তিস্তা চুক্তিতে ব্যর্থতা নাকি সাফল্যের ‘আইওয়াশ’?

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:৩৯, জুন ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪২, জুন ১৭, ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমানবাংলাদেশ-ভারতের অমীমাংসিত সমস্যার ফর্দ অনেক দীর্ঘ। কিন্তু সব সমস্যার মধ্যে তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যাটিই সম্ভবত আলোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে। সত্যি বলতে, এই সমস্যাটির এক ধরনের রাজনীতিকরণ হয়েছে। আর এটি বাংলাদেশের মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়েও গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে ভারত সরকার তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর করতে পারছে না–এমন একটা কথা ভারতের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বলা হয়েছে। এটা ভারত করতেই পারে, এমন একটা ‘ফাঁদ’ তৈরি করা তাদের স্বার্থের অনুকূল হবে। কিন্তু আমরা স্তম্ভিত হয়ে দেখি, এই বয়ানটি বাংলাদেশ সরকারও গ্রহণ করেছে এবং সেটা বলছে দীর্ঘকাল থেকে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সরকার বুঝে অথবা না বুঝে এই ফাঁদে পা দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বাঘা বাঘা মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের বড় নেতারা তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ার পেছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে মন্তব্য করতে শুরু করেন। অথচ সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে, বাংলাদেশ সরকারের কোনোভাবেই উচিত ছিল না ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কোন কারণে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে না, সেটা নিয়ে কথা বলা। একটা রাষ্ট্রের সঙ্গে আরেকটা রাষ্ট্রের যখন তার ন্যায্য অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়, তখন সেটা সেই পর্যায়ে সীমিত রাখা উচিত। 

বৈদেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার ব্যাপারে ফেডারেল রাষ্ট্রগুলোর সংবিধান কেন্দ্রীয় সরকারকে ভিন্ন ভিন্ন রকম ক্ষমতা দেয়। যেমন—কোনও রাজ্যের স্বার্থ সরাসরি জড়িত থাকলে কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার অন্য কোনও রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে সব সময় সর্বময় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে না; রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়। ভারতের সংবিধান এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। 

পড়ে নেওয়া যাক ভারতীয় সংবিধানের আর্টিক্যাল ২৫৩

‘Notwithstanding anything in the foregoing provisions of this Chapter, Parliament has power to make any law for the whole or any part of the territory of India for implementing any treaty, agreement or convention with any other country or countries or any decision made at any international conference, association or other body.’

শুরুতে বলেছিলাম তিস্তা চুক্তির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মেলানো একটা পরিকল্পিত ফাঁদ। এটাকে ফাঁদ বলছি কারণ, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর করার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কোনোরকম সম্পৃক্ততার প্রয়োজন নেই। ভারতের সংবিধান একচ্ছত্রভাবে কেন্দ্রীয় সরকারকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে। এরপরও বারবার পশ্চিমবঙ্গকে কারণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা মানেই হচ্ছে, এই চুক্তির ব্যাপারে ভারত সরকার গড়িমসি করার একটা অজুহাত তৈরি করেছে।

বিগত বিজেপি সরকারও অত্যন্ত শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার ছিল, কিন্তু তারপরও তারা তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর করেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কারণ হিসেবে দেখালেও আমি বিশ্বাস করি, এর পেছনে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল। এবারের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ঘাড়ে শ্বাস ফেলে সেটা এর মধ্যেই বিজেপি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। 

পত্র-পত্রিকায় দেখেছি, আমাদের অনেকে রিপোর্ট করছেন কেন্দ্রে প্রবল প্রতাপে ক্ষমতায় ফিরে আসা এবং পশ্চিমবঙ্গে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা বিজেপি এবার সম্ভবত তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা করবে। অনেক জায়গায় ভারতের, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূতরা উভয় দেশের থিংকট্যাংকের লোকজন বেশ আশা প্রকাশ করছেন এ ব্যাপারে। আমি পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞ নই, কিন্তু খুব সাধারণ জ্ঞান দিয়ে আমার মনে হয়, ভারত সহসাই তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করবে না। 

২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। লোকসভা নির্বাচনের ফল বিজেপিকে আশাবাদী করার যথেষ্ট কারণ আছে, তারা সামনের বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার গঠন করবে। এরকম সময়ে তিস্তা চুক্তি করা বিজেপির পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব না। এমনকি তারা বিধানসভা নির্বাচনে জিতলেও এই চুক্তি করবে না–এমন এই সন্দেহ পোষণ করার যথেষ্ট কারণ আছে। আমার বিবেচনায় এর কারণ মূলত দু’টি।

প্রধান কারণটায় পরে আসছি, আগে অন্য কারণটা বলা যাক। সেটা হলো, বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল। অনেক বিশ্লেষককে ভুল প্রমাণিত করে বিজেপি এবার আগের চেয়ে বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে অর্থনীতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সবাইকে নিয়ে উন্নতি-অগ্রগতির স্বপ্ন দেখানো বিজেপি সেসবে ফেল করে এবারের নির্বাচনের আগে ধর্মভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদকে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। সেই অস্ত্র যে একেবারেই মোক্ষম, সেটা দারুণভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

ধর্মভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদের যে সমস্যা, সেটা হলো নিজ দেশের অসংখ্য নাগরিকের (মুসলিম এবং দলিত মিলে সংখ্যাটা ৪৫ কোটির বেশি) ন্যায্য অধিকারবঞ্চিত করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। সেখানে পার্শ্ববর্তী একটা দেশের স্বার্থরক্ষা করার দায় কি তাদের তৈরি হবে? বরং নিজ দেশের মানুষের স্বার্থরক্ষা করার জন্য অন্য দেশকে নদীর পানি দেওয়া হয়নি, এটা বরং ভারতের বিদ্যমান ভোটের বাজারে অনেক ভালো বিকোবে।

নিজ দেশের ভোটারকে অসন্তুষ্ট করে ও অনেক সময়ই অনেক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে, কিন্তু ভারত এটা করবে, সেই আশা আমি দেখি না খুব একটা। আসা যাক প্রধান কারণটায়।

আন্তঃরাষ্ট্রিক চুক্তি কখনও চ্যারিটি নয়, এটা দুই পক্ষের স্বার্থ নিয়ে কঠোর দরকষাকষির ব্যাপার। এটা সবলতা আর দুর্বলতার ব্যাপার। কোনও দুর্বল পক্ষ এসব দরকষাকষিতে কখনও ভালো করতে পারার সম্ভাবনা নেই।

বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় আকারে এবং মোট অর্থনীতিতে অনেক ছোট। আমার মতে, ২০১৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশে একটা ‘জনপ্রতিনিধিত্বহীন’ সরকার ক্ষমতায় আছে। এই সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে দেশের ভেতরের কিছু শক্তি এবং দেশের বাইরের কিছু শক্তির সহায়তায়। ২০১৪ সালে নির্বাচন ব্যতীত ক্ষমতায় থাকতে ভারত সরকার আওয়ামী লীগকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করেছে, তার একাধিক প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। সেই সময় ভারতের পররাষ্ট্র সচিবকে বাংলাদেশ সফরে এসে প্রকাশ্যে নির্বাচন নিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে দেখেছি। তৎকালীন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদের বই ‘দ্য আদার সাইড অভ দ্য মাউন্টেন’ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির বই ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ার্স’ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেয়, ওই সময় বাংলাদেশের এই সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভারত সরকার কী কী করেছে।

বাংলাদেশের যে সরকারটি এরকম সমর্থনের ফলে টিকে আছে, সেই সরকারটি ভারতের সঙ্গে তার ন্যায্য অধিকার নিয়ে দর কষাকষির ক্ষেত্রে ন্যূনতম কোনও শক্তি পাওয়ার কারণ নেই। এটা ভারতও জানে। তাই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের এই চুক্তি করার কোনও কারণ নেই। যেহেতু এই দেশে ক্ষমতায় থাকতে এখন আর মানুষের ভোট লাগছে না, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতকে এই চাপও দিতে পারবে না—এই চুক্তি না হলে তাদের জনপ্রিয়তায় ধস নামবে এবং তারা পুনর্নির্বাচিত হতে পারবে।

১৯৯৬ সালের সরকারের সময় একটা গঙ্গা চুক্তি করা হয়েছে বলে বর্তমান সরকার বিরাট কৃতিত্ব দাবি করে। কিন্তু প্রতিবছর শুকনো মৌসুমে আমরা দেশের পত্রিকার রিপোর্টে দেখি, পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে গাড়ি পার হয়। এই চুক্তিতে আদৌও সঠিক যুক্তি ছিল না, তার স্বীকৃতি বর্তমান সরকারের কথাতেই আছে।

২০১৭ সালে ভারত সফরের সময় ১০ বছর বাকি থাকতেই গঙ্গা চুক্তি নবায়ন না করে নতুনভাবে করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী ভারতকে জানিয়েছিলেন (এমন রিপোর্ট বিবিসি বাংলায় এসেছিল)। অর্থাৎ কাগজে সই করে একটা চুক্তি করাও দেশের স্বার্থরক্ষা করার জন্য যথেষ্ট না।

এই তথ্যের ভিত্তিতে তিস্তা নিয়ে একটা অন্য আশঙ্কাও মনে আসে। ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর তিস্তা নিয়ে একটা ‘আইওয়াশ’ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হতেও পারে। গঙ্গায় যেমন ফারাক্কা পয়েন্টের পানির ভাগাভাগিতে আমাদের কল্যাণ হয়নি, তেমনি তিস্তার ক্ষেত্রে গজলডোবা পয়েন্টের পানি ভাগাভাগি করে লাভ হবে না আমাদের, কারণ এর আগেই পানি প্রত্যাহার করা হলে আমাদের কিছু করার থাকবে না। বলাবাহুল্য, গঙ্গা চুক্তির মতো ত্রুটিপূর্ণ আরেকটা চুক্তি করে দীর্ঘমেয়াদি পানির বঞ্চনায় ঢুকে যাওয়া আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের খুব পরিপন্থী হবে। নাগরিকদের এ ব্যাপারে সতর্ক এবং সোচ্চার থাকা উচিত। 

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

 

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ