সন্তুষ্টি কোথায়?

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৪:৩২, জুন ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৬, জুন ১০, ২০১৯

মোস্তফা হোসেইনগন্তব্যে পৌঁছানোর পূর্বমুহূর্তে শুকরিয়া জানালাম। স্বগতোক্তি ছিল—আহ! কত বছর পর ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে ঢাকা থেকে কুমিল্লা পৌঁছাতে পারলাম। চালক যুক্ত হলেন আমার মন্তব্যের সঙ্গে। বললেন, দেড় ঘণ্টাতেই গিয়েছি সকালে। সহযাত্রী তাৎক্ষণিক মন্তব্য করলেন, তৃপ্তির কী আছে? টাঙ্গাইল যেতে তো তিন ঘণ্টার জ্যাম লেগে ছিল ঈদের আগের দিনও।
সহযাত্রীর সঙ্গে হয়তো আরও কথা বলা যেতো। সময়ে কুলোয়নি। তাকে প্রশ্ন করা যেতো, মাত্র ১৫ দিন আগেও যখন ঢাকা থেকে কুমিল্লা যেতে ৭ ঘণ্টাও লেগে যেতো, সেই ভোগান্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার পরও কি তৃপ্তি হবে না? গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার কারণে আর কথা হয়নি।
ঢাকায় ফিরে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলাম। হরেকরকম মন্তব্য পাওয়া গেলো ফেসবুকে। একজনের মন্তব্য কৌতূহলোদ্দীপক বেশ। বললেন, আসল জায়গা খালি করতে হবে, তাহলেই তৃপ্তি আসতে পারে। ঘটনাটা কী? বোঝার জন্য জিজ্ঞেস করলাম একজনকে। বললেন, তেনারা আসলে নিজেদের ক্ষমতার জন্য ক্ষমতার রদবদলের স্বপ্নই দেখেন। বিষয়টা পুরোপুরিই রাজনৈতিক। সুতরাং যতই ৭ ঘণ্টার পথ দেড় ঘণ্টায় পৌঁছানোর সুযোগ করে দেওয়া হোক না কেন, তারা তৃপ্তি পাবেন না। কারণ তাদের ডিকশনারি থেকে তৃপ্তি শব্দটিই উধাও।

আসলে মানুষের তৃপ্তি বিষয়টি খুবই দুর্লভ। ভাবি, যুদ্ধের পর যখন কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসতাম, পাঁচটি ফেরি পেরিয়ে আসতে হতো ৯৭ কিলোমিটার পথে। গাড়িগুলো ছিল কাঠবডির। সিট ছিল নারিকেলের ছোবড়ার তৈরি। কখনও সেই সিটে বসে থাকা যাত্রীকে চুলকানিতে ব্যস্ত থাকতে হতো ছারপোকার কবলে পড়ে। জানালা ছিল কাঠের। বৃষ্টি হলে জানালার পাশের যাত্রীকে কখনও ছাতা ধরতে হতো, কখনও ভিজে চুপচুপা হতে হতো।

ইঞ্জিনের পাশে থাকতো কাঠের খুপরি। সেখানে বসতো মহিলা যাত্রী। ইঞ্জিনের গরমে গলদঘর্ম হওয়ার পরও তাদের পক্ষে পেছনে বসা পুরুষসঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হতো না।

উল্টোদিক থেকে আসা গাড়িকে সাইড দিতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হতো একটি গাড়িকে, সরু রাস্তায় দুটো গাড়ি একসঙ্গে চলার সুযোগ ছিল না বলে। আর ঈদ পার্বণে তো ফেরিঘাটে দু’চার ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া নিত্য ঘটনা ছিল। অনেককেই ঈদের নামাজের সময় রাস্তায় কাটাতে হতো।

আর এখন? আরামদায়ক ভ্রমণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে সব রুটে। শীত ও তাপ নিয়ন্ত্রিত বাসের মালিকরা যাত্রী আকর্ষণের জন্য নতুন নতুন গাড়ি আমদানি করছে। উদ্দেশ্য যাত্রীর তৃপ্তি।

কিন্তু সেই তৃপ্তি কি অধিকাংশ যাত্রী পাচ্ছেন? কুমিল্লায় যাওয়ার পথের সহযাত্রীর কথা প্রসঙ্গটিই বলতে চাই। তিনি টাঙ্গাইলের জ্যামের কথা বললেন। সেই টাঙ্গাইলের যাত্রা প্রসঙ্গেই একটি দৈনিক পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক হায়দার আলী বললেন, ‘বাহ! ৬-৭ ঘণ্টার যাত্রাপথে সময় লাগলো মাত্র ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। সেই পথটি ছিল ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের। তার স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় একজন বললেন, ঈদের আগে তিনি ৭ ঘণ্টায় পৌঁছলেন টাঙ্গাইলে।’

ঘটনা সত্য। এবার দেখা যাক কেন এমনটা হলো। ৩ জুন সকাল ৬টা থেকে ৪ জুন সকাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে ৩৫ হাজার ২৭১টি গাড়ি পার হয়েছে। একদিনেই টোল আদায় হয়েছে ২ কোটি ৪৪ হাজার ৯৬০ টাকা। অথচ অন্য সময় দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের ২৬টি জেলার গড়ে ১০ হাজারের বেশি গাড়ি চলাচল করে প্রতিদিন। চলাচলকারী গাড়িগুলোকে সেতুতে টোল দিতে হয়। সাধারণ সময়ের তিন গুণেরও বেশি সংখ্যায় গাড়ি চলাচল করলে, সেখানে যানজট লেগে যাওয়াটা অপরিহার্য। এবং তাই হয়েছে ঈদের আগে। পরিণতিতে দীর্ঘ যানজট।

হ্যাঁ অবশ্যই প্রশ্ন আসতে পারে, টোল আদায়ে প্রযুক্তি সুবিধার আধুনিকায়ন বিষয়ে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দাউদকান্দি ও মেঘনা ব্রিজ এলাকায় টোল আদায়ের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম চালু হচ্ছে। এতে করে যানবাহনকে এখনকার মতো থামিয়ে হাতে হাতে টোল পেমেন্ট করতে হবে না। নগদ অর্থও প্রদান করতে হবে না। ব্যাংক থেকে ব্যাংকে টাকা চলে যাবে। যমুনা বঙ্গবন্ধু সেতুতেও এমন ব্যবস্থা নেওয়া হলে আশা করা যায়, ঈদের মতো অন্যসময়ও গাড়ি পারাপারে ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।

ফেসবুকের প্রসঙ্গ টেনেছিলাম লেখার প্রথম দিকে। সেই ফেসবুকেই ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। অন্যদিকে রেল কর্তৃপক্ষও অকপটে স্বীকার করেছে বিপর্যয়ের কথা। রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন তো বিপর্যয়ের জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছেন। কষ্ট-দুর্ভোগের পর স্বাভাবিক কারণেই মানুষের কঠোর মন্তব্য হতে পারে। কিন্তু কারণ কী, সেটাও আমাদের জানা প্রয়োজন। আর এই দুর্ভোগ কমানোর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিতে পারে, তাও আমাদের আলোচনা করতে হবে। রেল কর্তৃপক্ষ বারবার বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপের কথা উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে—গাড়ির ভেতরে উপচেপড়া ভিড়ই শুধু নয়, ছাদেও মানুষ। বাধা দিয়ে, মাইকিং করেও যাত্রীদের ছাদে চড়া থামানো যায় না। যে কারণে প্রতিটি ট্রেনের গতি কমিয়ে আনতে হয় যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে। অন্যদিকে প্রতিটি স্টেশনে নির্ধারিত সময়ের দ্বিগুণ তিনগুণ সময় বিরতি দিতে হয়, যাত্রীদের ওঠা-নামার জন্য। ফলে সব ট্রেনেই সময় বিপর্যয় ঘটেছে।

যাত্রী দুর্ভোগকে স্বীকার করেই বলতে হবে, ২০-২৫ গুণ যাত্রী বহনের ক্ষমতা রেলের নেই। আর এই অতিরিক্ত যাত্রী চাপ যদি সারা বছর হতো তাহলেও তাদের বলা যেতো, যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী গাড়ি বাড়ছে না কেন? বাস্তবতা হচ্ছে, ঈদের সময় একইসঙ্গে সারাদেশের অন্তত দুই কোটি মানুষ স্থানত্যাগ করে। একইসঙ্গে এত বেশিসংখ্যায় মানুষের ভ্রমণ পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে স্বাভাবিক কারণেই হিমশিম খেতে হয় তাদের। তারপরও আমাদের মেনে নিতে হবে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই দুর্ভোগ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। অন্তত গত কয়েক বছরে ঈদের সময় যাত্রীচাপ সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে রেলওয়ের তুলনামূলক সাফল্য ছিল।

কোরবানি ঈদের আগেই রেলে আরো ৫০টি বগি ও ৩টি নতুন ট্রেন যুক্ত হতে যাচ্ছে। আশা করা যায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আনতে পারলে রেলের বর্তমান দুর্নাম অনেকাংশে কমে যাবে।

সড়কপথে ভ্রমণ এ বছর তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যের ছিল। কিন্তু সেখানে দুর্ভোগমুক্ত ছিল, এমন দাবি করা যাবে না। সড়কপথে ভ্রমণসুবিধার এই অগ্রগতি রেলেও আনতে হবে। অন্তত কোরবানি ঈদের সময় যাতে মানুষ নিরাপদে এবং সুষ্ঠুভাবে ভ্রমণ করতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। তারপরও মনে রাখতে হবে, ঈদের আনন্দের পাশাপাশি ঈদের কষ্টও মানুষ উপভোগ করে। সে তো আমরা দেখেছি ১৫-২০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কাঙ্ক্ষিত টিকেট পাওয়ার পর কীভাবে তৃপ্তির হাসি হাসে যাত্রীরা। আসলে সাধারণ মানুষ অধিকাংশই বাস্তবতাকে মেনে নিতে চায়। দুর্ভোগ কমিয়ে আনতে পারলে নির্মল হবে সেই আনন্দ, এমন প্রত্যাশাতো করতেই পারি।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ