বাজে ‘ট’ আছে, ভালো ‘ট’ নেই?

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৭:২৪, জুন ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৬, জুন ১৬, ২০১৯

আহসান কবিরমন্ত্রী সাহেব বাজেট পেশ করে বাসায় ফিরেছেন বেশ রাতে। বাসায় ফিরে স্ত্রীকে বললেন, একটু লেবুর শরবত খাওয়াবে? স্ত্রীর উত্তর—নো শরবত। অবাক হয়ে মন্ত্রী জানতে চাইলেন—কেন? কী করেছি আমি? মন্ত্রীর স্ত্রী বললেন, বাজেটে স্নো পাউডার আলতা শ্যাম্পুর দাম যেভাবে বাড়িয়েছ, তাতে তো তোমার মতো আমার মাথাও কামিয়ে ফেলতে হবে! মন্ত্রী অনুরোধের সুরে বললেন, ওগো দাও না একটু শরবত বানিয়ে। সম্পূরক বাজেট আছে না? সম্পূরক বাজেটে না হয় ওসবের দাম কমিয়ে দেবো!
কৌতুক কৌতুকই। আর বাজেট শব্দটা শুরু থেকেই কেমন যেন! সরকারের কাছে এটা সবসময়েই ‘উন্নয়ন আর জনকল্যাণমুখী’ বাজেট। বিরোধীদের কাছে এটা সবসময়ে ‘গরিব মারার’ বাজেট! এছাড়া সম্পূরক বাজেট কী, কত টাকা সরকার ও তার মন্ত্রণালয় খরচ করতে পারবে, কত টাকা ঋণ শোধে যাবে, কোন মন্ত্রণালয় কত পাচ্ছে, বিদেশনির্ভরতা কেমন, গরিব মানুষ বা কৃষক কী পাচ্ছে—সেই হিসাব ঠিকমতো অনেকেই করতে পারেন না। আর তাই আমরা বাজেট নিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু না ভেবে সরাসরি প্রশ্ন-উত্তর পর্বে যাই। আশা করি, এই ‘জিপিএ ফাইভের’ যুগে কুইজ ও এর উত্তর পাঠকদের ভালো লাগবে।

প্রশ্ন: ধরুন বাজেটে কাপড়ের দাম কমলো। এর কোনও প্রভাব পড়বে সিনেমায়?

উত্তর: নাও পড়তে পারে! কারণ চার-পাঁচ বছরের একটা শিশুও বুঝতে পারে হিন্দি বা বাংলা ছবির ‘নায়িকার কাপড়ের বাজেট’ তেমন থাকে না!

প্রশ্ন: শায়েস্তা খানকে মনে পড়ে কখন?

উত্তর: বাজেট এলে এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়লে! ভদ্রলোকের আমলে নাকি এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেতো। শায়েস্তা খানের আমলে বোধ করি মধ্যস্বত্বভোগী বা মজুতদাররা ছিল না। থাকলে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি তখনই প্রচলিত থাকতো।

প্রশ্ন: এক টাকায় এখন কিছু পাওয়া যায়?

উত্তর: বিশ বছর আগে (১৯৯৬-২০০০ সালে) এক টাকায় ছোট্ট এক বাক্স ম্যাচের কাঠি পাওয়া যেতো। এখন ভিক্ষুকরাও এক টাকা নিতে চায় না। চারআনা, আট আনা, পাঁচ-দশ পয়সার মতো এক টাকার মুদ্রাও হয়তো জাদুঘরে চলে যাবে। তবে খাবার হোটেল আর দোকানে যখন এক টাকার খুচরা দেওয়া সম্ভব হয় না, তখন হোটেল বা দোকান থেকে ক্রেতাকে একটা ছোট্ট চকলেট ধরিয়ে দেওয়া হয়। হতে পারে ওই ছোট্ট চকলেটের দাম এক টাকা।

প্রশ্ন: সাবেক সেনা প্রধান মঈন ইউ আহমেদ বলতেন, ভাতের বিকল্প আলু। আটা, তেল তরি-তরকারি, সবজির বদলে কী কী খেতে বলা যেতে পারে?

উত্তর: ঝামেলা করে লাভ আছে? না খেয়ে থাকাই কি ভালো না? ২০০২-০৩ সালে কিছু দিনের জন্য পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচের দাম খুব বেড়ে গেলে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমান বলেছিলেন, এসব না খেলে কী হয়?

প্রশ্ন: বাজেট আসলে কী?

উত্তর: বাজেট হচ্ছে বাজে ‘ট’! তাই সরকারের বাজেট ঘোষণার পর মানুষ খুঁজতে থাকে ভালো ‘ট’!

 স্বাধীনতার পরে ৪৮ বাজেট গেছে, একটাও ভালো ‘ট’ গেছে কিনা, জানা যায়নি। তবে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭১-৭২ আর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেট একসঙ্গে দিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতার পর প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ। সেই বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। (শুরুর বাজেট বলে কিনা জানি না, অনেকে বিসমিল্লাহ বোঝাতে ৭৮৬ শব্দটা লিখে থাকেন) আর ২০১৯ সালে ৪৮তম বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, যার আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাজেট উপস্থাপনা করার সময় মন্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত তাজউদ্দীন আহমেদই একমাত্র মানুষ, যিনি পরিপূর্ণ রাজনীতিবিদ ছিলেন। এরপরে যারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, তারা অর্থনীতিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত আমলা বা ব্যবসায়ী ছিলেন। কেউই পরিপূর্ণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না।

ভারতীয় উপ-মহাদেশের বাজেট উপস্থাপনের ইতিহাস খুব বেশিদিনের না। বাংলাদেশে যেভাবে বাজেট উপস্থাপন হয়, সেই ধরনের বাজেটে সূত্রপাত ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডের সংসদে প্রথম বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছিল ১৭২০ সালে। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ বেনিয়ারা এই উপ-মহাদেশে এলেও প্রায় ১০০ বছর পর ১৮৬০ সালে কলকাতায় জেমস উইলসন প্রথম বাজেট পেশ করেন। বাজেট পেশের পরেই উইলসন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন এবং কলকাতায়ই মারা যান! ভদ্রলোক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের (পরবর্তী সময়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক) প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। দেশভাগের পর পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের (১৯৪৮ সালে) অধিবেশন বসেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অডিটরিয়ামে। হামিদুল হক চৌধুরী এখানেই ৪১ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছিলেন। জগন্নাথ হলের এই হল ঘরটা ভেঙে পড়েছিল ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর, মারা গিয়েছিলেন প্রায় ৪০ জন ছাত্র। আজও এই ঘটনার স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছেন অনেকে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সঙ্গে বাজেটের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দেশবাসী সবসময়েই বাজেট নিয়ে চিন্তিত থাকে। বলা হয়ে থাকে, বাজেট আসে বাজেট যায়, বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম শুধু বাড়ে, কখনও কমে না। বলা হয়ে থাকে বাজেটে ধনীদেরই বেশি প্রণোদনা দেওয়া হয়। গরিব আর মধ্যবিত্ত পড়ে যায় বাজেটের ফাঁদে, মাথাপিছু ঋণ বাড়ে, নগদ টাকার সংকটে পড়ে যায় ব্যাংক। অনৈতিকভাবে তখন কালো টাকা সাদা করার রেওয়াজটাকেই টেনে নেওয়া হয় বাজেটের বুকে। সুতরাং কী আর করা?

সরকার আসে সরকার যায়—নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কেন-যেন আমজনতার নাগালের মধ্যে থাকে না।

লেখক: রম্যলেখক

 

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ