কেমন হলো ঈদযাত্রা

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:৪০, জুন ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৮, জুন ০৯, ২০১৯

শান্তনু চৌধুরীগতকাল (৪ জুন) রাতটা ছিল একই সঙ্গে আনন্দের আবার উদ্বেগেরও। এর কারণ ঈদ কবে হবে সেটা নিয়ে দ্বিধা। আগের দিন সৌদি আরবসহ আরও অনেক দেশে ঈদ উদযাপন হয়েছে। এর সঙ্গে মিল রেখে আমাদের দেশের কয়েকটি এলাকায়ও ঈদ উদযাপন হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান ঘোষণা দিয়েছে বুধবার ঈদুল ফিতরের। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায়, বুধবার বাংলাদেশে ঈদ হবে। কিন্তু রাত আটটা পেরুনোর পরও যখন ঘোষণা এলো না চাঁদ দেখা কমিটির পক্ষ থেকে, তখন সবার মধ্যে শুরু হয় উদ্বেগ। ঈদ হবে তো? বাসে ট্রেনে লঞ্চে থাকা পরিচিতজনেরা বারবার জানতে চান ঈদ হবে কিনা? ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছিলেন, বৃহস্পতিবার ঈদুল ফিতর। ওই সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমে প্রকাশের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে থাকে পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার খবর। পরে দ্বিতীয় দফা ব্রিফিংয়ে রাত ১১টার দিকে তিনি প্রথম দফা ব্রিফিংয়ের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী উপজেলা ও লালমনিরহাটের পাটগ্রামে চাঁদ দেখা গেছে। বুধবার ঈদ। সংবাদকর্মী হিসেবে রাতের ডিউটি ছিল, তাই এ নিয়ে অভিজ্ঞতাটা ভালোই হয়েছে এবং সেটি শেয়ার করলাম পাঠকের সাথে।

এর আগে যারা যাত্রাপথে ছিলেন তারা ঠিক বিশ্বাসই করতে চাইলেন না ঈদের তারিখ ফের পাল্টেছে। আবার কেউবা জেনেছেন রাতে সেহরি খেতে ওঠে। এই প্রতিনিয়ত উদ্বেগের কারণ একটাই— আমাদের পদ্ধতিগত ক্রটি। ঈদে উদ্বেগটি শুরু হয় মূলত প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঘরমুখো মানুষের যাত্রার সময় থেকেই। সেই আলোকে বিচার করতে পারি কেমন হলো এবারের ঈদযাত্রা। কিছুটা স্বস্তির, কিছুটা অস্বস্তির মেনে নিয়েও বলা যায়, প্রিয়জনের সাথে ঈদটা কাটানো যাচ্ছে। যদিও ফিনল্যান্ডে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, উন্নয়নের কারণে দেশের মানুষ এবার স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পেরেছেন।
সড়ক পরিবহনমন্ত্রী চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেই ঘোষণা দিলেন এবারের ঈদযাত্রা হবে সবচেয়ে স্বস্তির। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই তিনি একই কথা বলেছেন। এবার অবশ্য এর পেছনে আরও একটি কারণ যুক্ত হয়েছে। প্রায় টানা নয়দিন ঈদের ছুটি। সে কারণে লোকজন একসাথে বাড়ি যাননি। সে হিসেবে বলা যায়, অন্যান্যবারের চেয়ে এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তির। কিন্তু ঝামেলা হয় ৩ ও ৪ জুন। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে এই দুদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোকজনকে যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। এমনও হয়েছে, মঙ্গলবার সকালে যানজট প্রায় ৩০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ জনতা ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে আগুন দিয়েছে। ঈদের আগের দিন যানজট ছিল সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ে এবং মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট থেকে প্রায় আট কিলোমিটার।

যাত্রীবাহী যানবাহনের বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ তো রয়েছেই। এছাড়া বিআরটিএ যে চার্ট দিয়েছে তা কোনও বাস কাউন্টারেই মানেনি। শেষ মুহূর্তে যে যেভাবে পেরেছে ভাড়া নিয়েছে। লোকাল বাস, রুট পারমিট নেই এমন বাসও চলেছে। ৪৩ সিটের বাসে যাত্রী নেওয়া হয়েছে প্রায় ৭০ জন। তেমনি ঘটেছে দুর্ঘটনাও। গেলো ছয়দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৪২ জনের। লোকাল বাসগুলো বা ট্রাকে বাড়ি ফেরা মানুষগুলো মন্দের ভালো হিসেবে যেটা করেছে তা হলো যাত্রীচাপ কিছুটা কমিয়েছে। ৩ জুন বিকাল থেকে যে যানজট শুরু হয়েছিল সেটার প্রভাব ছিল ৪ জুন দুপুর পর্যন্ত। আবার গাড়ির জন্য হাহাকারের বিষয়টিও নজরে পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রায় রাস্তার ওপর থাকা বাস কাউন্টারগুলো ৩১ মে থেকে বন্ধ করে দেওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। প্রধানমন্ত্রীর এবারের ঈদ উপহার ছিল দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়কের দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতু চালু করা। এতে ঈদযাত্রার ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। খুশি এ পথের যাত্রী ও চালকরা। তবে ঢাকা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়কে দুর্ভোগ এবারও পিছু ছাড়েনি। দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে বৃষ্টির পানি। কারণ, এই পথে বিআরটিএ প্রকল্প, সড়ক উন্নয়ন, সড়কের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে। ঈদ উপলক্ষে কাজ বন্ধ থাকলেও যেহেতু মেরামত শেষ হয়নি সে কারণে দুর্ভোগও শেষ হয়নি। এমন দুর্ভোগ যে পথে পথে নানা জায়গায় হয়নি তা নয়। তবে আগের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা, যেটি অনেক সময় একদিনও পেরিয়ে যেতো, যানজটে সেটি না থাকায় শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফেরায় শান্তি। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ৯ মে মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে ৩২টি পদক্ষেপ নিয়ে এগুনোর কথা জানিয়েছিল। এরমধ্যে ছিল মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলো যানজটমুক্ত রাখা, টার্মিনালগুলোয় শৃঙ্খলা রক্ষায় ভিজিলেন্স টিম গঠন, দুর্ঘটনার পর সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়কে অস্থায়ী বা ভাসমান বাজার অপসারণ, মহাসড়কের অপব্যবহার বন্ধ করা, বিকল্প সড়ক ব্যবহার, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং বন্ধ করা, নসিমন-করিমন, ইজিবাইক, থ্রি-হুইলার বন্ধ করা, টোল প্লাজার সব বুথ খোলা রাখা, ২২টি জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার বন্ধ রাখা, বিআরটিসির স্পেশাল সার্ভিস চালু করা, ফেরির সংখ্যা বৃদ্ধি, দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দ্রুত অপসারণের জন্য রেকার ও ক্রেন প্রস্তুত রাখা, অনভিজ্ঞ চালক দিয়ে মহাসড়কে গাড়ি না চালানো, পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মহাসড়কে পার্কিং করে লোড-অনলোড না করা। প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল যাত্রী কল্যাণ সমিতিও। বলা যেতে পারে পুরোটা সফল না হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সড়ক বিভাগ সফল। আর তাই অতোটা অস্বস্তি হয়ে দেখা দেয়নি এবারের সড়কপথের ঈদযাত্রা। তবে মোটরসাইকেলে ঈদযাত্রা নিষিদ্ধ করা এবং গার্মেন্টস ও অন্যান্য শিল্প কলকারখানায় রেশনিং পদ্ধতিতে ছুটির ব্যবস্থা করা যেতো। লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক দিয়ে গাড়ি চালানোর পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল করতে দেওয়ার ক্ষেত্রে অতোটা কড়াকড়ি দেখা যায়নি, যতটা প্রশাসন মুখে বলেছে।
সংবাদমাধ্যমের ভাষায় যদি শিডিউল বিপর্যয়ের কথা বলে থাকি সেটা হাড়ে হাড়ে এবার টের পেয়েছেন ঈদের ট্রেনযাত্রীরা। প্রথমদিকে রেলমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে পরবর্তীতে ঠিক হবে জানালেও ঈদযাত্রার শেষ দিন পর্যন্ত এই বিপর্যয় অব্যাহত ছিল। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনগুলোর। মিনিট বা এক ঘণ্টার হিসাবে থাকলে সেটা যাত্রীরা মেনে নিচ্ছিলেন, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেন দেরিতে এসেছে এবং দেরিতে ছেড়েছে। কেন এমনটা হয়েছে? কারণ, ট্রেনে নতুন মন্ত্রী আসার পর যাদের নিয়োগ বা যাদের বদলি করে চলতি দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে তাদের বেশিরভাগই এই যাত্রার সঙ্গে অনভিজ্ঞ। এতে শুরু থেকে টিকিট কাটা নিয়ে যেমন ঝামেলা হয়েছে, তেমনি অস্বস্তি ছিল ট্রেন যাত্রায়ও। আর নতুন অ্যাপসের কথা বলাই বাহুল্য। সেটি দুর্ভোগ কমানোর পরিবর্তে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। মুফতে লাভ হয়েছে কালোবাজারিদের। কাজেই সেই স্বস্তির আশায় মানুষ ট্রেনযাত্রা বেছে নেয় সেটি হরিষে বিষাদে রূপ নিয়েছে। এর বাইরে গাদাগাদি করে লোক নেয়া, ট্রেনের ছাদে করে যাওয়া তো ছিলই।

একই রকম ভোগান্তি ছিল লঞ্চে করে যারা বাড়ি গিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রেও। ৩ জুন ভোর থেকে শুরু করে ৪ জুন দুপুর পর্যন্ত সদরঘাট এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। তিল ধারণের যেন ঠাঁই নেই। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার লাখ লাখ মানুষ গার্মেন্টস কর্মী। একই দিনে সব পোশাক কারখানায় ছুটি হওয়ার প্রভাব পড়েছে রেলের ওপর। অথচ গেলো বছরও আলাদা আলাদা দিনে ছুটি দেয়া হয়েছিল। যেটা এবারও অব্যাহত রাখা উচিত ছিল। ৩ জুনই লঞ্চে ঢাকা ছেড়েছেন প্রায় আট লাখ মানুষ। লঞ্চ না থাকায় সারা রাত মানুষের অপেক্ষাও দেখতে হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ ঘোষণা দিয়েও তাদের কথা রাখতে পারেনি। কারণ, সমন্বয়ের অভাব ছিল। ৩ জুন ১৭৫টি লঞ্চ দেওয়ার কথা থাকলেও দেড়শ’ লঞ্চও দিতে পারেনি তারা। বেপরোয়া মালিকরা মানেনি রোটেশন। তাছাড়া ভিড়ার জন্য সদরঘাটে লঞ্চের তুলনায় পন্টুন অনেক কম থাকায় একটি লঞ্চ আরেকটি লঞ্চকে ধাক্কা দেয়। এতে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে পাথর মারামারিও। প্রকৃতপক্ষে পুরো ব্যবস্থাপনা বদল করতে হবে পুরোটা স্বস্তির ঈদযাত্রা করতে হলে। নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে লঞ্চগুলোকে। সদরঘাটের মতো ছোট্ট একটা ঘাট দিয়ে এতো এতো লোক চলাচল করা বা এতগুলো লঞ্চ ভিড়ানো বাস্তবিকপক্ষেই অসম্ভব। ঘাট বাড়ানোর কথা বা বিকল্প কোনও উপায় চিন্তা করা যেতে পারে।

প্রতিবার ঈদ এলে সবকিছু ঢেলে সাজনোর কথা হয়, নিয়মনীতি তৈরি করার কথা হয়, কিন্তু বছর পেরিয়ে যায়, কাজ আর হয় না। অনিয়মে ঘিরে ধরে পুরো ব্যবস্থাকে। এই গলদটা কেন খুঁজে বের করাটা জরুরি। ঈদুল আজহা হবে বা এক বছর পর আবারও ঈদুল ফিতর উদযাপন হবে সেটা জানা কথাই। কাজেই ঈদযাত্রা যাতে ঝক্কি-ঝামেলাহীন হয় সেই দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকেই। সেই পরিকল্পনা করতে হবে যথাসময়ে। ঈদযাত্রা শুরু হলেই তড়িঘড়ি করে ঝটপট সমাধান সাময়িকভাবে সুন্দর দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে সেটি কোনও সুফল বয়ে আনে না। এতে জনগণের অর্থ আর শ্রমিকদের শ্রমের অপচয় হয় মাত্র। 

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ