাজি না হওয়ায়, শিক্ষক ও আত্মীয়ের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো পুরাতনই। অস্বীকার করার উপায় নেই, কিশোর বয়সীদের মধ্যে ধর্ষণের প্রবণতা বেড়েছে বহুগুণে। এর জন্য মাদক, ইন্টারনেটের পর্ন ছবি এবং বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলের অনুষ্ঠান প্ররোচকের ভূমিকা পালন করছে।

এই কিশোরদের কি আমরা অপরাধপ্রবণতা থেকে ফিরিয়ে আনতে চাই? আমাদের সমাজের এ সময়ের হালচাল দেখে তা মনে হয় না। কারণ অভিভাবকদের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব বাড়ছে। এটা নিম্ন, মধ্য, উচ্চ, সব বিত্তের মধ্যেই। অভিভাবকের বাড়তি আয়ের টাকা সন্তানের মুঠোতে উঠে যাচ্ছে সহজেই। সেই টাকা তারা মাদকসহ অন্যান্য বিনোদনে ব্যয় করছে। অপরাধপ্রবণতার মধ্যে আমরা কিশোরদের হত্যাকারী হিসেবেও দেখতে পাচ্ছি। মাদক নিয়ন্ত্রণ ও অভিভাবকদের সত্যিকারের অভিভাবক না হয়ে ওঠা পর্যন্ত এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা থেকে কিশোর-উঠতি তরুণদের দূরে রাখা অসম্ভব। ঈদ আসছে। এই ঈদ উৎসবকে উপলক্ষ করে কৌতূহলের বশেই অনেক কিশোর-কিশোরীর মাদক বা নেশার সঙ্গে পরিচয় ঘটে। কিশোররা কৌতূহলবশেই যৌন হয়রানিতে সক্রিয় হয়। সুতরাং ঈদ উৎসবে নিজ সন্তানকে বাড়তি নজরে রাখা জরুরি।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ