আমাদের পৃথিবী

Send
ইকরাম কবীর
প্রকাশিত : ১৮:৫০, জুন ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৫, জুন ০৯, ২০১৯

ইকরাম কবীরঅনেক দিন ধরেই শুনছি, পড়ছি। আমাদের পৃথিবীকে আমরা নিজেদের ক্ষণিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। অনেকে অবশ্য তা মানতে চান না। নিজেদের ধ্বংসাত্মক কাজ কতটা বিধ্বংসী হতে পারে ধারণা নেই বলেই হয়তো তেমন ভাবতে পারেন। তবে আমাদের নিজেদের দিকে তাকালেই বোধহয় তা কিছুটা বোঝা যাবে। মুনাফা এবং আমাদের চারপাশের একটি মেলবন্ধন না করতে পারলে বোধহয় এ পৃথিবীকে ঠেকানো যাবে না।
আমার নিজের ছেলেবেলার কথাই ধরি না কেন! আমি যখন বড় হচ্ছিলাম তখন কলের গাড়ি কম ছিল। মানুষও ছিল সাত কোটি বা সাড়ে-সাত। দিনের বেলা চারপাশে ঝোপঝাড়, পোকামাকড়, শাপ-বেজি, বনবেড়াল আর  শিয়াল। রাতে ঝিঁঝিপোকা আর জোনাকি; মাঝে-মাঝে ঘাসের ওপর পা পড়লে কেঁচোর উপস্থিতি টের পাওয়া যেতো। খালে মাছ ধরতে হাঁটুপানিতে নামলে জোঁক যাপটে ধরতো। নদীতে ছিল খরস্রোত। একবার পাঁকে পড়ে গেলে আর রেহাই নেই। ইঞ্জিনের নৌকা চালু হয়নি তখনও। নদীর পানিই বাড়ি নিয়ে যেত সবাই। পুরুষদের স্নানও সেখানেই। বাড়ির পাশে পুকুর। সেখানে মাছ থাকলে তার পানির ব্যবহার এক রকম, না থাকলে আরেক রকম।

তবে তখন দরিদ্র মানুষ বেশি ছিল। ৭৪’ সালে এক দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। সদ্য-স্বাধীন এক বাংলাদেশকে অনেক দেশ মেনে নিতে না পারায়, তারা আমাদের দেশে খাদ্য রফতানি থামিয়ে রেখেছিল। শুধু খাদ্য নয়, অনেক দিক থেকেই বাংলাদেশকে অবহেলা সহ্য করতে হয়েছে। সেই থেকেই হয়তো আমাদের শিক্ষা। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতেই হবে; সবার জন্যে খাদ্যের ব্যবস্থা করতেই হবে; আমাদের পণ্য রফতানি করে বিদেশ-মুদ্রা আয় করতেই হবে।

কিন্তু সেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে গিয়ে আমাদের অনেক কিছু খোয়াতে হয়েছে। আমাদের মাটির ঊর্বরতা হারিয়ে গেছে, মাটিতে রাসায়নিক বাসা বেঁধেছে। কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য আমাদের নদীতে মিশে গিয়ে নদীর পানি আর পানি নেই, অন্য কিছুতে রূপান্তরিত হয়েছে। ডেইলি স্টার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে দেখলাম, বিশ্বের নদীগুলোতে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে। আমাদের নদীগুলো তাদের মধ্যে অন্যতম। এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কেনিয়া, ঘানা, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার মতো বাংলাদেশের নদীগুলোও মারাত্মকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক দূষণের শিকার।

প্রতিবেদনটি বলছে, বাংলাদেশের একটি স্থানে বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক মেট্রোনিডাজলের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়েও ৩০০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। তাহলে আমরা যে নদীর মাছ এত  আগ্রহ নিয়ে খাই, তা কেমন আছে? শুধু অ্যান্টিবায়োটিক নয়; নদীতে আছে আরও অনেক রাসায়নিক পদার্থ। নদীগুলোর পানি দেখলেই বোঝা যায়, তা ঠিক নেই।

আমাদের বনগুলো কী অবস্থায় আছে? পত্র-পত্রিকায় তেমন খবরা-খবর দেখি না। সারা দেশে জ্বালানি-গ্যাস নেই। কাঠই তো পোড়াতে হচ্ছে রান্নাবান্না করার জন্য, শীতে উত্তাপ পোহাতে। যে সংখ্যক গাছ আমরা ধ্বংস করছি তা পূরণ করছি কিনা।

ঈদের দিন ছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ঈদের কারণে আমরা দিবসটি উদযাপন করতে পারিনি। শুধু ঈদ নয়; এ দিবসটি আমরা খুব একটা আন্তরিকতার সঙ্গে উদযাপন করি না। আগে দেখতাম গাছ লাগানো হতো।

গাছ লাগানো নিয়ে একটি গল্প বলি। ফিলিপাইনের ছাত্রছাত্রীরা উচ্চবিদ্যালয় এবং কলেজ পেরুনোর আগে গাছ রোপণ করেন। এটি সে দেশের অনেক দিনের ঐতিহ্য। এবার তাদের সরকার আইন করে দিয়েছে, সবাইকে উচ্চবিদ্যালয় এবং কলেজ পেরুনোর আগে দশটি করে গাছ লাগাতে হবে। ধরুন, সে দেশে প্রতি বছর দু’লাখ ছাত্রছাত্রী উচ্চবিদ্যালয় এবং কলেজে যাবে। তারা সবাই যদি দশটি করে গাছ লাগায় তাহলে কতগুলো গাছ হয়। নিশ্চয়ই অনেক। আমরা কি করতে পারি না এ কাজ?

থাইল্যান্ড মনে করে বিশ্বের অনেক দেশের মতোই তাদের দেশেও বনাঞ্চল হারিয়ে যাচ্ছে। সে কারণেই ২০১৩ সালে তারা গাছগাছালি ভালো হয় এমন একটি অঞ্চলে বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করেছিল। গাছের বীজের বোমা। ফিতসানুলোক নামক একটি স্থানে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে তারা নয় লাখ বীজের বোমা দেগেছিল। তাদের কাছে মনে হয়েছে, এটিই স্বল্পসময়ে বেশি গাছ রোপণের একটি উত্তম পন্থা। এ বছরের শেষে বোঝা যাবে তাদের এই প্রকল্প সফল হবে কিনা। সফল হলে তারা প্রতি পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে এ কাজ করবে।

আমরা কি এমন কিছু করবো? না বোধ হয়। অন্যকে দেখে কিছু করলে বেমানান লাগতে পারে।

দেশে প্লাস্টিক ব্যবহারের মহোৎসব চলছে। চারদিকে প্লাস্টিক। বাজারে প্লাস্টিক, বাড়িতে প্লাস্টিক, স্কুলে প্লাস্টিক, কলেজে প্লাস্টিক– কোথায় নেই। এ প্লাস্টিক মাটিতে গলে না, চারদিকের নর্দমায় জমে গিয়ে বর্জ্য- পানি আর কোথাও যেতে পারছে না। পুকুরে প্লাস্টিক, খালে প্লাস্টিক, নদীতে প্লাস্টিক– এমনকি সাগরেও প্লাস্টিক। কিন্তু এই প্লাস্টিক পরিষ্কার করার কেউ নেই।

ভারতের আসামে আকশার ফোরাম নামে একটি সংগঠন একটি স্কুল চালু করেছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের বেতন দিতে হয় প্লাস্টিক দিয়ে। শিক্ষার্থীরা বেতন দিতে পারেন শুধু প্লাস্টিকের বর্জ্য দিয়ে। শিক্ষার্থীরা একবার ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্যগুলো নিজেদের বাড়ি থেকেই সংগ্রহ করে। প্রতি সপ্তাহে স্কুলে ২৫ টুকরা করে প্লাস্টিক তাদের বেতন হিসেবে জমা দিতে হয়। প্রচলিত শিক্ষা আর কারিগরি প্রশিক্ষণকে একসাথে মিলিয়ে তৈরি হয়েছে স্কুলের পাঠ্যক্রম।

ব্যাপারটি একটু অন্যরকম মনে হলেও এটি সবার ভেতরে আগ্রহের সঞ্চার করছে যে প্লাস্টিক যেখানে-সেখানে ফেলে না দিয়ে একটি স্থানে রাখলে তা পরিবেশের জন্য ভালো।

ভিয়েতনামের অং হাট কো নামে একটি প্রতিষ্ঠান ফলের রস, ঠান্ডা পানীয়, লাচ্ছি খাওয়ার জন্য প্লাস্টিকের বদলে ঘাস দিয়ে স্ট্র তৈরি করে তা বিক্রি করছে। এই লম্বা ঘাস সে দেশের খালে-বিলে এমনি-এমনি জন্মে। এই ঘাস জোগাড় করে এই নলাকার স্ট্র’র ভেতরে-বাইরে মানব-ব্যবহারের জন্যে পরিষ্কার করে তা বাজারজাত করে। এখন তারা স্ট্র তৈরি করার জন্যে আরও উপাদান খুঁজছে, যা ব্যবহারের পর ফেলে দিলে মাটিতে মিশে যেতে পারে।

আমরা প্রায় সবাই পুরনো বই কাগজওয়ালার বিক্রি করে দেই অথবা ফেলে দেই। সেই ফেলে দেওয়া বই থেকে হয়তো আবারও কাগজ তৈরি হয় অথবা অন্য কিছু। তুরস্কের আংকারার চাংকায়া এলাকার পরিচ্ছন্ন-কর্মীরা একটি চমৎকার কাজ করেছেন। তারা ফেলে দেওয়া বইগুলো নিয়ে একটি পুরোদস্তুর লাইব্রেরি বানিয়ে ফেলেছেন। সে লাইব্রেরিতে এখন ৬ হাজার বই হয়েছে। তাদের কাজের সার্থকতা দেখে পাড়ার মানুষ ও এলাকার মেয়র আরও বই নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। এলাকার মানুষ লাইব্রেরিটি ব্যবহারও করছেন।

আমরাও উন্নয়ন করছি। কিন্তু আমাদের উন্নয়ন টেকসই হচ্ছে কিনা, আমাদের উন্নয়নের জন্য অন্যভাবে চড়া কোনও মূল্য দিতে হচ্ছে কিনা তা ভেবে দেখার এখনই সময়। একটি পণ্য তৈরি করতে গিয়ে মূল্যবান অন্য কিছু ধ্বংস করে ফেলছি কিনা তা কতটুকু খেয়াল করছি? হয়তো উন্নয়নের মাদকতায় আমরা চারপাশে কী কী ধ্বংস করছি তা খেয়াল করার সময় পাচ্ছি না। তবে পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ নিজেদের ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় অনেক কাজ করে যাচ্ছেন এই পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। সে কারণেই এসব উদাহরণ দেওয়া।

আমাদের দেশেও হয়তো তেমন অনেক কাজ হচ্ছে, তবে আমরা খুব একটা জানতে পারছি না। যদি জানতাম তাহলে সেগুলো আমাদের সামনে উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে যেত।

আরেকটি উদাহরণ দিয়ে লেখাটি শেষ করি। মনোজ ভর্গভ নামে এক ভারতীয় একটি সাইকেল বানিয়েছেন, যা এক ঘণ্টা চালালে তার বাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় ২৪ ঘণ্টার বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যায়। একই সঙ্গে শরীরের ব্যায়ামও হয়। তিনি এ কাজ প্রতিদিন করেন এবং অন্য কোনও স্থান থেকে আর বিদ্যুৎ কিনতে হয় না। তিনি এ বছর ১০ হাজার বিশেষ এই সাইকেল তৈরি করে ভারতে বাজারজাত করতে চান। তিনি মনে করেন, এ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারলে, আর কারো মুখাপেক্ষি হয়ে থাকতে হবে না এবং তার দেশের পরিবেশ বাঁচাতেও সাহায্য করতে পারবেন।

লেখক: গল্পকার

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ