ছুটির বিড়ম্বনা!

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৭:৪৪, জুন ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৯, জুন ০৯, ২০১৯

চিররঞ্জন সরকারউৎসবে-অনুষ্ঠানে, ঈদে কিংবা পূজায় বাড়ি ফেরাটা আমাদের অভ্যাস। পরিবারের সবার সঙ্গে মিলিত হওয়ার একটা দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা আমাদের মধ্যে কাজ করে। এর জন্য যারপরনাই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পোহাতে হয় বেহাল সড়কে পথে পথে চরম ভোগান্তিও। সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। বাস-ট্রেনের শিডিউলেও বিপর্যয় ঘটে। এতসব দুর্ভোগ উপেক্ষা করে মানুষ ঈদ-উৎসবের জন্য নাড়ির টানে বাড়ি ফেরে। বসে, দাঁড়িয়ে, প্রয়োজন হলে পায়ে হেঁটে আপনজনের কাছে পৌঁছাতেই হবে। উৎসবে যারা রাজধানী থেকে গ্রামে ফিরতে চান, তাদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় আগাম টিকিট সংগ্রহ করতে গিয়ে। ফিরতেও একই বিড়ম্বনা। সঙ্গে যোগ হয় বাস খাদে পড়া কিংবা লঞ্চডুবিতে সলিল সমাধি অথবা অজ্ঞান-মলম পার্টির খপ্পরে পড়ার আশঙ্কা।
এবার অবশ্য মানুষজনকে তুলনামূলক অনেক কম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দ্বিতীয় মেঘনা সেতু ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু চালু, কোনাবাড়ী ও চন্দ্রা ফ্লাইওভার, কালিয়াকৈর, দেওহাটা, মির্জাপুর ও ঘারিন্দা আন্ডারপাস এবং কড্ডা-১, জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা মহাসড়কে সেতু চালু, ঢাকা-পঞ্চগড় রুটে ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ নামে স্বল্পবিরতির আন্তঃনগর ট্রেন চালু ইত্যাদি কারণে সড়ক পথে এবার ভোগান্তি কম। এ ছাড়া যারা ৩ জুন ছুটি ম্যানেজ করতে পেরেছেন, তারা টানা ৯ দিনের ছুটি ভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন। মানুষজন পর্যায়ক্রমে ঢাকা ছাড়ায় এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ভোগ অনেক কম পোহাতে হয়েছে।

এসব উৎসবে-অনুষ্ঠানে আমরা অনেক আনন্দ করতে চাই। ভালো খেয়ে-পরে পরিবারের সবাই মিলে একত্রে কাটাতে চাই। তাই তো উৎসবকে ঘিরে আমাদের কত পরিকল্পনা। কত স্বপ্ন, অপেক্ষা। যদিও অনেকের জীবনে উৎসব-অনুষ্ঠান সীমাহীন বিড়ম্বনা, টাকার শ্রাদ্ধ, অতৃপ্তি আর অবসাদ ছাড়া নগদ তেমন কিছুই দিতে পারে না। কোনও কোনও মধ্যবিত্তের কাছে উৎসব-অনুষ্ঠান এক আপদ ও আতঙ্কের নাম। এর অবশ্য অনেক কারণ আছে।

উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে হলে আরও অনেক কিছু যোগ করতে হয়। সবার আগে আসে টাকার প্রশ্ন। উৎসবে সবাই চায় একটু ভালো পরতে, ভালো খেতে। কিন্তু সীমাবদ্ধ আয়ের মধ্যবিত্তকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য বিধান করতে গিয়ে ভীষণরকম সমস্যায় পড়তে হয়। সন্তানরা যে যেমনটি চায়, তেমনটি বাজেট স্বল্পতার কারণে দেওয়া সম্ভব হয় না। তারপরও কথা থেকে যায়। নিজের বাবা-মা, ভাইবোনকে সন্তুষ্ট করা গেলো তো শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে নাখোশ করতে হয়। আবার শ্বশুরপক্ষীয় আত্মীয়দের মন জোগাতে গেলে অন্যরা বেজার হয়। খাওয়া-পরার ব্যাপারটা কোনও রকমে সামাল দেওয়া গেলেও বেড়ানোর ব্যাপারটা এখন কিছুতেই ম্যানেজ করা যায় না। এখন মধ্যবিত্তরা ভ্রমণপিপাসু হয়ে উঠেছে। উৎসবে-অনুষ্ঠানে শুধু জামা-কাপড়-জুতা আর খাবারদাবারেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন ঘুরতে বা বেড়াতে যাওয়াটাও অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই এখন ঈদের ছুটিতে দেশের বাইরে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এখানেও সমস্যা–কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন। এ ব্যাপারে বাবা-মা’র সঙ্গে সন্তানদের মতের মিল হয় খুব সামান্য ক্ষেত্রেই। অনেক পরিবারে আবার সন্তানরা বাবা-মার সঙ্গে ঘুরতে যেতে চায় না। বন্ধুবান্ধবরা মিলে নিজেদের মতো করে ঘুরতে চায়। বাবা-মা সায় না দিলে রীতিমতো বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি আসে। এই বিগড়ানো সন্তানদের বশে রাখাটাই তখন অভিভাবকদের প্রধান দায় হয়ে পড়ে!

ঈদ-পূজা-উৎসব এলে অনেকে তাই বিপন্ন হয়ে পড়েন। কী করবেন, কোথায় যাবেন, সন্তানদের কীভাবে ম্যানেজ করবেন, আত্মীয়-স্বজনদেরই বা কীভাবে বুঝ দেবেন, বাড়তি টাকার জোগাড় কীভাবে হবে—এসব নিয়ে অতিরিক্ত টেনশন সৃষ্টি হয়।

এমনিতে উৎসবের মৌসুম মানে শুধু আনন্দ নয়, অবসাদেরও। মনোচিকিৎসকেরাও তা-ই বলেন। উন্নত বিশ্বে টানা ছুটির সময়ে তাদের চেম্বারে অবসাদে ভোগা রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ে। আমাদের দেশেও দিন দিন এই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এই অবসাদের একটা নামও আছে—‘হলিডে ব্লুজ।’ ছুটির মধ্যেই গেঁথে থাকে সেই অবসাদের শিকড়। বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, ইউরোপ-আমেরিকার বহু দেশে ক্রিসমাস-নিউইয়ার বা অন্য ছুটির সময়ে আত্মহত্যার হার বেড়ে যায়।

কেন যায়? কারণ, আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা নিঃসঙ্গ, বন্ধুহীন, যারা হৈ-হুল্লোড়, ভিড়ভাট্টা একটু এড়িয়ে যেতে চান। তারা প্রাত্যহিক ব্যস্ততার মধ্যে এক ধরনের খাপ খাইয়ে নেন। কিন্তু সেই মানুষগুলোর কাছে বাড়তি ছুটি মানেই তাদের বুক দুরদুর। টিভির পর্দায়, পাড়ার আলোচনায়, অফিসের গল্পে, খবরের কাগজের পাতায় তখন শুধু কত অসামান্যভাবে ছুটি কাটানো যায় তার হাজারো ফিরিস্তি। কী খাওয়া বা কেনা যায়, কোথায় সবান্ধব যাওয়া যায়, আনন্দে কত পেগ ডুব দেওয়া যায় তার বিশদ বিবরণ। সেই একাকী মানুষগুলো ছুটি কাটানোর কোনও যুৎসই পরিকল্পনা করে উঠতে পারেন না, ফলে প্রায় কুঁকড়ে কানচাপা দিয়ে বসে থাকার উপক্রম হয়। ছুটিই তাদের ঘাড় ধরে আরও একবার বুঝিয়ে দেয় যে, সুস্থ সামাজিক কাঠামোর চলতি সংজ্ঞায় তাঁরা একা, অস্বাভাবিক, বেমানান বা আপাংক্তেয়। নিজের মনের ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ক্রমশ বিষাদের গহনে চলে যেতে থাকেন তারা।

মনোবিদরা বলেন, ‘হলিডে ব্লুজের’ অন্যতম কারণ হলো, যেভাবে ছুটি কাটাতে চাইছি, যতটা আনন্দ করতে চাইছি, সেটা পারছি না। যদি আনন্দের আস্বাভাবিক লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়, তাহলে সেটা পূরণ না হওয়াই স্বাভাবিক। তাতেই সমস্যা বাড়ে। ছুটি এলেই তাকে ‘সর্বকালের সেরা’ বানানোর প্রবণতা থাকে অনেকের। শেষমেশ তা পূরণ হয় না, আশাভঙ্গে অবসাদ আসে। প্রথমত সব আনন্দের টার্গেট পূর্ণ হলো না বলে অশান্তি, দ্বিতীয়ত ছুটি শেষ হয়ে আবার গতানুগতিক কাজের রুটিন শুরু হয়ে গেলো বলে নিরাশা।

এ ক্ষেত্রে ছুটির ‘প্রায়রিটি’ ঠিক করাটা সবচেয়ে আগে দরকার। সেই সঙ্গে, এই ছুটিটাকেই আমাকে সর্বোৎকৃষ্ট বলে প্রমাণ করতে হবে এমন চিন্তা ভেঙে বেরোতে হবে। উৎসবের মৌসুম ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকবার আসে। যথেষ্ট আনন্দ এবার না হলে অন্যবার হবে। একমাত্র উৎসবের সময়েই যাবতীয় আনন্দ লুটে নিতে হবে এমন দিব্যিও তো নেই। বছরের অন্য সময়েও তা করা যায়। অন্য সবার মতো ছুটি উদযাপন করতে পারছেন না বলে নিজেকে অত্যন্ত বঞ্চিত মনে করার কোনও কারণ নেই। শুধু লোক দেখানো উপায়ে নয়, নিজের মতো করেও ছুটি উদযাপন করা যায়, তাতেও আনন্দ হয়, আর সেটা মনকে বোঝানোর দায়িত্ব নিজেরই।

ছুটির আশাভঙ্গের অন্য প্রকারও থাকে। ধরুন, মা-বাবা পরিকল্পনা করলেন ঈদের ছুটির দিনগুলো মেয়ের সঙ্গে বাড়িতে হৈ-হুল্লোড় করে কাটাবেন। কিছু ভালো ভালো পদ রান্না, একসঙ্গে নাটক-সিনেমা দেখা, আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যাওয়া, একসঙ্গে গল্প। কিন্তু মেয়ের আগে থেকে বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা। সে ‘সরি’ বলে দিলো। অন্য পক্ষের চারপাশে তখন একটা একটা করে বাতি নিভতে থাকলো। কিংবা ধরা যাক এক পরিবারে চার-পাঁচ জন সদস্য। সবাই নিজের পছন্দ অনুযায়ী ছুটি কাটাবেন ঠিক করেছেন। মধ্যবয়স্ক দম্পতি ভাবছেন সবাইকে নিয়ে কক্সবাজার ঘুরে আসবেন, তাদের বয়স্ক বাবা-মায়ের ইচ্ছা, একবার দেশের বাড়ি গেলে হয়। সদ্য কৈশোর পেরুনো নাতির ইচ্ছে, এই ক’টা দিন বন্ধুবান্ধব মিলে দাপিয়ে পার্টি করা। কে কার মন রাখবে? কে নিজের ইচ্ছাকে বলি দেবে? মানবিকতার দায়ে কেউ যদি আত্মত্যাগ করেও, ভেতরে ভেতরে তারও আফসোস হয়, ইস, অমূল্য ‘মি টাইম’ হেলায় নষ্ট হলো!

অনেককে দেখেছি ছুটির দিনে বাড়তি লোকজন, বাড়তি রান্নাবান্নার হাঙ্গামার ভয়ে কেমন যেন কুঁকড়ে যান। নিজের মতো করে সময় কাটানোর আনন্দ, রুটিনমাফিক চলাফেরার ছন্দ পতনের আশঙ্কায় তারা উৎসবের ছুটিতে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

উৎসবের ছুটিতে বিচিত্র বিড়ম্বনায় পড়েন বহু বর্ষীয়ান মানুষ। যৌবনের বিভিন্ন ছুটি কাটানোর রঙিন স্মৃতি স্তূপ হয়ে রয়েছে তাদের মস্তিষ্কে। মন বারে বারে সেই ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরতে চাইছে। কিন্তু এখন পুরনো ভ্রমণসঙ্গীরা নেই, শরীরের সেই জোর নেই, কিংবা সাধ্য নেই টাকা সংস্থানের। ছুটির মৌসুম মানে তাদের কাছে হারিয়ে ফেলা সময়ের যন্ত্রণা নিয়ে মনের অ্যালবাম উল্টে চলা।

আরও বিড়ম্বনায় বৃদ্ধাশ্রম, সংশোধনাগার বা কারাগারের বাসিন্দারা। চারদিকের ছুটির উৎসবে তারা কেমন যেন দিগ্‌ভ্রান্ত, অচ্ছুৎ। 

ছুটি তাই সবার জন্য সমান আনন্দ-উৎসবের বার্তা বয়ে আনে না, অনেকের কাছে ছুটি মানে বিভীষিকা, ছুটি এলে তাদের মনপ্রাণ ছটফট করতে থাকে, কত তাড়াতাডি আবার রুটিনবদ্ধ হওয়া যায়!

মানুষের জীবনটা আসলে অনন্ত সমস্যার সমাহার। অনেকে কয়েকটা দিন ছুটির জন্য হা-পিত্যেশ করেন। আবার অনেকে লাগাতার কয়েক দিনের ছুটি পেলে বড় ধরনের ফ্যাসাদে পড়ে যান! মানুষের বিচিত্র জীবনের বিচিত্র সব সমস্যা থেকে পরিত্রাণের পথ কীভাবে মিলবে তা হয়তো কেউই জানেন না!

লেখক: কলামিস্ট

/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ