গরিবের বাজেট ভাবনা

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৬:৩৪, জুন ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৩, জুন ১৫, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহবুদ্ধি কোনও বৃদ্ধি ঘটেনি দেখলাম। স্কুলের সেই প্রথম শ্রেণিতেই থমকে আছি। যখন প্রথম টেলিভিশনে কাউকে অনেক অঙ্ক বলতে দেখেছি নামতা পড়ার মতো, তখন বুঝিনি এরই নাম বাজেট। মা বলতেন–পুরো বাংলাদেশ তো একটা সংসার, সেখানে কত খরচ হবে, খরচের টাকা কীভাবে পাওয়া যাবে—সেই অঙ্ক করে নেওয়াই নাকি বাজেট! পরদিন পত্রিকায় দেখতাম ব্রিফকেস হাতে একজনের ছবি। তিনি অর্থমন্ত্রী। ভাবতাম, খরচের টাকা তার সেই ব্রিফকেসে। পত্রিকার পাতা দেখে মায়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখতাম। তেলের দাম বাড়ছে। বাড়তে পারে গুঁড়ো দুধ, চিনির দামও। তিনি আমাদের ভাইবোনদের দিকে তাকিয়ে হয়তো ভাবতেন—দুধে-ভাতে কতটা রাখতে পারবেন। এমন করে বড় হতে হতে বাজেট বলতে দাম বাড়া-কমার মধ্যেই রয়ে গেছে জ্ঞান।
যেমন—মায়ের মতো কপালে ভাঁজ পড়লো আমারও। দাম বাড়ছে চিনি, গুঁড়ো দুধ আর ভোজ্য তেলের। গণমাধ্যমে সেই খবর জেনেই স্ত্রীকে ফোন—আমাদের মনে হয় তেল চিনি দুধ একটু বেশিই খরচ হচ্ছে। ওমা এ কী কাণ্ড! যে মোবাইলে কথা বললাম, তারও নাকি খরচ বাড়ছে। একশ’ টাকায় নাকি সাতাশ টাকা কেটে নেওয়া হবে?  এসব অঙ্ক কষতে গিয়ে থই পাই না। শুধু দুশ্চিন্তা বাড়ে। মেয়ের খবর, ছেলের খবর, বোনের খবর, বাবা-মায়ের খবর দিনে কতবার নেই, তার হিসাব তো রাখিনি এত দিন। এখন থেকে রাখতে হবে। কালই যেমন বোনের সঙ্গে কথা বলা হয়নি। বড় সংসার দেশ। সেই বাজেটে কত কিছু কর্তন হলো জানি না। আমি তো কেটেকুটে অস্থির।

আমার অস্থিরতা দেখে বন্ধুরা বলে, তোমার এমন হবেই। কত বলি বড় হও। ফন্দি-ফিকিরের তো অভাব নেই। বললাম, বয়স বাড়ছে। বড় তো হচ্ছিই। তারা টাকায় বড় হওয়ার কথা বললো। টাকায় যারা বড় হয়েছে, তাদের জন্য নাকি বাজেটে অনেক উপহার থাকে। যেমন—যারা কালো রঙের টাকায় বড় হয়েছেন, তারা রঙ বদলানোর সুযোগ পাচ্ছেন। কালো ধবধবে হয়ে উঠবে। আমি নিজের টাকার পকেট হাতড়ে বের করি কিছু টাকা। সত্যিই ওই টাকার রঙ মলিন। তা দিয়ে ফ্ল্যাট কেনা যাবে না। গরিবের চাহিদায় ফিকে সচ্ছলতা আনতে ক্রেডিট কার্ড করেছিলাম। সেই বকেয়া শোধ করতে গিয়ে দেউলিয়া হওয়ার দশা। অথচ শুনলাম বড়রা শত সহস্র কোটি টাকার দেনাদার হওয়ার পরেও, আরও ঋণ নিতে পারবেন।  বড় হতে না পারার ব্যর্থতায় সেই উপহার পাওয়া থেকেই এখন বঞ্চিত।

গরিবের আছে কী? স্বপ্ন দেখা। ভরসা রাখা। স্বপ্ন আমিও দেখি বাংলাদেশ নামের সংসারে মেট্রোরেল হচ্ছে। পদ্মা সেতুর কাজ সমাপ্তির পথে। বড় আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে। পাতাল রেল নিয়েও ভাবছে সরকার। তাই শিগগিরই পদ্মা সেতু পাড়ি দেব, হবো মেট্রোরেলের যাত্রী। বিদ্যুৎ নিয়ে ভাবনা থাকবে না। এই স্বপ্নের মাঝেও বুকে খচখচানি–এবার যে কৃষক আমন বুনছে, খরচ উঠবে তো? গ্রামে গেলে কত তরুণ চাকরির জন্য ঘিরে ধরে। শহরেও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের জীবনবৃত্তান্তে  ফেসবুক ইনবক্স উপচে পড়ছে। তাদের চাকরির হবেটা কী? দুই-একজন নিজে নিজেই অনলাইনে বা অন্য কোনোভাবে কিছু একটা শুরুর চেষ্টা করছে। টিকে থাকতে পারবে তো? ব্যাংকে পরিবারের কিছু টাকা জমা আছে জমি বিক্রির। বিপদে চাইলেই ব্যাংক সেই টাকা দিতে পারবে তো? উফ, এমন চিন্তা কুলোয় উঠছে না গরিবি বুদ্ধিতে। গরিবের পাউরুটির দাম নাকি কমবে? তাই দুধ চিনি ছাড়া চায়ে পাউরুটি ভিজালাম!

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ