সংখ্যালঘুদের বিষয়ে প্রয়োজন সচেতনতা

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ২০:২৭, জুন ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:২৮, জুন ১৪, ২০১৯





শান্তনু চৌধুরীপ্রতিদিন খবরের পাতায়, অনলাইনে, টিভি চ্যানেলসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কত-শত খবরই আসে। আবার জীবন পাতার, জীবনঘনিষ্ঠ এমন কত খবরই প্রকাশ পায় না। হয়তো এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে সেসব খবর আমরা পাই। তেমনি একটি খবর হলো সংখ্যালঘু নির্যাতন। সাংবাদিক মাত্রই জানেন, এমন অধিকাংশ খবর সাধারণত সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছায়ও না। অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ হলে তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনবক্স, মুঠোফোনে যেসব ঘটনার বর্ণনা শুনি, তাতে শিউরে উঠতে হয়।

আটচল্লিশ বছরের বাংলাদেশ জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনেকটাই হয়তো এগিয়েছে, কিন্তু সভ্যতায়, সমাজ বিনির্মাণে, মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় ততটাই পিছিয়েছে বৈকি! গত ১৯ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ দাবি করে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর ২৫০টি হামলা, নির্যাতন ও হত্যাসহ নানা ধরনের হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ সালে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ৮০৬টি। ফলে এটি স্পষ্ট যে, চলতি বছরের শুরু থেকেই সংখ্যালঘু নির্যাতন বাড়ছে। এই চার মাসে হত্যার শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ২৩ জন। হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন ১০ জন। হত্যার হুমকি পেয়েছেন ১৭ জন এবং শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন ১৮৮ জন। ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ৩ জন এবং সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫ জন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি ঘরে লুটের ঘটনা ঘটেছে ৩১টি, বাড়ি ঘর ও জমি জমা থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন ১৬২ জন, দেশত্যাগের হুমকি পেয়েছেন ১৭ জন। এর বাইরে অপহরণ, মন্দির দখল, মূর্তি চুরি, জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার ঘটনাও ঘটেছে। ঐক্য পরিষদ আরও জানাচ্ছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল ১ হাজার ৪৭১ টি। ২০১৭ সালে তা কমে হয়েছিল ১ হাজার ৪টি। ২০১৮ সালে আরো কমে ৮০৬টি। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকে তা আবারও বাড়তে শুরু করেছে। কেন এমনটি হচ্ছে? যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশের স্বপ্ন মুক্তমনা মানুষ দেখে এসেছে, বক্তৃতা, বিবৃতিতে যে চেতনার কথা আমরা বলি বা স্বয়ং রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান যেটির স্বপ্ন দেখান, আশ্বাস দেন সেই চেতনা থেকে মনে হচ্ছে আমরা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি। এতে করে হয়তো সাময়িক লাভবান হচ্ছে কেউ কেউ। কিন্তু সভ্যতার সংকটের দিকে যে এগিয়ে যাচ্ছি তা কখনও পূরণ হওয়ার নয়।

অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গড়েছিলেন বাংলাদেশ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এই বাংলাদেশ বেশিরভাগ সময় শাসিত হয়েছে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর দ্বারা। যারা সংবিধানে ‘সংখ্যাগুরু’ শব্দটি নিয়ে এসেছে। পাশাপাশি ‘সংখ্যালঘু’ও। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সংবিধানকে ইসলামিক সংবিধান বানানোর চেষ্টা করেন। যার শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু শুধু কি রাষ্ট্রধর্মের কারণে সংখ্যালঘু নির্যাতন বেড়েছে, তা হয়তো নয়। কিন্তু এটিকে অলক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে, যেন সংখ্যালঘু লোকজন শুরুতেই এমন একটি মনোবিকারে ভুগতে থাকে যে, তারা এদেশে অচ্ছুত। তাই এই ভূখণ্ডে বারবার সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়ে আসছে। পাকিস্তানিদের সময় তো বটেই, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেও সংখ্যালঘুরা সবসময় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। তারা দাবি করে থাকেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে তারা কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছেন। ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালে সংখ্যালঘুদের বহু ঘরবাড়ি ও মন্দির ভাঙা হয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীরা সারাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর তাণ্ডব চালায়। তখন পূর্ণিমা-সীমাদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। কিন্তু বিচার হয়নি। আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এলে সংখ্যালঘুরা ভেবেছিল পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কারণ অলিখিতভাবে দলটি সংখ্যালঘুদের তাদের ভোটব্যাংক এবং সংখ্যালঘুরা এই দলটির কাছে নিজেদের নিরাপদ মনে করতো। কিন্তু বাস্তবতাটা ধীরে ধীরে প্রকাশ হয়ে পড়ে। ২০১২ সালের অক্টোবরে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের হামলা হয়। ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগরে হিন্দুদের শতাধিক বাড়ি-ঘরে হামলা-ভাঙচুর এবং লুটপাট করা হয়। ২০১৭ সালের নভেম্বরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয় রংপুরের গঙ্গাচড়ার ঠাকুরপাড়ায়। এমন পরিসংখ্যান অনেক।

কেন সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বাড়ছে, বিশেষ করে নিম্নবর্গের হিন্দুদের ওপর? ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছিলাম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্তের সঙ্গে। তার ধারণাটি সত্যিকার অর্থে ভয়াবহ এবং শাসক দলের জন্য মোটেই স্বস্তির নয়। তিনি মনে করেন, সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে দেশে যে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা দরকার সেটির হয়তো প্রাকপ্রস্তুতি চলছে। কারণ দেশের উন্নয়ন তথা অগ্রযাত্রার কথা মাথায় রাখলে স্বাভাবিকভাবে সরকার বদলের সম্ভাবনা নেই। তিনি সন্দেহ পোষণ করেন। আওয়ামী লীগ সরকার কিন্তু সংখ্যালঘু নির্যাতনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখানোর কথা বলে ক্ষমতায় এসেছিল। যেটি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারেও ছিল। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। সংখ্যালঘু নির্যাতন থামানো না গেলে সামনের পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। বিশেষ করে যারা দেশকে একটি জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়, তাদের জন্য সুবিধাই হবে। তাই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধে সবার আগে পাশে এসে দাঁড়াতে হবে রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্র যদি নিপীড়কদের প্রশ্রয় না দেয়, তবে তারা কখনোই ক্ষমতার প্রয়োগ করতে পারে না। বাংলাদেশকে সংখ্যালঘুদের জন্য যে ভয়ের জনপদ তৈরি করে রাখা হয়েছে, তা ভেঙে ফেলার দায়িত্ব কিন্তু রাষ্ট্রের। কারণ নিপীড়ক বুঝে গেছে হিন্দুদের দিকে ঢিল ছুড়লে পাটকেল খাওয়ার ভয় নেই, তাদের বাড়িতে আগুন দিলে পাল্টা আগুন লাগার উদ্বেগ নেই, এমনকি দুই-চারজন খুন বা ধর্ষণ হলে ফিরতি খুন বা ধর্ষণের আশঙ্কা নেই। এটাই উদ্বেগের। একইসঙ্গে দায়িত্ব রয়েছে নাগরিক সমাজেরও। নির্যাতিত মানুষের পাশে সবার আগে ছুটে যেতে হবে। জোরালো প্রতিবাদ হলে সরকার বা রাজনীতিবিদরা বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বাধ্য হতো। এ কথা তো ঠিক যে, যাদের সংখ্যাগুরু ভাবা হচ্ছে তারা সবাই খারাপ না। এদেশে দীর্ঘদিন ধরে তো সব ধরনের মানুষ একসঙ্গে বাস করে আসছে। ধর্মীয় সম্প্রতি তো আমাদের দেশে ছিলই। তাই বলতে হয়, ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি। এরা সময়ে অসময়ে দাঁড়াতে দেখেছি সংখ্যালঘুদের পাশে। কাজেই নিজেরা সংগঠিত হতে পারলে, নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে পারলে সমর্থন পাওয়া যাবে তাদেরও। তবে আবার এমনটি ভাবাও ঠিক হবে না যে, প্রবল প্রতাপে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা অত্যাচারিত হয়ে আসছে। বরং এলাকাভিত্তিক বাদ দিলে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ বেশি। এখানে যে কোনও উৎসব, পূজা, পার্বণ, বড়দিন বা অন্যকোনও ধমীয় উৎসব সবাই মিলে উপভোগ করে। কথায় বলে থাকে ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’

যদিও সম্প্রতি সংসদে বিএনপি দলীয় এক সংসদ সদস্য বলেছেন, এটি নাকি ঠিক নয়! সাম্প্রদায়িকতা একদিকে যেমন বিষবাস্প ছড়াচ্ছে, এটা ঠিক আবার এটাও ঠিক যে, সবাই মিলেমিশে এর বিরুদ্ধে লড়ছেন, সবাই মিলেমিশে একসঙ্গে বসবাস করছেন, এমন নজির বরং বেশি। তবে বলশালীরা দুর্বলের ওপর অত্যাচার চালাতে চাইবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এক্ষেত্রে নিজেরা মানসিকভাবে দুর্বল না হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলে কিছুটা টনক নড়বে বৈকি! ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরেও যে মানুষ পরিচয়টাই সবার ওপরে, এটি যদি মননে-মগজে রোপিত হয়, তবেই সম্ভব শুধু ধর্মীয় কারণে ঘটা হানাহানি বা রেষারেষি বন্ধ করা। এ বিষয়ে ২০১৬ সালে নিউইয়র্ক পোস্টে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নোবেল বিজয়ী লেখক অর্মত্য সেনের একটি কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘কোনও একক পরিচয়ের ভিত্তিতে করা যেকোনও শ্রেণিবিভাগ একটি নির্দিষ্ট উপায়ে মানুষের মেরুকরণ করে। কিন্তু আমরা যদি মাথায় রাখি যে ধর্ম ছাড়াও আমাদের ভাষা, পেশা, ব্যবসা, রাজনীতি, শ্রেণি ও দারিদ্র্য ছাড়াও আরও বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন রকম পরিচয় রয়েছে, তাহলে একজনের মেরুকরণ আরও বৃহত্তর চিত্র দ্বারা প্রতিহত করা সম্ভব।’ আরও সহজে বলতে গেলে একই আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা আমরা নজরুলের সেই গানের মতো একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। যেখানে মনের আনন্দে গেয়ে ওঠা যাবে, ‘মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ