রোজা থেকে নৈতিক শিক্ষা

Send
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
প্রকাশিত : ১৫:৩৭, জুন ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪২, জুন ০৩, ২০১৯

মো. আবু সালেহ সেকেন্দাররোজার শিক্ষা মুসলিমদের নীতিবোধে উদ্বুদ্ধ করে। মানুষের মধ্যে নৈতিক শৃঙ্খলাবোধ জাগিয়ে তোলে। দীর্ঘ এক মাস নিয়মিত রোজার অনুশাসন ও রীতি-নীতিগুলো পালন করার ফলে মানুষের মধ্যে ভালো কাজ করার অভ্যাস গড়ে ওঠে। কারণ মুসলমানরা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় নিয়তের সঙ্গে পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকার ফলে নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, যা তাকে দুষ্কর্ম, কুচিন্তা, কুমনন, কুইচ্ছা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সাওম পালনের মাধ্যমেই মুমিনের আত্মিক উৎকর্ষও সাধিত হয়। ফলে তার পক্ষে পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা, হানাহানি সৃষ্টি করা ও অন্যের ক্ষতি সাধন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (স.) এরশাদ করেছেন, ‘সবরের মাসের (রমজানের মাস) রোজা এবং প্রতিমাসের তিন দিনের (আইয়্যামে বীয) রোজা হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেয়’ (মুসনাদে আহমদ)। এভাবে রোজা পালনের মাধ্যমে মুমিন মুসলমান তার নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, যা তার চরিত্রের নৈতিক দিক দৃঢ় হতে সহায়তা করে।

ইসলাম ধর্মের অনুসারী সকলের জন্য রোজা ফরজ হওয়ায় এবং ওই ফরজ কাজটি যথাযথভাবে পালনের কঠোর নির্দেশনা থাকায় [তোমাদের যে এ মাসটি পায় সে যেন অবশ্যই রোজা পালন করে (সুরা বাকারা: ১৮৫)] প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক দৃঢ়তা প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পানাহার থেকে বিরত থাকায় ধনীরা গরিবের অনাহারে জীবন-যাপন যে কতটা কঠিন, সেই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে। ক্ষুধার তীব্র দংশন যে কতটা ভয়াবহ তা বিত্তবানরা অনুভব করে। ফলে নৈতিকভাবেই গরিবদের সাহায্য করতে ধনীরা উদ্বুদ্ধ হয়। রোজার সব অনুশাসন ও রীতিনীতি রোজাদারকে সকল প্রকার অবাঞ্ছিত কাজ হতে বিরত থাকতে সাহায্য করে। আল -কুরআনে বলা হয়েছে, ‘রোজা রাখো, যাতে পাশবিক কুপ্রবৃত্তির প্রভাব হতে মুক্ত এবং পরহেজগার হতে পারো (সুরা বাকারা: ১৮)’।

মহানবী (স.) বলেছেন, ‘রোজা একটি ঢালস্বরূপ। সুতরাং রোজা অবস্থায় তোমাদের কেউ যেন অশ্লীল কথাবার্তা ও ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত না হয়। কেউ যদি তার সঙ্গে ঝগড়া করতে চায়, অথবা গালি দেয়; তবে সে যেন দু’বার বলে, আমি রোজাদার’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। এভাবে রোজাদার যখন অশ্লীল কথা-কাজ ও ঝগড়া ফ্যাসাদ থেকে নিজেকে বিরত রাখে, তখন এক মাস ওই কাজ থেকে বিরত থাকায় তার মধ্যে ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে ওঠে ও সচেতনতা তৈরি হয়। পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রতিটি সদস্য এভাবে ইতিবাচক কাজে ও কথায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে, সে কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।

মিথ্যা কথা সকল পাপের জননী। নৈতিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রোজা মিথ্যা কথা বলা থেকে রোজাদারকে বিরত রাখে। হজরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা, মিথ্যা কথা মোতাবেক আমল ও মূর্খতা ত্যাগ করতে পারলো না, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনও প্রয়োজন নেই (সহিহ বুখারি)।’ মিথ্যা কথা বলতে হারাম কথা–মিথ্যা, গিবত, গালি ও অন্যান্য হারাম বাক্যালাপ এবং মিথ্যা কথা মোতাবেক কাজ বলতে মানুষের ওপর জুলুম করা, আমানতের খিয়ানত করা, ধোঁকা দেওয়া, প্রহার করা ও তাদের সম্পদ আত্মসাৎ করা, হারাম গান-বাদ্য ও মিউজিক শ্রবণ ইত্যাদিকে বোঝায়। উল্লিখিত বিষয়গুলো পরিহার আত্মশুদ্ধিমূলক, চরিত্র গঠনকারী ও রোজাদারের জন্য সঠিক পথের দিশারী। তাই যদি কোনও রোজাদার ব্যক্তি বিষয়গুলো পরিহার করতে পারেন এবং এভাবে সমাজের প্রতিটি সদস্য তা অনুসরণ করেন; তবে অচিরেই সমাজ থেকে অনাচার-ব্যভিচার, বিশৃঙ্খলার চির অবসান হবে।

রোজা মানুষের মধ্যে একটি উন্নত ও সম্মানিত জীবনের অনুভূতি সৃষ্টি করে, যা প্রকৃতপক্ষে রোজাদারের অন্তর ও আত্মার খোরাক জোগায় এবং ব্যক্তি জীবনে প্রশান্তির আমেজ বয়ে আনে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ আল-কুরআনে বলেন, ‘আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে প্রশ্ন করে, আমি তো নিকটেই। প্রার্থনাকারী যখন আমার নিকটে প্রার্থনা করে, আমি তার প্রার্থনায় সাড়া দেই। সুতরাং তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক। যাতে তারা ঠিক পথে চলতে পারে’ (সুরা বাকারা: ১৮৬)।

রোজার বিধানটি নতুন না হলেও একথা ঠিক, এই বিধানটি অর্থাৎ এক মাস সাওম পালন ইসলামের প্রথম পর্যায়ে মুসলিমদের জন্য ছিল না। এই বিধানটি প্রবর্তিত হয় মহানবী হজরত মুহাম্মদের (স.) জীবনের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা, অর্থাৎ হিজরতের দুই বছর পর হিজরি দ্বিতীয় সনে বা ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে। ওই সময়ে সুরা বাকারার ১৮৩নং আয়াত [হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর] অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে রোজা মুসলিমদের জন্য ফরজ করা হয়। যদিও ইসলাম ধর্মের অধিকাংশ ধর্মীয় বিধান মহানবীর (স.) মক্কায় বসবাসের সময়, অর্থাৎ হিজরতের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু রোজা সম্পর্কিত ওই বিধান মদিনায় অবতীর্ণ হওয়ার মাহাত্ম্য হিসেবে মনে করা হয়, মক্কায় মুসলিমদের নিজস্ব স্বাধীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হলেও মহানবীর (স.) ইয়াসরিবে হিজরতের পর, অর্থাৎ মদিনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সমাজকে সুসংগঠিত ও কল্যাণমুখী করতে সদ্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী মুসলিমদের দৈহিক ও আত্মিক আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নৈতিক বলে বলীয়ান একজন মুমিন মুত্তাকি হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়ে। পাশাপাশি জাহেলিয়া যুগের অনেক অনৈতিক কাজ পরিহারও অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছিল। ফলে রোজাই যেহেতু মানুষকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রেখে নৈতিক বলে বলীয়ান করে তোলে, সেই কারণে ওই সময়ে মুসলিমদের জন্য এক মাস সাওম পালনের বিধান সদ্য প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সমাজ ও মদিনা রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছিল। তাই নৈতিক বলে বলীয়ান মহানবীর (স.) সাহাবিদের সামনে আত্ম-অহংকারে মশাল উড্ডীনকারী মক্কার কুরাইশরা যুদ্ধের ময়দানে বার বার পরাজিত হয়েছে। তাই বদরের ময়দানে মাত্র ৩১৩ সাহাবি নিয়ে মহানবীর (স.) পক্ষে শক্তিশালী কুরাইশ বাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব হয়েছিল।

রোজা একটি ইবাদত; যা ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভেরও অন্যতম। ফলে রোজা পালনের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও সন্তুষ্টি এবং জান্নাত লাভের আশায় নিজের স্বভাবজাত বস্তু ও অভ্যাস যেমন পানাহার ও যৌনাচার ত্যাগ করে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, মহানবী (স.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘বান্দা একমাত্র আমার জন্যই তার পানাহার বর্জন করে, রোজা আমার জন্যই, আমি নিজেই তার পুরস্কার দেব’ (সহিহ বুখারি)। তেমনি এর মাধ্যমে মন্দ কাজ পরিহার করার যে অভ্যাস তার মধ্যে গড়ে ওঠে, তা সামগ্রিকভাবে তাকে নৈতিক বলে বলীয়ান করে তোলা। মানুষ লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ-ক্ষোভ ও কামভাবের বশবর্তী হয়ে অনেক সময় যেসব মন্দ কাজে লিপ্ত হতো, রোজা তাকে ওইসব খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে শেখায়।

মুসলিমরা যে দীর্ঘ এক মাস রোজা পালন করেছেন, সেই রোজা যথাযথভাবে পালন করেছেন কিনা, তা বোঝা যাবে রোজার পরবর্তী এগারো মাসে তাদের কার্যক্রম থেকে। যদি সত্যিকার কেউ রোজা পালন করে থাকেন, তাহলে তিনি একজন লোভমুক্ত নিরহংকারী মানুষ হবেন। তাই মুসলিমরা সত্যিকার রোজা পালন করেছিলেন কিনা, তা রমজান পরবর্তী এগারো মাসে তাদের কার্যক্রম থেকে বিষয়টি বোঝা যাবে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ