‘রবীন্দ্রনাথ কোনও নাট্যকারই নন’: গিরিশ কানরাড

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৪:৩২, জুন ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৪, জুন ১৭, ২০১৯

দাউদ হায়দারবোম্বের জহু বিচ। সারাক্ষণই লোকেলোকারণ্য। বিকেলসন্ধ্যেয় আরো বেশি, ঝড়ঝাপটা না হলে। বিচ-সংলগ্ন বাড়ি ‘জানকি কুটির।’ কুটিরের কর্তা কায়ফি আজমি। আধুনিক উর্দু সাহিত্যের বহুমান্য কবি। এবং গীতিকার। মূলত কমিউনিস্ট। একদা আইপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত। কায়ফির স্ত্রী শওকাত আজমি মূলত নাটকের অভিনেত্রী। কয়েকটি ছবিতেও অভিনয় করেছেন। উর্দু-হিন্দি ছবি।
কায়ফি-শওকাতের দুই সন্তান। কন্যা শাবানা আজমি। অভিনেত্রী। পুত্র বাবাই। ফটোগ্রাফার।
জানকি কুটিরের অদূরেই ‘পৃথ্বী থিয়েটার।’ কাপুর-ফ্যামিলির নিজস্ব। ভারতে ‘কাপুর-ফ্যামিলি’ বলতে পৃথ্বীরাজ কাপুরের ফ্যামিলি-ই বোঝায়। যেমন ঠাকুর পরিবার বলতে রবীন্দ্রনাথের পরিবার। কাপুর ফ্যামিলির গুষ্ঠিসুদ্ধ পরিচিত। পৃথ্বীরাজ, রাজকাপুর, শশি কাপুর, শাম্মি কাপুর, ঋষি কাপুর। হালে কারিনা কাপুর, রণবীর কাপুর। প্রমুখ। কাপুর ফ্যামিলি ছাড়া বলিউড অচল। ভারতের কোনও একক ফ্যামিলি বলিউডি ফিল্মের সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতার আগে থেকে, এবং এখন পর্যন্ত, ওৎপ্রোত জড়িত, অভাবনীয়। ইতিহাসও বটে।

বয়সে বড়ো হলেও দেবানন্দের (অভিনেতা) সঙ্গে বন্ধুতা ঘন। ওঁর ৪২ পালি হিলের ‘নভকেতন’ আস্তানায় গেয়েছি। আস্তানা বললে বেখাপ্পা শোনায়। রীতিমতন ভিলা। পশ্চিম বান্দ্রায়। রাস্তার নাম মজার। ‘জিগ জাগ (আঁকাবাঁকা) রোড।’

সন্ধ্যায়, ‘নভকেতন’-এ, আড্ডা। আড্ডাবাজরা দেবানন্দের বন্ধুকুল। অধিকাংশই সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রী, কলাকুশলী। হঠাৎ দেখি শশি কাপুর স্ত্রীসহ (স্ত্রী জেনিফার কাপুর। অভিনেত্রী) হাজির। আড্ডায় আসেননি। এসেছেন একটি নাটক দেখার অনুরোধ জানাতে। কার্ডও দিলেন। দেবানন্দ বললেন, ‘আমার বন্ধুর জন্য একটি কার্ড চাই। বন্ধু বাংলাদেশের। থাকে কলকাতায়। আজ এখানে উপস্থিত।’ বলে পরিচয় করিয়ে দেন।

শশির কাছে অতিরিক্ত কার্ড ছিল না। বলেন, গেটে আমি থাকবো, প্রবেশে সমস্যা নেই।’

শশি স্বয়ং ‘একটি নাটক দেখার জন্যে’ অনুরোধ করতে এসেছেন দেবানন্দসহ আড্ডার প্রত্যেকে বিস্মিত।

শশির মুখেই শোনা গেল, ওঁর কন্যা সঞ্জনা কাপুর সিনেমার বদলে নাটক করছেন, প্রথম নাটক। অভিনয়, পরিচালনাও। নাটক ইংরেজিতে। এডওয়ার্ড অ্যালবী’র ‘হু’জ অ্যাফরেইড অব ভার্জিনিয়া ওল্‌ফ’ (WHO’S AFRAID OF VIRGINIA WOOLF?)? কন্যার পক্ষ থেকে পিতামাতা, পিতামাতার বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।

প্রথম শো, অর্থাৎ, প্রিমিয়ার।

১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরের প্রথম শনিবারের কথা বলছি।

—শো’য়ে কাপুর ফ্যামিলির প্রায়-সবাই হাজির। অনেক নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক, নাট্যকর্মী, সিনেমার বহু নায়কনায়িকাও।

নাটক-শেষে পার্টি। পার্টিতেই পরিচয় নাট্যকলা, নাটমঞ্চের বহুমানিত কয়েকজনের সঙ্গে। সত্যদেব দুবে। বি ভি করন্থ। হাবীব তানভীর। গিরিশ কানরাড। জাভেদ আখতার (তখনও শাবানা আজমির সঙ্গে বিয়ে হয়নি, প্রেমের দ্বিতীয় পর্ব পোক্ত হচ্ছে।)।

হাবীব তানভীরের ‘চরণদাস চোর’ নাটক বিপুল সাড়া জাগিয়েছে গোটা ভারতে, হাবীব রীতিমতন সেলিব্রেটি। তুলনায় গিরিশ কম। কিন্তু বোদ্ধা দর্শক মহলে তিনিও, বিশেষত ‘তুঘলক’ এবং ‘হয়বদন’ নাটকের জন্যে।

গিরিশের ‘যযাতি’ (গিরিশের প্রথম নাটক) দেখিনি, তুঘলক এবং হয়বদন (হয়বদন-এর বাংলা অনুবাদক কবি শঙ্খ ঘোষ) কলকাতায় মঞ্চস্থ। দেখা।

যেচে আলাপ করলুম গিরিশের সঙ্গে। ভাবিনি, এতটা সময় দেবেন। বাংলাদেশের নাটক নিয়ে উৎসাহী। জানতে চান। বিশেষত, বাংলাদেশের সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনও ‘ক্ল্যাসিক’ নাটক লেখা হয়েছে কিনা।

বলি, ১৯৭৪ সাল থেকে নির্বাসনে, লেখা হলেও বলতে অপারগ।

গিরিশ কথায়-কথায় জানান, ‘বাংলাদেশের ‘নাগরিক’ নামে একটি নাট্যদল বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ মঞ্চস্থ করেছে। জনপ্রিয় হয়েছে।’

বলি, ‘নাগরিক’ তৈরি অগ্রজ জিয়া হায়দারের, আমাদের ভাড়াবাড়ি ঢাকার ১৪/২ মালিবাগে। ‘নাগরিক’ নামটি এই অধম, অশিক্ষিতেরই দেওয়া।’

—শুনে,গিরিশের মৃদু হাসি।

প্রসঙ্গক্রমে রবীন্দ্রনাটকের কথাও, শুরুতেই বলেন, রবীন্দ্রনাথের কোনও নাটক নাটকই নয়। রবীন্দ্রনাথ কোনও নাট্যকারই নন। বাকি সবকিছু। কবি। গল্পকার। ঔপন্যাসিক। গীতিকার। প্রাবন্ধিক। রাষ্ট্রচিন্তাবিদ।’—প্রায়-একই কথা বলেছেন কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায়, সাক্ষাৎকারে।

গিরিশের সঙ্গে কলকাতায়, বোম্বে, বাঙ্গালোরে, পুনে, দিল্লি, লন্ডনে, প্যারিসে, সিকাগোয়, বার্লিনে দেখা হয়েছে। জমজমাট আড্ডাও। গিরিশ স্পষ্টবাদী। কমিউনিজমে বিশ্বাসী। সাহসী। নরেন্দ্র মোদিকে ভোট না দেওয়ার জন্য সোচ্চার, আকুল আবেদনও ছিল দেশবাসীর কাছে।

গিরিশ কানরাডের বহুবিধ কর্মময় জীবন, সব ছাপিয়ে নাট্যকার। ছিলেন ‘আধুনিক’ ভারতের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার, প্রশ্নাতীত। গিরিশের মৃত্যুতে অতিশয় কাতর।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ