ভারতে লোকসভা নির্বাচন, মমতা ‘দিদি’র ভবিষ্যৎ কী?

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৭:৪১, জুন ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৮, জুন ০১, ২০১৯

দাউদ হায়দারবাংলায় মোক্ষম প্রবাদ—‘যত গর্জে তত বর্ষে না’। তার মানে, মেঘে-মেঘেও দুই নম্বরি কাণ্ড। প্রকাশ্যে না হলেও গভীরে-গোপনে, অলক্ষে। ঠিক যেমন বলেছেন চাণক্য। রাজা কখন ঘুষ খায়,মাছ কখন জল খায়,কেউ ‘দ্যাখে’ না। তলে-তলে সবই নিয়মমাফিক। উপরের স্রোতই কেবল আমরা দেখি কিন্তু চোরা স্রোত চোখে পড়ে না। গভীর জলের তরঙ্গেই তৈরি হয় শক্তিশালী বিদ্যুৎ।
চাণক্যের ‘বাণী’ মাও জে দং পড়েছেন কি-না, অজানা। মাও-য়ের কথা: ভূগর্ভের ভলকানো এক লহমায় সৃষ্ট নয়, দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি, যখন উদগিরণ করে, তল্লাট পুড়ে ছারখার। বিপ্লবও বহু কষ্ট, সাধনার ফল। বীজ থেকে মহীরূহ।
এই প্রসঙ্গে মাও ধর্মের চোরাবালির আপাত লাবণ্যের কথাও বলেছেন, অবশ্য, ধর্মে ও ধর্ম-বিশ্বাসে যে মাদকতা, মাদকসেবক ঝিমিয়ে পড়ার আগে উদ্দীপ্ত হয়, তখনই ভয়ংকর।
ধর্মের আফিম সেবন পৃথিবীর নানা দেশে এখন জমজমাট। নেশায় বুঁদ। তথাকথিত রেনেসাঁসের ইউরোপেও। উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকায় এমনকি একদা-সমাজতান্ত্রিক দেশেও। চোখের সামনেই দেখছি। সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যুক্ত জাতিবিদ্বেষ।

গত কয়েক বছরে লক্ষ করছি, ইউরোপেও ‘খ্রিস্টানি-তবলিগি’ ছড়িয়ে পড়ছে। পথের মোড়ে, রেল স্টেশন চত্বরে, জনবহুল এলাকায় খ্রিস্টধর্মের বই, নানা ভাষায়, মায় বাংলায়, বিনা মূল্যে বিতরণ করছে। নেওয়ার জন্যে অনুরোধ। –তবে, জোরজবরদস্তি নয়। মোলায়েম সম্ভাষণে বিতরণ। যারা বিতরণ করছেন, অর্থও পাচ্ছেন চার্চ থেকে। নিশ্চয় তাঁরা ধর্মীয়বোধেই করেন।

এও বাহ্য। অনেকের বাড়িতে যান, খ্রিস্টধর্মের বই উপহার দিয়ে খ্রিস্টধর্মের মাহাত্ম্য প্রচারে একনিষ্ঠ। বাড়তি কিছু সুবিধাও দিতে চান, যদি যিশুলগ্ন তথা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। এরকম প্রলোভনে অনেকেই প্রলোভিত, যেমন ভারত-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকা-এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বহুদেশ, গত কয়েক শতাব্দীব্যাপী।

হালের প্রলোভন কেবল ধর্ম নয়, রাজনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। সেই সঙ্গে ভিন্ন ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ। যেমন দেখা যাচ্ছে ভারতে, ভারতের সাম্প্রতিক রাজনীতির মোড়কে ধর্মের উত্থান। মোদির আমলে প্রবল। এবারের লোকসভা নির্বাচনে সরাসরি প্রত্যক্ষ। হিন্দুত্বের জিগির ‘শ্রী রাম’।

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে, প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীকে, ইতিপূর্বে কেউ কি কখনও দেখেছে অমরনাথ মন্দিরে গিয়ে ভোটে জয়ের জন্যে ধানস্থ হতে? পুজো দিতে? নমো (নরেন্দ্র মোদি) দিয়েছেন। তিনি সফল। গোঁড়া হিন্দু ধর্মীয়রা তাঁর সাফল্যে এককাট্টা। মোদি এটা জানতেন।

যতই গলা ফাটিয়ে বলা হোক, ভারত মিশ্র ধর্মের, মিশ্র সংস্কৃতির, মিশ্র জাতির (রেস) দেশ (মিশ্র ভাষার দেশ অবশ্যই),এই প্রচারণায় চিড় ধরেছে। ফল্গুধারার মতো হিন্দুত্ব বহমান, ভিতরে-ভিতরে, গভীরে। এখন আর ফল্গুধারা নয়, প্রকাশ্যে স্রোতোশীল, গতিময়।

ফল্গুধারার গতি কোন দিকে, কোন মুখী কংগ্রেস, বামদল এমনকি সবজান্তা, সর্বজ্ঞানী ‘দেবী’ মমতাও বুঝতে পারেন নি। নির্বাচনের সব বক্তৃতা, সভায়, হুঙ্কার দিয়েছেন, আশ্বাস দিয়েছেন বিজেপি পশ্চিম বাংলায় একটি আসনও পাবে না, যতদিন আমি আছি। অতঃপর? ১৮ আসন বিজেপি’র।

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টকে হটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিদি, ভেবেছিলেন ‘এদেশে আর কোনও দলের জমিন নেই।’ হয়ে যান সর্বময়ী। ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। ভাবেননি তাঁর তৃণমূল কংগ্রেসে যারা শামিল, আদর্শচ্যুত, নানা দল থেকে আগত, আখের গোছানোই একমাত্র আদর্শ। প্রাণ বাঁচানো ‘মহাধর্ম।’ বাঁচিয়ে লুটেপুটে খাওয়া। রাজনীতি বাহুল্য।

বামপন্থীদের ধূলিসাৎ-ই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান, পয়লা এজেন্ডা। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের আম গেছে, ছালাও গেছে (লোকসভা নির্বাচনে) ঠিকই, কিন্তু, ফল্গুধারায় যে স্রোত, প্রবল থেকে প্রবলতর, হিন্দুত্বে, হিন্দুত্বের ‘শ্রীরাম’-এ, ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। এখন চিৎকার, চিল্লাচিল্লি, ভোটচুরি (রিগিং) বলে, আস্ফালন করে নিজেকেই হাস্যকর করেছেন। ওদিকে, ঘর সামলানো দায়। তৃণমূল কংগ্রেসেরই, তারই বহু ঘনিষ্ঠ, বিজেপি’র দিকে ঝুঁকেছে, বিজেপি’র সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধছে। বাঁধবেই। দলের অধিকাংশই আদর্শহীন, ভিন্ন দল থেকে আগত, গাছের খাওয়ার কর্মী। যথার্থ ক্যাডারও নয়।

মাছ ডুবে-ডুবে জল খায়। কখন উগরায়, কেউ দ্যাখে না। হাঙ্গরের পেছনে-পেছনে ছোট মাছ সারিবদ্ধ, বাঁচার আশায়।

পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়কাল ঘনিয়ে আসছে, ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচন, মমতার তৃণমূলের অস্তিত্ব প্রশ্নের।

‘মমতার রাজত্বেই পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্বের জাগরণ’, বলছেন রাজনীতিক পণ্ডিতকুল। বামফ্রন্টের মতো তৃণমূলের আমও যাবে ছালাও যাবে।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ