অপেক্ষায় আছি...

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৯:০০, জুন ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৯, জুন ১৮, ২০১৯

রেজানুর রহমানটসে জিতেছে বাংলাদেশ। মাশরাফি বিন মর্তুজা সিদ্ধান্ত নিলেন বাংলাদেশ দল প্রথমে ফিল্ডিংয়ে নামবে। সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাশরাফির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরূপ সমালোচনা শুরু হয়ে গেল। বাংলাদেশে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে খেলার অনুষ্ঠানেও মাশরাফির এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা শুরু হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন লিখলেন, যে অধিনায়ক বোঝে না টস জিতলে কি করা উচিত তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা দরকার। অন্য আরেকজন কৌতুক করে লিখলেন, ৩২২ করতে পারলে তোগো বাপের নামে কোরবানি দিবরে ভাগিনার গোষ্ঠী... ততক্ষণে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ৩২১ রানের পাহাড় গড়ে ফেলেছে। বাংলাদেশকে জিততে হলে ৫০ ওভারে করতে হবে ৩২২ রান। না, বাংলাদেশ এই রান তাড়া করে জিততে পারবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ দলকে ঘিরে নেতিবাচক কথার খই ফুটতে শুরু করলো। অধিকাংশ মানুষের সমালোচনার তীর দলপ্রধান মাশরাফিকে ঘিরে। যেন টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত না নিয়ে মারাত্মক ভুল করেছেন মাশরাফি। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে সাকিব, লিটন দাস, তামিম ও সৌম্য সরকারসহ দলের সকল খেলোয়াড়ের দলীয় নৈপুণ্যে ৯ ওভার বাকি থাকতেই বাংলাদেশ দল অতি সহজেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর পরই বদলে গেল পরিবেশ। কিছুক্ষণ আগে যারা বাংলাদেশ দলের সমালোচনায় ছিলেন মুখর, তাদেরই কেউ কেউ বাংলাদেশ দলকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিতে শুরু করলেন। একটু আগে মাশরাফি ছিলেন ভিলেন। বিজয়ের পর হয়ে গেলেন নায়ক।

কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশ দলের সমর্থকদের আচরণগত পার্থক্য দেখে একটি গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। একটি গ্রামে কবীর নামে একজন মেধাবী ছাত্র দশম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পর গ্রামের মাতব্বর একটু যেন অবাক হন। কারণ, একই ক্লাসে তার ছেলেও পড়ে। কিন্তু সে পাস করতে পারেনি। মাতব্বরের চ্যালাচামুণ্ডারা মাতব্বরের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন। মাতব্বর সাব এইটা কি করে সম্ভব হলো? যেখানে আপনার ছেলে পরীক্ষায় পাসই করতে পারল না সেখানে গরিব মাস্টারের পোলা কবীর ‘ফার্স্ট’ হয় কি কইর‌্যা? এইটার একটা বিহিত করেন।

মাতব্বর সবার কথা শুনে শুধুই হাসেন। অবজ্ঞা করার ভঙ্গিতে বলেন, ক্লাসের পরীক্ষায় কোনোভাবে হয়তো ‘ফার্স্ট’ হইছে। দেখিস ম্যাট্রিকে ডাব্বা মারবো...। কিন্তু কবীর হোসেন ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ঠিকই জিপিএ-৫ নিয়ে পাস করে। মাতব্বরের চ্যালাচামুণ্ডারা আবার দৌড়ে আসে মাতব্বরের কাছে। এইটা কি হইলো মাতব্বর সাব। কবীর তো দেখি ভালোভাবেই ম্যাট্রিক পাস করলো। মাতব্বর আবারও সেই ঈর্ষাকাতর হাসি দিয়ে বলেন, ঝড়ে বক মরে বলে একটা কথা আছে না? কবীরের বেলায়ও তা-ই ঘটছে। ম্যাট্রিক পাস করছে তো কি হইছে? সে কলেজে ভর্তির সুযোগ পাইবো না। কলেজে ভর্তি হওয়া অত সোজা না...।

বলা বাহুল্য, কবীর তার মেধাগুণে ঠিকই দেশের একটি ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ পেলো এবং দুই বছর পর সেই কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে আবারও জিপিএ-৫ নিয়ে পাস করলো।
আবারও মাতব্বরের কাছে ছুটে এলো তার চ্যালাচামুণ্ডারা। মাতব্বর সাব, কবীর তো দেখি আবারও পাস দিলো। শুনতেছি সে নাকি এবার ভার্সিটিতে ভর্তি হবে। সবার কথা শুনে মাতব্বর আবারও ঈর্ষাকাতর ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বললেন, ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া অত সোজা না। কবীর আর আগাইতে পারবে না।
বলা বাহুল্য, কবীর তার মেধাগুণে ঠিকই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো এবং অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একপর্যায়ে জেলা প্রশাসকের চাকরি পেল! নিজের গ্রামে একটি কলেজের উদ্বোধন করতে আসবেন নতুন জেলা প্রশাসক। এবার নিজেকে বদলে ফেললেন গ্রামের মাতব্বর। যাকেই কাছে পান তাকেই কবীরের কৃতিত্বের কথা বলেন। বলেছিলাম না আমাদের কবীর একদিন অনেক নাম করবে। দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। কী আমার কথাই সত্য হলো তো...।
প্রিয় পাঠক, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সঙ্গে এই গল্পের কোনও মিল খুঁজে পেয়েছেন কি? একটা মিল তো নিশ্চয়ই খুঁজে পেয়েছেন। সেটা হলো অহেতুক সমালোচনা করা। ধরা যাক, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে বাংলাদেশ দল যদি হেরে যেত তাহলে পরিস্থিতিটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো? দল প্রধান মাশরাফি বিন মর্তুজাকে অনেকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেন। অনেকে নানান অপ্রীতিকর কথা হয়তো লিখতেন মাশরাফির ব্যাপারে। হয়তো সাকিব আল হাসানকে নিয়েও বিরূপ সমালোচনা করতে শুরু করতেন অনেকে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অবদানের কথা আমরা কি ভুলে যাচ্ছি! এই যে কথায় কথায় হঠাৎ সমালোচনা করি তা কি ঠিক? মাশরাফি বিন মর্তুজা কতটা শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তা কি আমরা সবাই জানি? হাঁটুর মারাত্মক ইনজুরি সত্ত্বেও আমাদের মাশরাফি দলকে গভীর মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে খেলা চলাকালে মাশরাফি হঠাৎ মাঠ ছেড়ে চলে যান। কোথায় গেলেন মাশরাফি? হঠাৎ ক্যামেরা খুঁজে পেলো তাকে। হাঁটুর ব্যান্ডেজ সরে গিয়েছিল। সেটাই বেঁধে নেওয়ার জন্য ড্রোসিং রুমে এসেছেন তিনি। টিভি পর্দায় এই দৃশ্য দেখে অনেকেরই চোখ ভিজে গেছে!
এভাবেই দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছে মাশরাফি বিন মর্তুজা। তিনি যেদিন দলে থাকবেন না সেদিনই বোধকরি আমরা বুঝতে পারবো মাশরাফি আমাদের ক্রিকেটের জন্য কি করে গেছেন। মাশরাফি আমাদের ক্রিকেটের জন্য কতটা অপরিহার্য ছিলেন।
ভাগ্য ভালো, বলতে হবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল দারুণ বীরত্ব দেখিয়েই জিতেছে। হেরে গেলে সমালোচনার তীরটা এতটাই বিষমাখা থাকতো যে তা কল্পনা করতে গিয়ে বিব্রত হচ্ছি। খেলা মানেই জয়-পরাজয় থাকবে। কাজেই দুটি বিষয়েই আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে হবে। দল জিতলে মাথায় তুলে নাচবো, আবার হারলে তাদের গোষ্ঠী উদ্ধার করে সমালোচনা করবো- এটা তো হতে পারে না। হারলেও আছি, জিতলেও আছি- বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এটাই হোক সমবেত আন্তরিকতা।
আমাদের বোধকরি একটা কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা উচিত, খেলায় জেতার জন্যই নামেন খেলোয়াড়রা। কেউই হারার জন্য খেলায় নামেন না! কাজেই আমরা যেন প্রিয় খেলোয়াড়দের ব্যাপারে অহেতুক সমালোচনায় ব্যস্ত না হয়ে উঠি...।
ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে সেরা ৫ নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। সামনে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া দুই শক্তিধর প্রতিপক্ষের একটিকে সামাল দিতে পারলেই সেমিফাইনালের পথ পরিষ্কার হবে বলে আশা করি। কাজেই এখন প্রয়োজন প্রিয় দলকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রিয় অভিনেত্রী ডলি জহুরের দুটি বক্তব্য উল্লেখ করে আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই। মাঠে তখন বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলা চলছে। ডলি জহুর লিখলেন, মেলবোর্নে তখন ১২টা ২৫। দেশের ছেলেদের মাঠে রেখে ঘুমাতে যেতে পারছি না। মাশাআল্লাহ, শেষটুকু দিয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল কর বাবারা...।
খেলা শেষে তিনি আবার লিখলেন, অভিনন্দন সাকিব, লিটন দাস। জানটা ঠান্ডা করে দিয়েছো।
আসলেই জানটা ঠান্ডা করে দিয়েছে আমাদের বীর ক্রিকেটাররা। এবার আরও সাফল্যের অপেক্ষায় আছি...।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো

 

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ