সবার ঈদ

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৩:৪৩, জুন ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৮, জুন ০৯, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাবছর ঘুরে আবার ঈদুল ফিতর এসেছে। ঈদ মুসলিম উৎসব হলেও বাঙালির কাছে সর্বজনীন। আর সব উৎসবের মতো এই উৎসবও বৃহত্তর সমাজ চৌহদ্দিতে মিলেমিশে একাকার। ছোটবেলায় যখন ঈদ আসতো, তার প্রস্তুতি চলতো আমাদের অনেকদিন ধরেই। নতুন জামা কাপড়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের পাড়াটাকে সাজানো, রঙিন করার নেশা ছিল আমাদের। আজও স্মৃতিটানে ছবির মতো ধরা আছে—কলোনির জীবন, সেই ভোর থেকে শুরু হয়ে দিনশেষের আলোয় আমাদের কলরব। উৎসব যেন শেষ হওয়ার নয়, এমন করে উদযাপনের প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু শেষ হতে হতো। আমাদের উৎসব শেষের দৃশ্য ছিল বন্ধুরা মিলে কোনও এক বাসায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের আনন্দমেলা দেখতে দেখতে বিজ্ঞাপনের বিরতিতে ঢুলতে ঢুলতে বাসায় ফেরা। সব আনন্দমুখরতারই শেষটা হয় মৌন বিষাদে। ঈদ চলে যাওয়া ছিল তেমনই বিষাদের।

রোজা শেষে ঈদ আসে। মুসলমান সম্প্রদায় একটি মাস সিয়াম সাধনা করে এই উৎসবে শামিল হয়। স্বাভাবিক কারণে এর একটি ধর্মীয় দিক তো আছেই। কিন্তু সমাজের বৃহত্তর পরিসরে ঈদ উৎসব শুধু নামাজের আয়োজন নয়। আমাদের প্রতিটি উৎসবে থাকে মানুষকে ভালোবাসা, মানুষের বোধ আর মমত্বের মেলবন্ধন বাড়ানো।

ঈদ এলেই মানুষ এই শহরটি ছেড়ে ছুটতে থাকে প্রিয়জনের উদ্দেশে। এই প্রাণপণ ছুটে চলা শুধু প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করা নয়। তারা গ্রামকে আলিঙ্গন করতে চান। কারণ, বাংলাদেশের গ্রাম আর গ্রামের মানুষ খুব সুন্দর। তারা ভালোবাসায় আর মমত্বে সজীব। এ কারণেই সাম্প্রদায়িক শক্তির বিভাজনের চেষ্টা সত্ত্বেও ঈদ, পহেলা বৈশাখ, দুর্গাপূজাসহ সব উৎসবে গ্রামীণ আমজনতা একাত্ম।

আমাদের এটাই উৎসব সংস্কৃতি। আমাদের সব উৎসবে এই সাংস্কৃতিক উপাদান সংগঠিত ও স্পষ্ট। গ্রাম সংস্কৃতির এই চর্চা আমাদের ঐতিহ্য। কিন্তু উৎসব সব জায়গায় সমানভাবে আসে না, এবারও আসেনি। শহরের ঈদ, এমনকি আজ অনেক গ্রামেও ঈদের আনন্দ একটি নতুন বিত্তবান শ্রেণির দখলে চলে গেছে। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ করার সুযোগ সীমিত। এবার গ্রামে ঈদ এসেছে, কিন্তু আমাদের অর্থনীতির প্রাণ কৃষকের ঘরে ঈদের আনন্দ নেই। শস্যের দাম পান না তারা। তাদের উপার্জনের একটিই উপায়—শস্য বিক্রি। তাদের উৎপাদিত শস্য ঘরে ঘরে ঈদের বিশেষ আয়োজন, কিন্তু তাদের ঘরে শূন্যতা। আমরা আশা করেছিলাম বিষয়টির সুরাহা ঈদের আগেই হবে, কিন্তু হয়নি।

আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অনেক সমস্যা আছে, আছে অনেক সংকট। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ শরিক হন। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী প্রিয়জনকে নতুন পোশাক ও উপহার সামগ্রী কিনে দেন। যারা সারা বছর জীর্ণ পোশাকে থাকেন, তারাও ঈদের দিনে সন্তানদের গায়ে নতুন পোশাক পরাতে চান। একটি শক্তি আছে যারা এই সর্বজনীন উৎসব চায় না। তারাই ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঈদের কয়েকদিন আগে হামলা করেছিল ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফেতে, হত্যা করেছিল বিদেশি দেশি মানুষকে। তারা ঈদের দিন হামলা করেছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া মাঠে। তবে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃঢ়তায়, মানুষের ঐক্যে সেই সহিংস উগ্রবাদীরা বাংলাদেশে সফল হতে পারেনি।

কিন্তু একটি ভয় ঠিকই কাজ করে। এই সহিংস সাম্প্রদায়িক শক্তি আবার কখন কোনও আচরণ করে। ধর্মীয় উৎসব পালনে অধিকাংশের এরকম উৎসাহ থাকার পরও ভয়টা এখনও আছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল উদার আর অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে যে পাকিস্তানি ভাবধারার শাসন ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, সেই ধারায় জেনারেল জিয়া আর এরশাদের আমলে বাংলাদেশকে পরিপূর্ণ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র করার একটা প্রচেষ্টা ছিল ২১ বছর। রাষ্ট্রের ভূমিকা হওয়া উচিত ধর্ম বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকা। রাষ্ট্রের সকল নাগরিক যাতে তাদের পছন্দমতো ধর্ম পালন করতে পারেন তা দেখা। রাষ্ট্র পাহারাদার। কিন্তু আমরা দেখলাম রাতারাতি সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম সংযুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে হাঁটছে দেশ। ধর্মের ঠিকাদার এরশাদ এই কাজ করেছেন। জিয়া আর এরশাদের অপশাসনে রাজনৈতিক দলগুলো অতিমাত্রায় সাম্প্রদায়িক হওয়ার ব্যস্ততায় আছে। সাম্প্রতিককালে তো রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে কে কত বড় মুসলিম তা প্রমাণের।

আমরা বিশ্বাস করতে চাই, ধর্মাচরণ একান্ত ব্যক্তিগত, অন্যদের বিরক্ত করা নয়, অত্যাচার করা নয়। ধর্মের জিঘাংসায় কী ভয়ঙ্করভাবে মুক্তমনা ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক প্রকাশকদের হত্যা করা হয়ছে তা আমরা দেখেছি। কিন্তু তবুও দিনশেষে উৎসব আসে সবার হয়েই। কারণ, দেশের অনেকে রাজনীতিকদের এসব কারসাজিতে ডুবলেও সাধারণ মানুষ সহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক।

ঈদ সবার জীবনে আনন্দ বয়ে আনুক। সব উৎসবই হয়ে উঠুক আমাদের শুভেচ্ছা ও সম্প্রীতির সংস্কৃতি। ঈদ আসে, যায়। একটু আমোদে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে আরও একটু বেশি বেশি ভালো থাকতে চায় সবাই। মানুষ মেতে থাকতে চায় নিরাপদ উৎসবে, পার্বণে, ছুটিতে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ