আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ সমস্যা

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:১০, জুন ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১২, জুন ০২, ২০১৯

বিভুরঞ্জন সরকারআওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনীতিতে অনেক অসাধ্য সাধন করেছেন। চিরবৈরী বিএনপিকে তিনি ‘সাইজ’ করেছেন। অন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও তিনি নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল তাও দূর হয়েছে। তিনি শত্রুকে মিত্র করার রাজনৈতিক কৌশলে সিদ্ধহস্ত। তবে এতে মিত্ররা বিশ্বাস হারাচ্ছে কিনা, তা নিয়ে তাকে খুব চিন্তিত বলে মনে হয় না। সমালোচকদের কেউ কেউ বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার জন্য নীতি-আদর্শের সঙ্গে আপস করতে পিছপা হন না। রাজনীতিতে বিশ্বব্যাপী একটি নতুন প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আদর্শবাদী অবস্থান দুর্বল হয়ে ক্ষমতায় থাকার কৌশল বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাজনীতিতে ক্ষমতা যেহেতু শেষ কথা, সেহেতু ক্ষমতায় থাকার জন্য যা যা করা দরকার তাই সফলভাবে করতে পারাটাই হালের রাজনীতির ফ্যাশন। এটা যে কেবল বাংলাদেশে শেখ হাসিনা অনুসরণ করে সুফল পেয়েছেন তা নয়, বাংলাদেশের মতো আরও কিছু দেশেও এই রীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের মতো দল কিংবা শেখ হাসিনার মতো নেত্রী কেন ৩০ ডিসেম্বরের মতো একটি নির্বাচনে যেতে বাধ্য হলো বা হলেন তা নিয়ে কোনও গভীর আলোচনা কোথাও হতে শোনা যায় না। শুধু বলা হচ্ছে, দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। মানুষ তার পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারছে না। রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস এখন আর জনগণ নয়। বিভিন্ন গ্রুপ, গোষ্ঠী, এজেন্সি এবং পেশাজীবীরা এখন রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত উৎসে পরিণত হয়েছে। কারা ভোটে জিতবে, কারা সরকার গঠন করবে, তা নির্ধারণের মালিক এখন জনগণ বা ভোটাররা নন। এটা এখন ঠিক করে ওই শক্তিশালী চক্র। ওই চক্রের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা যার হাতে তিনিই আসলে প্রকৃত ক্ষমতাবান। এই যে নরেন্দ্র মোদি ভোটের আগেই বললেন, তিনি তিনশ আসনের বেশি জিতে সরকার গঠন করবেন এবং সেটাই যে সত্য হলো–তা কীভাবে সম্ভব হলো? নরেন্দ্র মোদি কি জ্যোতিষ শাস্ত্র জানেন? না, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। জনগণ ভোট দিয়ে সরকার গঠন করে এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য, সরকার গঠনের কিছু নেপথ্য কারিগরিও আছে। এই নেপথ্য কারিগররা যাকে বা যাদের সরকারকে দেখতে চায় তারাই শেষ পর্যন্ত ভোটে জেতে, তাদেরই ভোটে জেতানো হয়। নরেন্দ্র মোদিকে ভারতীয় ক্ষমতাবানরা ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছে, তার পক্ষে সেভাবেই সব যন্ত্র কাজ করেছে এবং তিনি তার আশানুরূপ ফলও পেয়েছেন। তার গেম প্ল্যান ভালো ছিল। তিনি সফল হয়েছেন।

বাংলাদেশের ব্যাপারটাও অনেকটা সে রকমই। শেখ হাসিনা আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন, আওয়ামী লীগই যে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে, এটা অনেকেরই জানা ছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট আবার ক্ষমতায় আসবে, এটা ছিল কিছু কিছু মানুষের স্বপ্ন-কল্পনা। বিএনপি ছিল ক্ষমতার মোহে অন্ধ। তারা নিজেদের ক্ষমতার আসনে ভাবতে পছন্দ করে। কিন্তু ক্ষমতায় যেতে হলে ক্ষমতার যেসব কেন্দ্রের দোয়া বা ছাড়পত্র লাগে, বিএনপি তা জোগাড়ের চেষ্টা করেনি বা চেষ্টা করেও সফল হয়নি। মানুষ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছে। বিএনপি নানা কারণেই ব্যাপক মানুষের পছন্দের তালিকায় ছিল না। বিএনপিকে মানুষ বড়জোর একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখতে চেয়েছে। কিন্তু মানুষের এই মনের ভাষা বিএনপি বুঝতে পারেনি। আওয়ামী লীগ পেরেছে। তাছাড়া যারা ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে, তারা চেয়েছে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরে আসুক।

আওয়ামী লীগও ভোটের আগে থেকেই জেতার ব্যাপারে ছিল আত্মবিশ্বাসী। তারা যদি অনিয়ম-কারচুপির আশ্রয় না নিতো, তাহলে হয়তো তাদের ভোটের পরিমাণ একটু কমতো। বিএনপি হয়তো ঠিকই ৬০-৭০ আসনে জিততো। কিন্তু তারা সঠিক পথে না হেঁটে ভুল পথে হেঁটেছে। মানুষ যেহেতু আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছে, তাই সেটা বাস্তবে হওয়ায় তারা আর উচ্চবাচ্য করার প্রয়োজন বোধ করেনি। অনিয়মের বিষয়টি মানুষের কাছে প্রাধান্য পায়নি। বিএনপির বিজয় আওয়ামী লীগ ছিনিয়ে নিয়েছে, এমনটা মানুষের কাছে মনে হয়নি। তবে সব মিলিয়ে নির্বাচনকে ঘিরে যা হয়েছে, তা মানুষকে হতাশ করেছে। আওয়ামী লীগের হয়তো একটি পরিকল্পনা ছিল, নির্বিঘ্নে সরকার চালাতে গেলে বিরোধী দলকে দুর্বল করতে হবে। তারা সেটা করেছে। ভোটের পর এখন বিরোধী দলের দিক থেকে কোনও বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা নেই। তবে আওয়ামী লীগের সামনে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজের দল এবং সহযোগী সংগঠনগুলো। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪-দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম দু’দিন আগে বলেছেন, আওয়ামী লীগে ভেজাল ঢুকে পড়েছে। খাদ্যে ভেজাল যেমন মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি দলের ভেজাল একই সঙ্গে দল ও সরকারের জন্যও বিপজ্জনক। দেশে ভেজালবিরোধী অভিযানের সঙ্গে সঙ্গে দলের ভেতরও ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আওয়ামী লীগের এই প্রবীণ নেতা।

তবে আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ। একসময়ের ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটি যেন পণ করেছে, তারা শেখ হাসিনার সব সাফল্য ম্লান না করে ছাড়বে না। তারা নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে নিজেদের জড়াবেই। অপরাধ এবং ছাত্রলীগ একসঙ্গে চলার প্রতিজ্ঞা করে কার্যত সরকারকে এক বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলেছে।

ছাত্রলীগের সর্বশেষ কীর্তি—কমিটি গঠন নিয়ে নাটকীয়তা। ছাত্রলীগের সম্মেলনের প্রায় এক বছর পর ঘোষণা করা হয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি। ৩০১ জনের কমিটি নিয়ে সংগঠনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে অসন্তোষ। কমিটিকে বিতর্কিত বলে আখ্যায়িত করা। পদবঞ্চিত এবং প্রত্যাশামতো পদ না পাওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দেন বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে কমিটি পুনর্গঠনের। অভিযোগ আছে কমিটির ৯৯ জনের বিরুদ্ধে। কিন্তু ছাত্রলীগ ১৯ জনকে বাদ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ১৯ জনের পদ শূন্য ঘোষণা করলেও তাদের নাম প্রকাশ না করায় নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিক্ষুব্ধরা আন্দোলন করছেন। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার আগে ছাত্রলীগের সমস্যা সমাধানের আশা কম। প্রধানমন্ত্রী ফিরেও ছাত্রলীগ সমস্যার কোনো সুষ্ঠু সুরাহা করতে পারবেন বলে অনেকেই মনে করেন না। ছাত্রলীগের অসুখ নিরাময়ের জন্য হোমিও চিকিৎসায় আর কাজ হবে না। বড় অপারেশন লাগবে। সেটা করা হবে, নাকি সাময়িক উপশমের জন্য টোটকা চিকিৎসার ওপরই ভরসা করা হবে, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে এটা বোঝা যাচ্ছে, বিরোধী দল আওয়ামী লীগের স্বস্তি হরণ করতে না পারলেও ছাত্রলীগ সেটা ঠিকই পারবে। এই কাঁটা জুতায় রেখে দিলে আওয়ামী লীগকে এবং সরকারকে ভুগতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ