চাঁদ বিতর্ক ও রোজার ফজিলত

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:০১, জুন ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৭, জুন ০৯, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীচাঁদ দেখা কমিটি প্রথমে জানালো বুধবার মানে ৫ জুন ঈদ হবে না। ঈদ হবে পরদিন বৃহস্পতিবার। আবার রাত ১১টায় বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত দিলো ঈদ হবে বুধবার। মধ্যখানে সারাদেশে ঈদ নিয়ে একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলো। সব খবর নিয়ে বৈঠক শেষ করলে হয়তো বা বিভ্রান্তিটা হতো না। চাঁদ নিয়ে এই বিভ্রান্তি যুগের পর যুগ চলে আসছে। বিভ্রান্তিটা পাকিস্তান থেকে পাওয়া। বাংলাদেশের মতো সেখানেও এই চাঁদ দেখা বিতর্ক এখনও অব্যাহত আছে।
পাকিস্তান আমল থেকে এই সিতারা কমিটির বিভ্রান্তিমূলক সিদ্ধান্তের কারণে গোটা দেশে ঈদ উদযাপন নিয়ে দ্বিধাবিভক্তিও দেখেছি। এর আগে নব্বই দশকেও একবার গভীর রাতে ঈদের ঘোষণা এসেছিল চাঁদ দেখা নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে।
চট্টগ্রাম, বরিশাল ও চাঁদপুরে একদল মুসলিম আছে, তারা যেদিন সৌদি আরবে ঈদ হয়, সেদিনই ঈদ উদযাপন করে। চট্টগ্রামের সৌদি অনুসারীরা মির্জারখিল পীর সাহেবের মুরিদ। চাঁদপুর আর বরিশালের সেই ঈদ উদযাপনকারীরা কোন পীরের অনুসারী জানি না। আসলে ইসলামি শরিয়তের হুকুম হলো রমজানের চাঁদ দেখে রোজা আরম্ভ করা আর শাওয়ালের চাঁদ দেখে তা শেষ করা। তাই চাঁদ নিয়ে মাসের হিসাব হয় বলে রোজা কোনোবার ২৯টি আবার কোনোবার ৩০টি পালন হয়।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের মাধ্যমে কোন দেশে কখন নতুন চাঁদ দেখা যাবে, তা বহু আগে থেকেই হিসাব করে বলে দেওয়া সম্ভব। তারপরও কেন বাংলাদেশের চাঁদ দেখা কমিটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাহায্য নিচ্ছে না, বুঝে আসে না। ধর্মীয় উৎসবের তারিখ নির্ধারণের জন্য ইসলামে যে বিধান আছে, তার সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনও বিরোধ নেই। এমনকি সারাবিশ্বের মুসলমানরা চাইলে একই দিনেও পালন করতে পারেন তাদের ধর্মীয় উৎসব।

নব্বই শতাংশ মুসলমান রোজা পালন করে। ঘরে ঘরে সেহেরি-ইফতারের আয়োজন রোজা এবং ঈদের আনন্দকে বাড়িয়ে দেয়। আমার এক সাত বছরের নাতিও এবার ছয়টি রোজা রেখেছে। ঘরের সবাই কিছু খায় না, তাই বলে সেও খায় না। আসলে এমনিভাবেই মুসলমান ঘরের ছেলেমেয়েদের রোজার অভ্যাস গড়ে ওঠে। রোজা এক কঠিন ইবাদত। লোক দেখানো কেউ রোজা থাকে না। আসলে আল্লাহর হুকুম পালনের জন্য মানুষ আল্লাহর ভয়ে রোজা করে। দুপুরে ভাত খেলে এমন কোনও আইন নেই যে তাকে জেলে যেতে হবে, অথচ সে ভাত খায় না।  রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সব ভয় খারাপ, শুধু আল্লাহর ভয় ছাড়া।’ সম্ভবত সে কারণে আল্লাহ বলেছেন, তিনি নিজ হাতে রোজাদারদের পুরস্কার প্রদান করবেন।

মানুষের মধ্যে আল্লাহ-ভীতি প্রবেশ করলে সে অন্যায় কাজ করা থেকে বিরত থাকে। হজরত ইলিয়াস (র.) তাবলিগ জামাত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মানুষের মধ্যে আল্লাহ-ভীতি জাগানোর জন্য। দশকের পর দশক তবলিগওয়ালারা সেই কাজে মেহনত করে আসছিলেন। মানুষের দুষ্ট চরিত্র পরিবর্তনে তাদের মেহনতের কার্যকারিতাও দেখেছি। দুর্ভাগ্য যে, তবলিগওয়ালারাও এখন কান্ধলভি আর অ-কান্ধলভি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেছে। তাদের উচিত আত্মকলহ বন্ধ করে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। কারণ, তবলিগ জামাত দীন প্রচারে এবং মুসলমানদের মধ্যে পাপবোধ জাগিয়ে তুলতে খুবই কার্যকর ভূমিকা বিশ্বব্যাপী পালন করে আসছিল। দিল্লির আশপাশের মুসলমানরা আগে নামাজও পড়তো, লক্ষ্মীপূজাও করতো। লক্ষ্মীপূজা দিতো নাকি সম্পদের জন্য। ইলিয়াস (র.) তা দেখে দীন পালনের ত্রুটি তাড়াতে তবলিগ জামাত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

হজরত মোহাম্মদ (সা.) ইসলাম প্রচারের আগেও দুনিয়ার মানুষের মধ্যে আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা ছিল। হজরত মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর ইবাদতের নিয়ম পদ্ধতি বিশুদ্ধভাবে মানুষের কাছে প্রচার করেছেন। শিরিকমুক্ত তৌহিদবাদ মানুষকে শিক্ষা দিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। ইসলামের প্রথম যুগে বহু যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে। মুসলমানরা নিজের পয়সা খরচ করে যুদ্ধে যোগদান করেছেন, আর আত্মত্যাগ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। তাবুকের যুদ্ধ হয়েছিল বাইজানটাইন সম্রাটের আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে গিয়ে। সেই যুদ্ধে হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সৈন্য সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। সবাই ছিলেন স্বেচ্ছাসেবী, নিজে নিজের খরচ সামাল দিতেন আবার গরিব সাথীদের খরচও প্রদান করতেন। এই আত্মত্যাগের মহান ব্রতের অনুশীলন আরম্ভ হয় রোজা পালনের মধ্য দিয়ে। রোজা ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলোর মধ্যে একটি।

অনেকে দিদারে এলাহির সাধনা করে থাকেন। এই সাধনায়ও রোজা পালন করতে হয় নিরবচ্ছিন্নভাবে। আধ্যাত্ম্যবাদের সাধনায় খ্যাতিলাভ করেছেন বহু মুসলিম সাধক। হজরত আবদুল কাদের জিলানি, খাজা মইনুদ্দিন চিশতি প্রমুখ সাধনার পথে রোজাকে অবলম্বন করে অগ্রসর হয়েছিলেন। আধ্যাত্মিক সাধনায় গ্রিক দার্শনিকদের অনেকে বহুবিদ পথের সন্ধান দিয়েছেন। প্লেটো এ পথে অনেকদূর অগ্রসর হয়েছিলেন। তিনি সার্বভৌম এক বিশ্বআত্মায় বিশ্বাসী ছিলেন। প্লেটো মুসলিম সাহিত্যে আফলাতুন নামে পরিচিত, যেখানে তাকে প্রায় একজন নবীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

ইসলামিক আধ্যাত্ম দর্শনের অনেক শীর্ষস্থানীয় গুরু এ বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাদের মাঝে ইবনে সিনা অন্যতম। তার গ্রন্থের মধ্যে আল ইশারাত ওয়া আল তানবিহাত অন্যতম। এসব গ্রন্থে আধ্যাত্মিক সাধনার প্রাথমিক স্তরে রোজা পালনের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং, রোজার গুরুত্ব অপরিসীম। খাজা মইনুদ্দিন চিশতির পীর খাজা ওসমান হারুনী তিন দিন উপবাস পালন করে একটি নফল রোজা রাখতেন। আর দুই আঙুলকে চামচ বানিয়ে তিন চামচ পায়েস দিয়ে ইফতার করতেন। আধ্যাত্ম সাধনায় রোজা অপরিহার্য। যেহেতু এর পুরস্কার আল্লাহ নিজ হাতে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাই পরমাত্মা আল্লাহর সঙ্গে মানবআত্মার সম্মিলনে রোজা বাহন হবে না কেন!

এবার বাংলাদেশে মুসলমানরা রোজা পালন করেছে প্রায় ১৬ ঘণ্টা। আল্লাহ সবার রোজা কবুল করুন এবং উত্তম প্রতিদান দান করুক। আমিন। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ