পরিপ্রেক্ষিত চলমান রোহিঙ্গা সংকট

Send
মো. শরীফ হাসান
প্রকাশিত : ১৭:২১, জুন ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৪, জুন ১৩, ২০১৯

মো. শরীফ হাসানবাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দশ লাখের কাছাকাছি বলে জাতিসংঘ গতবছরই জানিয়েছিল। ধীরে ধীরে আমাদের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে, রোহিঙ্গারা এখানে দীর্ঘ সময়ের জন্য অবস্থান করবে। বাংলাদেশে তাদের দীর্ঘ সময়ের জন্য অবস্থানের প্রভাব গুরুতর। ইতোমধ্যে কক্সবাজারের আশেপাশের দৃষ্টিনন্দন পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক হারে বন উজাড় করার ফলে সম্পূর্ণ এলাকা অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সেখানকার স্থানীয় জনগণও বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। যদিও ২০১৭ সালের নভেম্বরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছার অভাবে এটি আর বাস্তবায়িত হয়নি। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের সময় গড়ে ১০ বছর। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা যদি ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের পরের পাঁচ বছর অবস্থান করে, তাহলে ২০২৩ অর্থবছর পর্যন্ত তাদের ভরণপোষণে খরচ হবে ৭ হাজার ৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যয় বাড়তেই থাকবে। এভাবে তারা যদি ১০ বছরের জন্য অবস্থান করে, তাহলে ব্যয়ের পরিমাণ হবে ১৭ হাজার ২০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

কে এই খরচ বহন করবে? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সমস্যা মোকাবিলায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা শুধু আর্থিক সহায়তা নিয়েই এগিয়ে আসেনি, বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এই ইস্যুটিকে তুলে ধরার মাধ্যমে বাংলাদেশকে নৈতিক সমর্থনও দিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংগঠন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এবং আরও অনেক সংস্থার প্রশংসনীয় তৎপর ভূমিকার কারণে এই মানবিক কার্যাবলি সহজে সম্পন্ন হচ্ছে। কিন্তু এমন একটা সময় আসবে, যখন দাতা সংকট দেখা দেবে। এটা শুধু তাদের সম্পদ কমে যাওয়ার জন্য নয়, বরং তাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তনের জন্যও এমন হতে পারে। আমরা এমন একসময়ে বসবাস করি, যেখানে প্রতিদিন পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সংকট দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদও একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সকলেই অগ্রাধিকার পাওয়ার প্রতিযোগিতায় সবসময় তৎপর থাকে।

সুতরাং শেষমেশ রোহিঙ্গাদের বোঝা বাংলাদেশকেই বহন করতে হবে। স্পষ্টতই, নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে পরিকল্পনা করতে হবে, যদিও তাদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ সময়ের জন্য অবস্থানের বিষয়টি অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় এবং অন্যান্য সাহায্য দিয়ে যতদূর সম্ভব সহযোগিতা করেছে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য যা করেছে, বিশ্বের যেকোনও দেশের জন্য তা অভাবনীয়। উন্নত দেশগুলোর উদ্দেশে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া শরণার্থীর ভাগ্য কে না জানে? আমরা কি বিত্তবান ও শক্তিশালী দেশগুলোতে দরিদ্র, যুদ্ধপীড়িত দেশগুলো থেকে আসা শিশুদের প্রতি অমানবিকতা এবং নিষ্ঠুরতা দেখিনি? কিন্তু বাংলাদেশ একটি ঘনবসতি এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের দেশ হওয়া সত্ত্বেও যে উদারতা দেখিয়েছে, তা উন্নত দেশগুলোকে বিব্রত করেছে।

যাই হোক, যখন রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্যের পরিমাণ হ্রাস পাবে, তখন সরকার কীভাবে রোহিঙ্গাদের প্রয়োজন মেটাবে? সামনে অগ্রসর হতে চাইলে সরকারকে অবশ্যই এই সমস্যাটি বিবেচনা করতে হবে। এই ক্ষেত্রে, একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একটি তিন স্তরের পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে এবং বাংলাদেশের উচিত হবে বিশ্ব দরবারে আরও শক্তিশালী কূটনীতি পরিচালনা করা। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। এই বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন আঞ্চলিক ফোরাম যেমন—বে অব বেঙ্গল ইনিসিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল এবং ইকোনমিক করপোরেশন (বিমসটেক) এবং বাংলাদেশ চীন ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার (বিসিআইএম) ইকোনমিক করিডোরে নিয়মিত তুলে ধরতে হবে। তৃতীয়ত, সংলাপ চলাকালীন রোহিঙ্গাদের দেখাশোনা করতে হবে এবং তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

অত্যন্ত আপত্তিকরভাবে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা সংহতি চুক্তির পরামর্শ নিয়ে হাজির হয়েছে। তারা উদাহরণ হিসেবে জর্দান, লেবানন এবং ইথিওপিয়ার নাম উল্লেখ করে, যেখানে সেসব দেশের শরণার্থীদের ব্যবস্থা করতে এ ধরনের চুক্তি গৃহীত হয়েছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এ ধরনের সংহতি চুক্তির প্রবক্তারা এই ধারণাকে তুলে ধরে যে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যেমন—করমুক্ত বাজারে পণ্য প্রবেশ, শ্রমশক্তি স্থানান্তর এবং দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ইত্যাদির বিনিময়ে আশ্রয়দাতা দেশগুলোতেই শরণার্থীদের রাখা উচিত।

এটি একটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং অযৌক্তিক প্রস্তাব। বর্তমানে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল (এলডিসি) দেশ হিসেবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে করমুক্ত, কোটামুক্ত (ডিএফকিউএফ) প্রবেশাধিকার লাভ করেছে। প্রাথমিকভাবে ২০২৪ সালে এবং সর্বশেষ ২০২৭ সালে ৩ বছরের অতিরিক্ত সময়ের পর যখন এটি এলডিসি দল থেকে উন্নীত হবে, তখন বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে ডিএফকিউএফ বাজারে প্রবেশাধিকার হারিয়ে ফেলবে। পাশাপাশি, খুব একটা আশাব্যঞ্জক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকা ও চারিদিকে ক্রমবর্ধমান রক্ষণশীলতার কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদানের বিনিময়ে ডিএফকিউএফ পাবার আকাঙ্ক্ষা অভিলাষী চিন্তা ছাড়া আর কিছু না। এমনকি, এই সম্পূর্ণ ধারণাটিই শরণার্থী সমস্যার রাজনৈতিক অর্থনীতির ওপর নির্ভর করছে। এটি একটি সংকীর্ণ মানসিকতারও প্রতিচ্ছবি, যেটা অনুযায়ী দক্ষিণের দেশগুলো শরণার্থীদের আশ্রয় দেবে, যেখানে উত্তরের দেশেগুলো সহানুভূতি দেখানোর জন্য নামমাত্র সাহায্য দেবে।

প্রাথমিক মানবিক সহায়তার পর এখন রোহিঙ্গাদের শিক্ষাগত এবং দক্ষতা উন্নয়নের জন্য এখানে উন্নয়নমূলক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন। তাদের জন্য উপার্জনের সুযোগ করে দিতে প্রয়োজন মানবসম্পদ হিসেবে তাদের গড়ে তোলা। তবে এর অর্থ এই নয়, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা সমাজের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া উচিত। আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়কে ইতোমধ্যে ব্যাপক পরিবেশজনিত ক্ষতি এবং উপার্জনের সুযোগ হ্রাসের কারণে বিপাকে পড়তে হচ্ছে, কেননা তাদের এখন রোহিঙ্গাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে, যারা স্বল্প মজুরিতে শ্রম দিতে প্রস্তুত। মিয়ানমার সরকারের ওপর তাদের মানুষগুলোর প্রত্যাবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করার এখনই সময়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সত্যটি মেনে নিতে হবে, রোহিঙ্গারা শুধু বাংলাদেশের দায়িত্ব না। এটা তাদেরও দায়িত্ব। বাংলাদেশকে সহায়তা করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও তৎপর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং দ্রুততম সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

লেখক: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ