আওয়ামী লীগের ৭০ বছরে বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি ইনিংস

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ১৬:৪০, জুন ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪২, জুন ১০, ২০১৯

স্বদেশ রায়ক্রিকেটে দুই ধরনের ব্যাটিং আছে—একটি ঝড়ো ইনিংস খেলা, অন্যটি টেকনিক্যালি টপ ইনিংস খেলা। কিছু কিছু প্লেয়ার আছেন, তারা টেকনিক্যালি টপ ইনিংস খেলেন; আর কিছু কিছু প্লেয়ার আছেন, তারা ঝড়ো ইনিংস খেলেন। একমাত্র ক্রিকেটের কিংবদন্তি ডন ব্রাডম্যান এই দুয়ের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তার ব্যাটিংয়ে প্রতিটি ইনিংস যেমন ছিল ঝড়ো, তেমনি টেকনিক্যালি টপ ইনিংস। রাজনীতিবিদ বা বিপ্লবীদের মধ্যেও ক্রিকেটারের এই চরিত্রের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আবার এখানেও আরেকটি বিষয়, সব বিপ্লবী রাজনীতিতে টেকনিক্যালি টপ ইনিংস খেলতে পারেন না। কেউ কেউ শুধু বিপ্লবে একটি চমৎকার ইনিংস খেলেন। কেউ কেউ রাজনীতিতে ফ্লপ করেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের ইনিংস যদি আমরা ক্রিকেটের ইনিংসের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে একমাত্র মিল খুঁজে পাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার ডন ব্রাডম্যানের সঙ্গে। যিনি প্রতিটি ইনিংসে ঝড় তুলেছেন এবং প্রতিটি ইনিংসই টেকনিক্যালি টপ ইনিংস খেলেছেন। বঙ্গবন্ধুর সব ইনিংসই ব্রাডম্যানের মতো। সবকটিতেই সেঞ্চুরি, তাও ডবল ও ট্রিপল। সব উল্লেখ করতে গেলে বঙ্গবন্ধুর পরিপূর্ণ রাজনৈতিক জীবনের বিশ্লেষণ করতে হয়। আশা আছে ভবিষ্যতে কোনোদিন বই আকারে সেটা লিখবো। তবে এখানে এ কলামে তার কয়েকটি ইনিংসই শুধু উল্লেখ করবো।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। তখন তার নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। যারা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সবাই মুসলিম লীগের নেতা ও কর্মী। মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে জনগণের (আওয়ামী) মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তারা। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মুসলিম লীগ পাকিস্তান আদায় করেছিল ব্রিটিশ ও কংগ্রেসের কাছ থেকে। সেই পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র এক বছর দশ মাসের মতো সময় পার না হতে মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে এসে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে একটি ঝড়ো ইনিংস। আর খেলাটি হয়েছিল অত্যন্ত টেকনিক্যালি। এই গতিবেগ চঞ্চল নেতা সে সময়ে কে? যার কারণে এটা সম্ভব হলো! সেদিন আসাম থেকে আবদুল হামিদ খান ভাসানী না এলে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার কাজটি বেশ কষ্টের ছিল। তবে  ভাসানীকে সেদিন যে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে দল প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন, এর ক্ষেত্রটি মাত্র ওই এক বছর দশ মাসের মতো সময়ে কে তৈরি করলেন? আধুনিক, গণতন্ত্র ও বিপ্লবীমনা একটা তরুণ মুসলিম শ্রেণি সেদিন এ পরিবেশ সৃষ্টিতে একটা সাহায্য করেছিলেন ঠিকই।

মুসলিম লীগের কর্মীকেন্দ্রের, অর্থাৎ ১৫০ মোগলটুলিতে অবস্থানরত প্রগতিশীল মুসলিম তরুণরা সেদিন এই আওয়ামী মুসলিম লীগ তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুতিতে সর্বাত্মক ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে তাদের বিক্ষিপ্ত ক্ষোভ, মুসলিম লীগের প্রতি অনীহা ও পাকিস্তানের ভেতর নিজস্ব চিন্তা চেতনার সেই উদার রাষ্ট্র খুঁজে না পাওয়ার হতাশা সবকিছুকে একটি রাজনৈতিক স্রোতধারায় এনে, সামনের সব বাধাকে ভাসিয়ে নিয়ে—একটি রাজনৈতিক দল তৈরির বিন্দুতে পৌঁছানোর মূল নেতৃত্ব সেদিন দিয়েছিলেন তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানই।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৫০ মোগলটুলিতে আসার আগে থেকে সেখানকার কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক একটি বাংলা ভাষা আন্দোলন করে চলেছিলেন। যা তরুণ ও প্রবীণ বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্য, লেখা ও আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সেখানে ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক গুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীরা তাদের যে কাজ, সেটা তারা করেছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান ১৫০ মোগলটুলিতে এসে দ্রুতই এটাকে একটি রাজনৈতিক স্রোতধারায় রূপ দেন। এবং ১৯৪৮ সালের ১১ জানুয়ারির হরতালের ভেতর দিয়ে তিনি এই আন্দোলনকে শুধু বিজয়ী করেননি, এর সপক্ষে জনগণের এক ধরনের ম্যান্ডেট নেন। এই হরতালে ও তার আগের আন্দোলনে মুসলিম লীগের দমন নীতি ও ভাষা আন্দোলনকারীদের কাছে পরাজয়ের ভেতর দিয়ে মুসলিম লীগ পূর্ব বাংলার একটি জনগোষ্ঠীর কাছে স্পষ্টতই নিন্দিত হয়। ১৯৪৭-এর আগস্ট থেকে ১৯৪৮-এর জানুয়ারির ভেতর মুসলিম লীগকে এই নিন্দিত অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যেমন ছিল প্রগতিশীলদের রাজনৈতিকভাবে একটি বড় বিজয়, তেমনি এর গতিটা ছিল ঝড়ের। এই ঝড়ো গতিতে ১৯৪৮-এর জানুয়ারির ভেতর এ পরিবেশ শেখ মুজিবুর রহমান তার তরুণকর্মীদের নিয়ে তৈরি করতে পেরেছিলেন বলেই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মুসলিম লীগের বিপরীতে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়।

আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হওয়ার পরে দলটি প্রথমেই কঠিন পরীক্ষার সামনে পড়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে কী হবে না? সেদিন আওয়ামী লীগের প্রবীণ ও সাবধানী নেতারা এই ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে ছিলেন। তারা জানতেন খুব শিগগিরই পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচন। তাই তাদের আশঙ্কা ছিল, এই মুহূর্তে কোনও আন্দোলন হলে সরকার ওই উছিলায় নির্বাচন থেকে পিছিয়ে যেতে পারে। তাদের ধারণায় ছিল না, দেশের মানুষ এই আপসকামিতা পছন্দ করবে না। বঙ্গবন্ধু তখন জেলে ছিলেন। আমরা একটা বিষয় বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী ও তার সারা জীবনের রাজনীতি বিশ্লেষণ করে দেখেছি, কী জেলে থাকুন আর জেলের বাইরে থাকুন, বঙ্গবন্ধু কখনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করতেন না। তার সারা জীবনে কোনও একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভুল হয়েছে, এমনটি কেউ দেখাতে পারবেন না। এমন নির্ভুলভাবে সব রাজনৈতিক ইনিংস খেলা দ্বিতীয় কোনও রাজনীতিক পৃথিবীতে নেই। অন্তত আমি আজ  পর্যন্ত পাইনি। ১৯৫২ সালে তাই ১৪৪ ধারা ভাঙা নিয়ে বঙ্গবন্ধু কোনও ভুল করেননি, বরং তিনি জেলখানা থেকে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষেই চিঠি পাঠান। বঙ্গবন্ধুর এই তৎপরতা যে মুসলিম লীগ সরকার বুঝতে পেরেছিল, তার প্রমাণ তারা তাকে ঢাকা জেলখানা থেকে স্থানান্তর করে।

বঙ্গবন্ধু যদি সেদিন ছাত্র তরুণ ও তার অনুসারীদের ১৪৪ ধারা ভাঙার নির্দেশ না দিতেন, তাহলে ইতিহাস ভিন্ন পথে যেতো। অর্থাৎ তরুণরা ১৪৪ ধারা ভাঙাতো, আর আওয়ামী লীগ তার প্রকাশ্যে বিরোধী থাকতো। সেখানে প্রগতিশীল তরুণদের মন থেকে আওয়ামী লীগ দূরে চলে যেতো। কিন্তু ওই তরুণরা জানতে পারে, তাদের যে নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, তিনি তাদের আন্দোলনের সঙ্গে এবং তাদের আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু সেদিন যদি এ সিদ্ধান্ত না নিতেন, তাহলে ১৯৫৪-এর নির্বাচনে এর অনেক বড় প্রভাব পড়তো। কারণ ১৯৫৪ সালের নির্বাচন আসার আগেই প্রগতিশীল তরুণদের অন্তত একাংশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব হতো। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ১৯৫৪-তে যেসব প্রগতিশীল তরুণ এক হতে পেরেছিল যুক্তফ্রন্টের পতাকাতলে—এই ক্ষেত্রটি বাস্তবে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২-তেই প্রস্তুত করেছিলেন। আর একটি নির্বাচনে প্রগতিশীল তরুণ ও বুদ্ধিজীবীদের কী ভূমিকা থাকে, সেটা পৃথিবীর যেকোনো দেশের নির্বাচনে এখনও প্রমাণ রাখে।

১৯৫৪-এর নির্বাচনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সারা বাংলায় শেখ মুজিবুর রহমান যে নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের একটি বিশাল অধ্যায়। শুধু এই অধ্যায় নিয়ে আলাদা একটা বই লেখা প্রয়োজন। ওই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান তরুণ তুর্কি হিসেবে নির্বাচনের মাঠ কীভাবে গরম করেছিলেন, এটা কোনও কলামে বা নিবন্ধে লেখা সম্ভব নয়। শুধু এটুকু বলা যায়, সেদিন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবের অমানুষিক পরিশ্রমই মুসলিম লীগের কবর রচনা করতে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখে। এই দুই নেতা (নেতা ও তার স্নেহধন্য কর্মী) সেদিন রাতের পর রাত কাটিয়েছেন পার্টি অফিসে। দিনের পর দিন ঘুরেছেন নৌকায়। মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন গ্রামের আলপথ ধরে। সারা বাংলাদেশ ঘুরে এ ইতিহাস তুলে আনলে আমরা জানতে পাবো বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের আরেক অবিশ্বাস্য অধ্যায়। পাশাপাশি জানতে পাবো, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। আওয়ামী লীগের ৭০ বছর নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর মানস জগৎ নিয়ে লিখতে হলে অবশ্যই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে জানতে হবে। বাস্তবে তাকে নিয়ে আমরা খুবই কম চর্চা করি। তার মতো শিক্ষিত ও নিয়মতান্ত্রিক নেতা ছিলেন বলেই আওয়ামী লীগ একটি ভিন্ন চরিত্র পায় অন্য সব রাজনৈতিক দল থেকে। আর বঙ্গবন্ধুর মনোজগতে রয়েছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এক বিশাল ছাপ। বঙ্গবন্ধুর যেসব মত ও পথের রাজনীতিকদের সঙ্গে নিয়ে চলার এক অসাধারণ যোগ্যতা ছিল, এটা যেমন তার নিজের চরিত্রের, তেমনই তরুণ বয়সে তিনি এটা শিখেছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে।

যাহোক, ’৫৪ সালের নির্বাচনের পরে বঙ্গবন্ধু যে উদ্যোগ নেন এবং দ্রুত সম্পন্ন করেন, তা পূর্ব বাংলা শুধু নয়, পাকিস্তানের রাজনীতিকে বদলে দেয়। এই বদলে দেওয়া কাজটি হলো আওয়ামী মুসলিম লীগের চরিত্র আমূল বদলে দেওয়া। যে ক’জন নেতার উদ্যোগে সেদিন আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ করা হয়, বঙ্গবন্ধু ছিলেন তাদের অগ্রগণ্য। প্রয়াত নেতা আব্দুস সামাদ আজাদের সঙ্গে কথা বলে জানি, এই উদ্যোগকে যদি বঙ্গবন্ধুর একক উদ্যোগ বলা হয়, তাহলেও ভুল হবে না।

রাজনীতির এই ইনিংসটি যে কত ঝড়ো ইনিংস, আর কতটা টেকনিক্যাল ইনিংস, তা আজ কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা যায়, ধর্মের নামে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার এক দশক না যেতেই পূর্ব বাংলার মূল রাজনৈতিক দলটিকে একটি অসাম্প্রদায়িক দলে পরিণত করা কত বড় কাজ, তা হয়তো বাংলাদেশের মানুষ সঠিক উপলব্ধি করেছিল ১৯৭১ সালে। ১৯৭১ সালে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য যখন মানুষ বুকের রক্ত ঢেলে দিচ্ছে—আর তার প্রতিটি ফোঁটা রক্তে একটি করে শপথ তৈরি হচ্ছে, ওইসব শপথ ছিল একটি—সব মানুষের বাংলাদেশের শপথ। নেতা কত দূরদর্শী হলে এমন সিদ্ধান্ত দেড় দশক আগে নিতে পারেন, তা কেবল এই উদাহরণ থেকে বলা যায়। আর আওয়ামী লীগ যে স্রোতস্বিনী নদী, এই নদী যে শুকিয়ে যাবার নয়, তার সব থেকে বড় কারণ কিন্তু আওয়ামী লীগ সব মানুষের।

তবে আওয়ামী মুসলিম লীগকে আওয়ামী লীগ করার পরে দ্রুত সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে অনেক বড় বড় অধ্যায় আছে। যুক্তফ্রন্ট সরকার যখন একটি অস্থিতিশীল সরকারে পরিণত হয়, ওই সময় থেকে মুক্ত হয়ে দুই বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের স্থিতিশীল সরকার পূর্ববাংলায় হয়েছিল আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে। এই সরকার গঠনের ক্ষেত্রও কিন্তু তৈরি করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আবু হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে তিনিই দিয়েছিলেন ভুখা মিছিলের নেতৃত্ব। যাহোক, সে ইতিহাসের ডিটেইলসে না গিয়ে তার থেকে বড় শুধু নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একমাত্র রাজনৈতিক ইনিংস, যা শুধু বঙ্গবন্ধু বলেই খেলা সম্ভব হয়েছিল, অর্থাৎ ডন ব্রাডম্যানীয় ইনিংস। সেটা হলো ১৯৫৭ সালে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ নেওয়া। সেদিন যদি বঙ্গবন্ধু এই সিদ্ধান্ত না নিতেন তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতো। আওয়ামী লীগও আওয়ামী লীগ হতে পারতো না। মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ভেঙে বেরিয়ে গিয়ে যেমন শুধু আওয়ামী লীগের একাংশ নয়, প্রগতিশীল কমিউনিস্টদের একাংশকেও তিনি আইয়ুব খানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি যদি সেদিন বঙ্গবন্ধুর বদলে অন্য কেউ হতেন, তাহলে শতভাগ সম্ভাবনা ছিল আওয়ামী লীগ সেদিন চলে যেতো আইয়ুব খানের কব্জায়।

শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি হয়ে কীভাবে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে গড়ে তুলেছিলেন, তার সঠিক ইতিহাস এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতেও এই ইতিহাস যতদূর পারা যায়, তুলে আনা সম্ভব হবে কিনা জানি না। তবে আওয়ামী লীগের এই অধ্যায়ের ইতিহাস বা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির এ ইনিংস এই জনপদের মাটি ও বাতাস থেকে তুলে আনা বড়ই দরকার ছিল।

১৯৭৯ সালে খুলনার একটি দুর্গম এলাকায় আমরা নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে একটি খাল পার হওয়ার জন্য নৌকা খুঁজছিলাম, কারণ তখনও সাঁতার জানতাম না। পানিকে ভীষণ ভয় পেতাম। ওই সময়ে সেখানকার একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক বলেন, শেখ সাহেব ও শেখ আজিজ এই পথের যতগুলো খাল, সব গামছা পরে পার হয়ে প্রতিটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ গড়েছেন। আর আজকে তোমরা শেখ সাহেবের নামে নির্বাচন করতে এসে খাল দেখে ভয় পাচ্ছো? তাই বলা যেতে পারে, সেক্রেটারি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অধ্যায় আওয়ামী লীগের সত্যিকার প্রতিষ্ঠালাভের অধ্যায়। এই অধ্যায়েই মূলত প্রতিষ্ঠা পায় প্রকৃত আওয়ামী লীগ।    
লেখক: সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত        

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ