বার্লিন কার্নিভাল: দুই বাংলা একাত্ম

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৫:৩১, জুন ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৩, জুন ০৯, ২০১৯

দাউদ হায়দার‘তোমাদের কার্নিভাল গোটা দেশব্যাপী, একদিনে। সকাল থেকে সন্ধ্যে। চমৎকার কার্নিভাল। মেয়েদের সাজগোজ চোখ কাড়ানিয়া। খোঁপায় ফুল, গলায় ফুল, হাতের কব্জিময় ফুল। এবং বাহারি ফুল। মেয়েদের পরনে রঙবেরঙের শাড়ি, সালোয়ার কামিজ। কপালে টিপ। অনেকে আবার হিজাবও পরে। মেয়েদের পোশাক আব্রুহীন নয়, বরং পুরোপুরি শালিনতায় আচ্ছাদিত। ছেলেরা তথা পুরুষেরা মুখোশ পরে, নানা রকম মুখোশ। আমরাও কিছু মুখোশ কিনেছি। তোমাদের কার্নিভাল শুরু হয় সকালে, ‘টাগোর সং’ দিয়ে। বহু গায়ক-গায়িকার সমাবেশ মঞ্চে। সমবেত কণ্ঠে গীত। আমরা বাংলা ভাষা জানি না, বুঝি না। শ্রোতাদের অনেকেই, গায়ক গায়িকার গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাইছিলেন, অনেকেই গুন গুন করছিলেন, অনেকেই মাথা দোলাচ্ছিলেন, বোধ হয় গানের সুরে।
তোমাদের ঢাকার রমনা পার্কে লোকেলোকারণ্য, ঢাকার রাজপথেও। ঢাকার পথে-পথে (রমনা পার্কের আশেপাশে) হরেক পসরা, বিক্রিবাট্টা। আমরা ‘এথনিক দুল’ কিনেছি। কটন শাল কিনেছি। কী যেন ওই শালের নাম? হ্যাঁ, মনে পড়ছে, বলে ‘ওরোনা’ (ওড়না)। তোমাদের কার্নিভালের একটি নামও আছে ‘মনগল জোভাইয়াত্রা’ (মঙ্গল শোভাযাত্রা)। এটা কেবল বছরের একদিনে। এই দিনে তোমরা বরণ করো তোমাদের বাংলা নববর্ষ। কিন্তু যা-ই বলো, এই দিনে বড্ড বিশ্রী গরম, ঘামে অস্থির, গা প্যাঁচ প্যাঁচ করে। কড়া রোদ, চাঁদি ফেটে যায়। উপরন্তু গোটা শহর দূষণে ভরপুর। নিশ্বাসে টান লাগে। ইউরোপে আমরা নববর্ষ আবাহন করি সন্ধ্যে থেকে, শহর আলোকিত, রাত্রি বারোটা বাজার সঙ্গে-সঙ্গে আতশবাজির রকমারি, সঙ্গে আবার কানফাটানো পটকা। এও তো শব্দদূষণ, পরিবেশ দূষণ। গত বছর, একত্রিশে ডিসেম্বর, সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশিত, আতশবাজি, পটকা কেনা বাবদ খরচ হয়েছে ১৩১ মিলিয়ন ইউরো। পরিবেশবাদীরা এই নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু কে বন্ধ করবে। সরকারও নিশ্চুপ। বছরের একটি দিনে মানুষের আনন্দ-উৎসবে মানুষের সাধআহ্লাদে হস্তক্ষেপে মানবাধিকার লঙ্ঘন।

আমাদের কার্নিভাল তোমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কতটা ভিন্ন, নিশ্চয় ভালো জানো তুমি। এবং জানো ব্রাজিলসহ ল্যাটিন আমেরিকার কার্নিভালের চেহারাচরিত্রেও মিল নেই।’

–বলছিলেন বার্লিনের দুই তরুণী। নাম এমিলিয়া ফিজেলবাগ। মেলিশা ফন হিল্ডেনব্যার্গ। দুজনের বয়স পঁচিশের কমবেশি হতে পারে। বয়স জিজ্ঞেস করিনি। দুজনেই বার্লিন ফ্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। দুজনেই বাংলার (বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা) ‘এথনিক কালচার’ নিয়ে গবেষণা করছেন। বিশেষত, ভারত ভাগের পরে (১৯৪৭) বাংলার এথনিক কালচারে পটপরিবর্তন। সমাজ-রাজনীতি এবং ধর্মের কতটা প্রভাব এথনিক কালচারে। এমিলিয়া ও মেলিশা এ বছর ঢাকায় গিয়েছিলেন পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষের আবাহন, উদযাপন, বরণ এবং এথনিক কালচারের রূপারোপ দেখতে। দেখে মনে হয় ওঁদের, ‘বাংলার কার্নিভাল (নববর্ষ) ধর্মীয় অনুষঙ্গের ঊর্ধ্বে। সামাজিকতায় আত্মিক। ব্যবসা-বাণিজ্যও যুক্ত।’

ইউরোপসহ খ্রিস্টধর্মীয় দেশে কার্নিভাল মূলত খ্রিস্টধর্মবোধ থেকে। এর সঙ্গে বসন্তকালীন আনন্দোৎসব, বিচিত্র বেশভূষা, শোভাযাত্রা, প্রমোদ যুক্ত। ইউরোপ বা খ্রিস্টধর্মীয় দেশে একই ধাঁচের কার্নিভাল নয়। ব্রাজিলের রিও-তে দেখি কার্নিভালে উদ্দাম সাম্বা নাচই মূলত। পোশাকেও (মেয়েদের) আব্রুতা কম। ইদানীং আরও বেশি।

‘আমাদের পোশাকে চিরকালীন দেশীয় ঐতিহ্য’, বললেন রেহানা জান্নাত, তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ির। আরও বললেন, ‘আমার কন্যা প্রেয়তির জন্যে নববর্ষে যে পোশাক কিনেছি, বাংলার রূপ-ছাপ ঝলমলে। দেখলে চোখ ঝলসে যাবে মশাই, আবহমান বাংলারই ধারক আমরা।’

জার্মানির বিভিন্ন রাজ্যের কার্নিভাল একই দিনে, একই মাসে নয়। ভিন্ন রাজ্যের ভিন্ন এথনিক কালচারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বার্লিনের নিজস্ব ‘এথনিক কালচার’ বলতে কিছু ছিল না (বার্লিন ছিল প্রুশিয়া রাজ্যের অন্তর্গত)। দুই বার্লিন একত্রিত হওয়ার কিছুকাল পরে বার্লিনের সিনেটর (সাংস্কৃতিক দফতর) ‘বার্লিন কার্নিভাল’ আয়োজন করে। এই আয়োজনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ শামিল। উদ্দেশ্য নানা দেশের কালচারের সঙ্গে- হোক তা এথনিক- একাত্মতা। মাল্টি কালচারের সামাজিক সমন্বয়। কোনও ভেদাভেদ থাকবে না। আসলে, মাল্টি কালচারের নামে রাজনীতিও। ভিন্নমাত্রার সমীকরণ।

চলতি মাসের ৭ তারিখ থেকে ‘বার্লিন কার্নিভাল’ শুরু। চলবে সোমবার (১০ জুন) পর্যন্ত। রবিবারে, সারা দিনব্যাপী, শোভাযাত্রা। পৃথিবীর নানা দেশের অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ, ভারতও। বিচিত্র সাজে, বিচিত্র পোশাকে। ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ অধিকতর জাঁকজমক, ঝলমলে। নাচে-গানে বাংলাকে প্রদর্শন। দুই বাংলার নাচিয়ে গাইয়েরা সমবেত, একাত্ম। ধর্ম, রাজনীতি নেই। পরস্পর আত্মিক মিলন। অটুট বন্ধন।

‘তোমাদের কার্নিভালের রূপরস আলাদা, বার্লিন সংস্কৃতির অঙ্গ এখন’, বলছিলেন এমিলিয়া এবং মিলিশা, ‘আমরাও ক্রমশ বাংলার সংস্কৃতিতে লীন হচ্ছি।’    

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ