মাছ-ভাতের বাঙালি ও প্রান্তিক মানুষের দীর্ঘশ্বাস

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৮:৩৯, জুন ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪০, জুন ১২, ২০১৯

আমীন আল রশীদ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’র পরে বস্তুত বাঙালির পরিচয় হয়ে ওঠে ‘মাছে-ভাতে’। হাজার নদী-খাল-বিল-পুকুর আর সমুদ্রে তো বটেই, মাছের আকাল বাঙালির কোনও কালেই ছিল না। আর সারাবিশ্বে যেসব দেশের প্রধান খাবার ভাত, সেই তালিকায়ও বাঙালি শীর্ষে। এই ভূখণ্ডে ধানের ফলনও ভালো। বিবিধ কারণে ধানের বৈচিত্র্য কমলেও ষোলো কোটি মানুষের খাবার জোগান দেওয়ার মতো ধান এখনও উৎপাদন করেন কৃষকরা। শুধু উৎপাদনই করেন না, বরং প্রতিবছরই ছোটখাটো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরও ধানের যে ফলন হয়, তাতে আর যাই হোক, দেশে কখনও প্রধান এই খাদ্যশস্যে টান পড়ে না। বরং প্রচুর পরিমাণ চাল রফতানি করাও সম্ভব। অতীতে কখনও-সখনও রাষ্ট্রের ভুল নীতি আর অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে দেশে চালের সংকট হয়েছে বটে, সেটি স্বাভাবিক কোনও ঘটনা নয়। বরং বাংলার মাটি, বাংলার জল এই ভূখণ্ডের মানুষে মুখে ভাত ও মাছ তুলে দিতে অকৃপণ। কিন্তু বাঙালির খাদ্যের সেই প্রধান অনুষঙ্গ মাছ ও ভাতের ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন চিন্তা করতে হচ্ছে।
বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের যে বিক্ষোভ হয়েছে, সেখানে পোস্টার এবং কারও কারও টিশার্টে লেখা একটি স্লোগান নিশ্চয়ই আপনারও চোখ এড়ায়নি; তা হলো—‘আর করব না ধান চাষ, দেখব তোরা কী খাস…।’

অতি সাধারণ দুটি বাক্য। সহজ তার গঠন। অতি পরিচিত শব্দ। কাব্যের ছন্দ আছে। কিন্তু এই দুটি লাইনের ভেতরে যে খেদ, যে অভিমান, যে সতর্কতা, সেটি আমাদের মস্তিষ্কে কতটুকু অনুরণন তুলেছে? আদৌ তুলেছে কি? আমরা এবং আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র কি কৃষকের এই ক্ষোভ, এই হুঁশিয়ারির অর্থ বুঝেছে?

চোখ বন্ধ করে শুধু একবার কল্পনা করুন, আগামী বছর দেশের অর্ধেক কৃষক ধান আবাদ করলেন না। তারা হয় ওই জমিতে অন্য কিছু আবাদ করলেন, অথবা ধারদেনায় জর্জরিত অভিমানী কৃষক জমি পতিতই রাখলেন। তাহলে মাছে ভাতে বাঙালির ভাতের জোগান দেবে কে? কত লাখ টন চাল আমদানি করা সম্ভব? আমদানি করা চালের কেজিপ্রতি মূল্য কত হবে এবং কতজন লোকের পক্ষে সেটি কিনে খাওয়া সম্ভব হবে? মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত না হয় ষাট-সত্তর টাকা কেজিতে চাল কিনে খাবে, কিন্তু গরিব মানুষ এখন ২৫-৩০ টাকা দরে যে চাল খায়, দেশে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদন না হলে সেই শ্রেণির মানুষকে রাষ্ট্র কী করে সহায়তা দেবে? কী করে খোলাবাজারে ভর্তুকি দিয়ে কম দামে চাল বিক্রি করবে?

মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশে যখনই কোনও সংকট (সেটি প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট যাই হোক) আসে, সেখানে একসঙ্গে অনেক মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, কেবল অল্প জায়গায় বিশাল জনগোষ্ঠী বসবাস করে বলে। ফলে এখানে যেকোনও নীতি বা কর্মকাণ্ড হতে হয় ১৬ কোটি মানুষের কথা মাথায় রেখে। এক মৌসুমে ধানের আবাদ কম হওয়া মানে যে শুধু কৃষকেরই আর্থিক ক্ষতি তাই নয়, বরং যে বিপুল জনগোষ্ঠী কৃষকের ওপর নির্ভরশীল, তাদের পকেট পয়সা থাকার পরও খাদ্য পাবে না। বাজারে পণ্যের জোগান না থাকলে মানুষ নিশ্চয়ই টাকা চিবিয়ে খাবে না।

ধান নিয়ে এবার যা হয়েছে তা দেশের ইতিহাসে বিরল। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় জমিতে অন্তত দু’জন কৃষক আগুন দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। মোবাইল ফোনে ধারণ করা সেই আগুনের দৃশ্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং পরে গণমাধ্যমে এসেছে। যদিও সরকারের তরফে এই ঘটনায় দুই ধরনের সন্দেহ প্রকাশে হয়েছে; ১. এটি স্যাবোটাজ এবং ২. ক্ষেতে আগুন দেওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের নয়, ভারতের। তবে টাঙ্গাইলের আব্দুল মালেক ও নজরুল ইসলাম খান নামে যে দু’জন কৃষক তাদের জমিতে আগুন দিয়েছেন, তাদের সাক্ষাৎকারও গণমাধ্যমে এসেছে।

সুতরাং রাজনৈতিক কারণে সবকিছুতে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব খোঁজা যেতেই পারে। আবার ধানক্ষেতে আগুন দেওয়ার এই ঘটনাটিকে নিছক বিচ্ছিন্ন বলেও ধরে নেওয়া যেতে পারে। তাতে ধানের দাম নিয়ে যে বিশাল সংকটের সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই সংকটের পেছনে যে বহুবিধ কারণ বিদ্যমান, বোধ করি সে বিষয়ে কেউ দ্বিমত করবেন না।

২.

ধান নিয়ে এই বিতর্ক আর ক্ষোভ-বিক্ষোভের ভেতরে মাছে ভাতে বাঙালির দ্বিতীয় অনুষঙ্গ মাছ নিয়েও যে ভেতরে ভেতরে বড় ধরনের সংকট চলছে, সেটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বেশ কিছুদিন ধরেই উপকূলীয় এলাকার জেলেরা গভীর সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা বাড়ানোর প্রতিবাদে মানববন্ধন করছেন। সবশেষ ৯ জুন দুপুরেও তারা চট্টগ্রাম শহরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন।

মাছ নিয়ে সংকটের ডাইমেনশন ধানের চেয়ে আলাদা। কারণ প্রজনন মৌসুমে মা মাছ রক্ষার জন্য সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকার জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেয়। কিন্তু সেই সহায়তা কতজন প্রকৃত জেলের ঘরে পৌঁছায়, সেই সহায়তা পেতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা ও টাউটদের দৌরাত্ম্য কতটুকু প্রভাব বিস্তার করে, তা নিয়েও বিতর্ক নতুন কিছু নয়। দ্বিতীয়ত, মাছ ধরার নিষিদ্ধ মৌসুমে সরকারের তরফে জেলেদের যে সহায়তা দেওয়া হয়, তার পরিমাণ নিয়েও তাদের অসন্তোষ আছে।

বাংলাদেশের মৎস্যজীবীদের সামগ্রিক জীবনমান নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বহু আগেই সে কথা লিখে গেছেন, ‘ঈশ্বর এই গ্রামে (জেলেপাড়া) নয়, বরং থাকেন ওই ভদ্রপল্লিতে’। সুতরাং ‘আর করব না ধান চাষ দেখব তোরা কী খাস’-এর সঙ্গে ঈশ্বরের ভদ্রপল্লিতে থাকার স্যাটায়ারের বেশি তফাৎ নেই। দু’টিই রাষ্ট্রের প্রান্তিক মানুষের মনের ভেতর থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস।  

অথচ মাছে ভাতে বাঙালিত্বের প্রধান দুই অনুষঙ্গ ভাত ও মাছের জোগান দেন যে কৃষক ও জেলেরা, তাদের থাকার কথা ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক স্থানে। নদীমাতৃক ও কৃষিভিত্তিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের পরে সবচেয়ে সম্মানজনক স্থানে থাকার কথা ছিল কৃষক ও জেলেদের। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। এখানে কৃষক তার ধানের দাম পাবেন না। না পেলে সরকার বলবে ফলন ভালো হয়েছে, তাই দাম কম। অথচ দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড সচল রাখা এই কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব সরকারেরই। সরকার এমনভাবে কৃষিনীতি করবে, বাম্পার ফলন হলেও কৃষক তার ফসলের উপযুক্ত দাম পাবেন। বেশি ফলন হলে পরবর্তী বছরগুলোয় সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত গুদাম ও রক্ষণাগার তৈরি করবে। চালনির্ভর বিভিন্ন দেশে প্রচুর পরিমাণে চাল রফতানি করবে। সেজন্য নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করবে। কৃষককে যেন ধারদেনা করে বীজ-সার ও সেচ দিতে না হয়, সেজন্য সরকার পর্যাপ্ত ভর্তুকি ও সহায়তা দেবে—এটিই কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু তা হচ্ছে কোথায়? একটি রাষ্ট্র তার অর্থনীতির মেরুদণ্ড সচল রাখার কারিগরদের প্রতি কতটা সদয় ও সংবেদনশীল, তা তো ‘আর করব না ধান চাষ, দেখব তোরা কী খাস’ স্লোগানেই পরিষ্কার।

মাছের উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন সময়ে সমুদ্র এমনকি নদীতেও সরকার জাল ফেলায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, এটিই স্বাভাবিক। সেজন্য মৎস্য অধিদফতর নামে একটি বড় সরকারি সংস্থাও রয়েছে। সরকারের আরও নানা মন্ত্রণালয় ও দফতর এর সঙ্গে যুক্ত। এটি ধরে নেওয়াই সঙ্গত, সরকার দেশে মাছের উৎপাদন বাড়াতে এসব উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে মৎস্যজীবীরা কেন এর প্রতিবাদে রাস্তায় নামবেন? যারা নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরেন, তাদের চেয়ে একজন মৎস্যকর্মকর্তার ফিল্ড নলেজ বা মাঠের জ্ঞান বেশি নয়। একজন প্রবীণ কৃষকের চেয়ে একজন কৃষির অধ্যাপকের তাত্ত্বিক জ্ঞান বেশি হলেও মাঠের জ্ঞান বা কাণ্ডজ্ঞান যেমন কৃষকেরই বেশি, তেমনি যারা সাগরে ও নদীতে মাছ ধরেন, মাছের ভাষা ও ব্যাকরণও তারা ভালো বোঝেন। সুতরাং আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত নতুন করে ৬৫ দিন সমুদ্রে সব ধরনের মাছ ধরায় যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জেলেদের অভিমত কি নেওয়া হয়েছিল?

অন্যান্য বছর এই সময়ে বড় ট্রলারে মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও ছোট নৌকা দিয়ে জেলেরা উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ ধরতে পারতেন। কিন্তু এ বছর হঠাৎ করে তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে জীবন-জীবিকা নিয়ে সংকটে পড়েছেন জেলেরা। তাদের বিকল্প কোনও আয়ের উৎসও নেই। অভিমান করে একজন কৃষক হয়তো তার জমিতে ধানের বদলে পাট বা রবিশস্য আবাদ করতে পারেন, কিন্তু যে লোকের সমুদ্রে জাল ফেলাই বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, তিনি কী করবেন? হয় তিনি হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবেন। অথবা রাতের আঁধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ‘চুরি করে’ মাছ ধরবেন। আবার ধরা পড়লে হাতকড়া, জালে আগুন। এ এক শাঁখের করাত।

উল্লেখ্য, বছরের একটা বড় সময়ই নদীতে ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকে। ডিম ছাড়ার সময় ২২ দিন, জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ২৪০ দিন এবং সাগরে মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে ৬৫ দিন—এই তিন দফায় মোট ৩২৮ দিন সাগর বা নদীতে ইলিশ মাছ ধরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকে। তারসঙ্গে নতুন এই নিষেধাজ্ঞাকে অনেক জেলেই ‘গোদের ওপর বিষফোঁড়া’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তাহলে সমাধান কী? এখানেও ধানের মতো সরকারের মৎস্যনীতি ও তার বাস্তবায়নই প্রধান তর্ক। পুনর্বাসনের জন্য সরকারি সহায়তা কি সঠিকভাবে প্রকৃত জেলেদের কাছে পৌঁছাচ্ছে? সেখানে সরকারের নজরদারি কতটুকু? যে পরিমাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা কি যথেষ্ট? যদি যথেষ্ট না হয়, তাহলে এই সময়ে জেলেরা কী খাবে, কিংবা তাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা যায় কিনা? সরকারের নানাবিধ কর্মসৃজন প্রকল্পে এই জেলেদের অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা?

এখন হয়তো বলা হবে, দেশের লাখ লাখ প্রান্তিক মানুষের যেখানে কাজ নেই, সেখানে আলাদা করে জেলেদের জন্য সরকারের ভাবার অবকাশ কতটুকু? সেটিও অন্য তর্ক এবং রাষ্ট্রকে সেই তর্ক করার স্পেস দিতে হবে।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।

 

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ