আমাদের পুলিশ বাহিনী

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৬:১৮, জুন ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩০, জুন ০৩, ২০১৯

আমীন আল রশীদগত ২৪ মে রাতে টাঙ্গাইলের গোপালপুরে পুলিশের নির্যাতনে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর ঘটনায় ৮ পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড করার পরদিনই রংপুরে পুলিশ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কৃষকের ধান কেটে দিয়েছে বলে একটি ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হয়।
এর অব্যবহিত আগে রাজধানীর এক পুলিশ কর্মকর্তার মানবিকতার খবরও গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচিত হয়, যিনি একটি সুপারশপ থেকে সন্তানের দুধ চুরি করে পালানোর সময় জনতার হাত থেকে এক বেকার বাবাকে বাঁচিয়ে ছিলেন এবং যার উদ্যোগে ওই সুপারশপেই তার চাকরির ব্যবস্থা হয়।
এইসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসির কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনার ঝড় বয়ে যায় দেশব্যাপী। পিবিআইয়ের তদন্তে নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দি ইন্টারনেটে ছড়ানোর ‘প্রমাণ’ পাওয়ায় তাকে গ্রেফতারে পরোয়ানা জারি করেন আদালত। আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়, ওসি মোয়াজ্জেম একজন সুশৃঙ্খল পুলিশ বাহিনীর সদস্য হয়েও নিয়মবহির্ভূতভাবে ভিকটিমের শ্লীলতাহানির ঘটনার বক্তব্যের ভিডিও ধারণ ও প্রচার করে অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। এর ফলে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।

প্রতিবেদনের মতামত অংশে বলা হয়েছে, মামলার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া সংক্রান্তে বিশেষজ্ঞ মতামত এবং দালিলিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়েছে, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন গত ২৭ মার্চ থানায় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে ভিকটিম নুসরাতের বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করেন, যাতে ভিকটিমের ব্যক্তিগত তথ্যপরিচিতি প্রকাশ পায়। এ অপরাধে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়। এ কারণে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন একজন আইনজীবী। অপরাধ প্রমাণিত হলে আসামির সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।

এভাবে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় এই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিদিনই কোনও না কোনোভাবে সংবাদের শিরোনামে থাকছে। যদিও ভালো সংবাদ শিরোনামের পরিমাণ তুলনামূলক খুবই কম।

সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বরং এই প্রশ্নটিও করা দরকার, রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো যে পুলিশকে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কৃষকের ধান কেটে দেওয়া এবং তা মাড়াইয়ের কাজে অংশ নিতে হচ্ছে? এটা তো পুলিশের কাজ নয়। পুলিশের কাজ মানুষের নিরাপত্তা বিধান এবং অপরাধ দমন। পুলিশের এভাবে কাস্তে নিয়ে মাঠে নেমে যাওয়ার দৃশ্য আপাতদৃষ্টিতে বেশ ইতিবাচক এবং সংবাদ হিসেবে এর বিক্রয়মূল্য ভালো হলেও এটি রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনা ও কৃষিবান্ধব নীতি না থাকারই বহিঃপ্রকাশ। যেমন এর ক’দিন আগেই ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের কাস্তে হাতে মাঠে নেমে কৃষকের ধান কাটার ছবি নিয়েও ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। কেননা অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এখানে কৃষকের ধান কেটে দেওয়ার চেয়ে নিজেদের প্রচারটিই মুখ্য ছিল কিনা।

ধরেই নেওয়া গেলো, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের এই নেতারা এবং রংপুরের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা সত্যিই কৃষকের প্রতি মমত্ববোধ থেকে কাজগুলো করেছেন। কিন্তু এই অস্বাভাবিক কাজগুলো তাদের কেন করতে হলো? কেন কৃষক তার ধান কাটার জন্য মজুরি পায় না। কেন সে তার ধানের দাম পায় না। কেন বাম্পার ফলনের পরও তার উৎপাদন খরচ তোলা দূরে থাক, মণপ্রতি ধানে তাকে দুই থেকে আড়াইশ’ টাকা লস দিয়ে ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে? এখানে সরকারের কৃষিনীতি কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সরকারের তরফে নানাভাবে দেওয়া হয়েছে বটে। কিন্তু সেগুলো নির্বিবাদে মেনে নেওয়া কঠিন।

এবার পুলিশের প্রসঙ্গে আসা যাক। রংপুরে যে পুলিশ সদস্যরা কৃষকের ধান কেটে দিয়েছেন, নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসার দাবি রাখে। রাজধানীর খিলগাঁওয়ে জাহিদুল ইসলাম নামে পুলিশের যে এসির উদ্যোগে একজন বেকার পিতা জনরোষের হাত থেকে বেঁচে একটি সুপারশপে চাকরি পেয়েছেন, সেই পুলিশ কর্মকর্তাও অভিবাদনযোগ্য। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও অসংখ্য মানুষ তার এই মানবিকতার প্রশংসা করেছেন।

আমরা স্মরণ করতে পারি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীতে পুলিশের আগুন দেওয়ার ভিডিও যখন টেলিভিশনে প্রচার হয়, ওই একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত একটি শিশুকে কোলে হাসপাতালে দৌড়ে যাওয়া একজন পুলিশ কনস্টেবলের হৃদয়স্পর্শী ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ওই পুলিশ সদস্যের নাম শের আলী।

আবার এর কয়েকদিন আগেই ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় কলেজ জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনের সময় পুলিশের বেধড়ক পিটুনিতে নিহত হয়েছিলেন আবুল কালাম আজাদ নামে একজন শিক্ষক। তার কয়েকদিন আগে কিশোরগঞ্জে এক আসামিকে ক্রসফয়ারের ভয় দেখিয়ে তার পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন এক এসআই, সেই খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। এর বাইরে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন স্থানে তথাকথিত ক্রসফায়ার বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যারা নিহত হন, তাদের কতজন সত্যিই অপরাধী আর কতজন নিরীহ—সেই হিসাব বের করা মুশকিল। অনেক সময় খুনের কূলকিনারাও করা যায় না।

আমরা মনে করতে পারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল কাদেরের কথা, যাকে থানার ভেতরে নিয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছিলেন ওসি। আমরা মনে করতে পারি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বির কথা, যাকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করেছিল পুলিশ। আমরা মনে করতে পারি সিটি করপোরেশন কর্মকর্তা বিকাশের কথা, মধ্যরাতে বাসায় ফেরার পথে যাকে বেধড়ক পিটিয়েছিল পুলিশ। আমরা মনে করতে পারি সরকারি কর্মকর্তা এহসানুর রহমানের কথা, যিনি পকেটে পরিবারের সদস্যদের পাসপোর্ট নিয়ে বাসায় ফেরার পথে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে পুলিশের হাতে নাজেহাল হয়েছিলেন এবং উপস্থিত জনতার সহায়তায় সে যাত্রা বেঁচে গিয়েছিলেন।

এসব ঘটনার পরে পুলিশকে ক্লোজড বা প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। খুব ব্যতিক্রম ছাড়া অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে বহাল তবিয়তে চাকরি করেন। ফলে অপরাধের পর পুলিশকে ক্লোজড করা হয়েছে বলে যে সংবাদ আসে, তাতে সাধারণ মানুষ আস্থা পায় না। কেননা রাষ্ট্রের আইনগুলোই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সুরক্ষিত করে। ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধের’ নামে তাদের অনেক বড় বড় অপরাধের শাস্তির হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। প্রকাশ্যে কোনও নাগরিককে পিটিয়ে হত্যা বা গুলি করে মেরে ফেললেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এটি প্রমাণ করে দিতে পারে, নিহত ব্যক্তি বা তার দোষরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়েই তারা পাল্টা গুলি চালায়। প্রতিটি ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের পরে এই একই স্ক্রিপ্ট মানুষের এখন মুখস্থ। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যত অপরাধই করুক, খুব ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের শাস্তির মুখোমুখি করা কঠিন।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বছরের পর বছর নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে নাগরিকদের মনে পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে যে ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে, তা সুখকর নয়। যে কারণে জঙ্গি দমন থেকে শুরু করে অনেক ভালো কাজ করার পরও পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের গড়পরতা ধারণা খুবই খারাপ। যে কারণে পুলিশ যখন নিজ ইচ্ছায় কৃষকের ধান কেটে দেয়, কিংবা একজন বেকার যুবকের চাকরির জন্য উদ্যোগ নেয়, সেসব ভালো কাজ নিতান্তই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকে।

বলা হয়, বাংলাদেশের পুলিশের যে আইনি ক্ষমতা এবং তাদের যে দক্ষতা, তাতে তারা যেকোনও অপরাধীকেই দ্রুত ধরে ফেলতে পারে। রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী রিশা হত্যার পরে তার সহপাঠীদের আন্দোলনে গিয়ে রমনা জোনের সহকারী কমিশনার শিবলি নোমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীকে ধরা হবে। হয়েছেও তাই। ৪৮ ঘণ্টার আগেই নীলফামারী থেকে গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্ত ওবায়দুলকে।

স্মরণ করা যেতে পারে শেখ সেলিম নামে একজন পুলিশ কর্মকর্তার কথা, যার উদ্যোগে পাবনার সাত উপজেলায় বিসিএসে উত্তীর্ণ ৩৭ জনের ভেরিফিকেশন করতে গিয়ে পুলিশ কোনও পয়সা নেওয়া তো দূরে থাক, উল্টো ফুল ও মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিল প্রার্থীদের বাসায়। রাজধানীতে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের সাহায্য করা ও সেখানকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য শবনম আক্তার পপি নামে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে সামাজিক যোগাযোগে রোলমডেল হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন অনেকে। এর আগে মার্কেটে যৌন হয়রানির শিকার নারীদের পুলিশি সহায়তার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। কিন্তু এই শের আলী, শেখ সেলিম, জাহিদুল ইসলাম কিংবা শবনম আক্তাররা এখনও পুলিশ বাহিনীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ নন। প্রতিটি থানা এখনও আতঙ্কের জায়গা।

একজন সাধারণ মানুষ, যার টাকা-পয়সা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব নেই, তিনি কোনও একটি কাজে থানায় যেতে ভয় পান। কোনও অপরাধের বিচার চাইতে গেলে উল্টো পুলিশ তাকে বিপদে ফেলবে কিনা, এই আতঙ্ক এখনও সাধারণ মানুষের মনে কাজ করে।

তবে পরিস্থিতি যে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে, তাও ঠিক। কেউ এখন প্রথমবার থানায় জিডি করতে গেলে তার জন্য একটা ফরম্যাট তৈরি করা হয়েছে। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এখন বিসিএসের মাধ্যমে যেসব তরুণ পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই পেশায় সৎ থাকার চেষ্টা করছেন এবং পুলিশ বাহিনীকে সত্যিকারের জনবান্ধব বাহিনীতে পরিণত করার কাজে ভূমিকা রাখছেন বলে শোনা যায়।

তারপরও এটা ঠিক, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় যে ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, হানাহানি এবং দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে; যেখানে খুব ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ রাজনীতিবিদ সৎ নন; যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট; যেখানে সেবাগ্রহীতার তুলনায় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সংখ্যা নগণ্য—সেসব দেশে পুলিশের কাছে মানুষের প্রত্যাশ্যার সঙ্গে প্রাপ্তির ব্যবধান ঢের। আবার এও ঠিক, পুলিশ সম্পর্কে বছরের পর বছর যে পারসেপশন বা ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটি এক দিনে, এক মাসে কিংবা এক বছরেই দূর হয়ে যাবে, এমনও নয়।

পুলিশকে অবশ্যই অপরাধীরা ভয় পাবে। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ, যার অর্থবিত্ত নেই, রাজনৈতিক প্রভাব নেই, তিনি কেন পুলিশকে ভয় পাবেন? তিনি কেন যেকোনও বিপদের সম্মুখীন হলে বা বিপদের আশঙ্কা করলে পুলিশের কাছে নির্ভয়ে গিয়ে আশ্রয় পাবেন না? পুলিশকে সাধারণ মানুষের আস্থাভাজন করতে রাষ্ট্র কি পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছে, নাকি রাষ্ট্র জনগণের মনে পুলিশ সম্পর্কে একটা ভীতিকর ধারণাই বহাল রাখতে চায়, যাতে তার সুবিধামতো রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় এই বাহিনীকে ব্যবহার করতে পারে?

অনেক সময় বলা হয়, মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে চাকরি পেতে হয় এবং পুলিশের অর্থনৈতিক সুবিধা কম বলে তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন হলো বেতনভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথা জেনে লোকে পুলিশে যোগ দেয়। আবার গত কয়েক বছরে সরকারের অন্যান্য বিভাগের মতো পুলিশ বাহিনীতেও বেতনভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ব্যাপক হারে বেড়েছে। কিন্তু তাতে কি পুলিশের ভেতরে সুশাসন ও জবাবদিহিতা বেড়েছে? দুর্নীতি কমেছে?

কম বেতন হলেই মানুষ দুর্নীতি করে, এটিও একটি ভুল ধারণা। অধিকাংশ কম আয়ের মানুষই দুর্নীতিগ্রস্ত নন। আবার যিনি দুর্নীতি করবেন, তার বেতন যতই বাড়ানো হোক, তিনি অবৈধ পথে পা বাড়াবেনই। এটা নির্ভর করে তার মানসিকতা, রুচি ও অভ্যাসের ওপর। ভোগবাদিতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। আবার অনেকে সুযোগের অভাবে সৎ, এ কথাও ঠিক। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা ও আইনি কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে প্রজাতন্ত্রের কোনও কর্মচারীকে দুর্নীতি করতে না হয় এবং করার সাহস না পায়। কিন্তু রাষ্ট্র সেই কাজটি ততক্ষণ পর্যন্ত করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিজেদের অবৈধ ও অন্যায় কাজের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করবে।

রাষ্ট্রে আইনের শাসন নিশ্চিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রথম কাজটি আসলে পুলিশের। অপরাধ দমনে পুলিশ যদি সত্যিই আন্তরিক হয় এবং তারা নিজেরা দুর্নীতিমুক্ত থেকে সত্যিকারের অপরাধীদেরই শুধু ধরে; তারা যদি ঘটনার সঠিক তদন্তপূর্বক বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট আদালতে দেয়; তারা যদি টাকার বিনিময়ে পক্ষপাতমূলক তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া বন্ধ করে এবং টাকার জন্য নিরীহ মানুষকে হয়রানি না করে, তাহলে দেশ বদলে যেতে সময় লাগবে না। এজন্য প্রথমে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অর্থাৎ সরকারগুলো যদি পুলিশকে প্রতিপক্ষ দমনে পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার বন্ধ না করে এবং নিজেদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড জায়েজ করতে পুলিশকেও অনৈতিক পথে যেতে বাধ্য করে, তাহলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা তো দূরে থাক, বিচ্ছিন্নভাবে পুলিশের কিছু ভালো কাজ সংবাদ শিরোনাম হবে বটে, তা সামগ্রিক পরিস্থিতি পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখবে না।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ