মাঝ বৃত্তে মধ্যবিত্ত

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:৩৩, জুন ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৩, জুন ১৯, ২০১৯

 

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাবহুদিন ধরেই, শহুরে মধ্যবিত্তের কষ্টের জীবনটা উপলব্ধি হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের একেবারে ধরাবাঁধা আয়ে এই বিপুল খরচের শহরে চলতে হয়। তাদের জীবনে যানজটের অভিযোগ নেই, কারণ তারা এটা মেনেই নিয়েছে। তাদের জীবনে জিনিসপত্রের দাম নিয়েও কিছু বলার নেই। কারণ এটাও তারা কপালের লিখন বলে ধরে নিয়েছে। তারা এও মেনে নিয়েছে, সন্তানের ভালো শিক্ষা আর পরিবারের উপযুক্ত চিকিৎসা শুধু স্বপ্ন, বাস্তব নয়।
কিন্তু তাদের জিজ্ঞাসা আছে। তারা জানতে চায়–এত যে প্রবৃদ্ধি, এত যে ধেই ধেই করে বেড়ে ওঠা মাথাপিছু আয়, সেটা কেন তাদের ছুঁয়ে যায় না? সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের পরও এরকম একটা শংকার কথা বিশ্লেষকরা বলে চলেছেন, নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্তের কষ্ট কেবল বাড়ছেই। তো সেই মধ্যবিত্ত কারা? অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের এক লেখায় দেখলাম; তিনি বলেছেন, ‘মধ্যবিত্ত দারিদ্র্যের দোদুল্যমানতা থেকে কিছুটা মুক্ত আবার প্রাচুর্যের সুখেরও বাইরে।’ অর্থাৎ একটা মাঝ বৃত্তে আটকে আছে মধ্যবিত্ত।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার বাজেট বক্তৃতায় যে শিরোনাম করেছেন, তার একটি অংশ বলছে—‘সময় এখন আমাদের’। অবশ্যই তিনি সময়টা বাংলাদেশের বলতে চেয়েছেন। কিন্তু মানুষ স্বাভাবিকভাবে নিজের সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করে। মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক ভাবনা যেহেতু ধনী আর দরিদ্র শ্রেণি থেকে উন্নততর, তাই তারা ভেবেই চলেছে সময়টা আসলে কাদের? তাদের যে নয়, সে তারা ভালো করেই জানে।

একটা ধারণা প্রায় পাকাপোক্ত হয়ে গেছে—নব্বইয়ের দশকে বাজার অর্থনীতির পথে যে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ, সেই পথে আর নেই। বাজার আছে, ব্যবসায়ী আছে, ভোক্তা আছে, কিন্তু বাজার অর্থনীতি নেই। সেই জায়গা দ্রুত দখল করে নিয়েছে Crony capitalism বা গোষ্ঠী পুঁজিবাদ। এই অর্থনৈতিক মডেল এমন এক মডেল, যা সামষ্টিক জনগোষ্ঠীর নয়, কেবলমাত্র কিছু স্বজনের তুষ্টির জন্য। আসলে এটি রাজনৈতিক মডেল। ক্ষমতা কাঠামোকে এমন একটা আকার দেওয়া হয়, বড় বড় ব্যবসা ও প্রকল্প, বড় বড় পদ পদবি চুক্তিতে সেই স্বজনদের দখলে চলে যাবে। এই পুঁজিবাদ নীতিনৈতিকতার বাইরে হাঁটে বলে দুর্নীতিকে সঙ্গে নিয়েই চলে।

বাংলাদেশ ঠিক এমনটাই হয়ে গেছে, তা বলা যাবে না হয়তো এখনই। তবে অর্থনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত, সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন মধ্যবিত্ত নিজেকে আবিষ্কার করছে, সে আসলে কোথাও নেই। শাসনরীতিই পাল্টাচ্ছে। একটা সময় ছিল, যখন নির্বাচনের মাধ্যমে অতি সাধারণ কেউ বিজয়ী হয়ে আসতেন। রাস্তার রাজনীতি বা জনপ্রিয় রাজনীতি এখন আর নির্বাচনী রাজনীতির যোগফল নয়। জনসাধারণের জীবন-জীবিকা রক্ষার সংগ্রামে যিনি রাজনীতি করেন, তাকে খোদ জনগণই পাত্তা দেয় না। নির্বাচনি রাজনীতিতে পাস করার একমাত্র যোগ্যতা যেকোনও উপায়ে বিত্তশালী হওয়া।

বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক বিভাজনটা হয়েছে, তা প্রকাশ্য এবং দৃশ্যমান। চাকরি, পদোন্নতি, ঠিকাদারি, ব্যবসা ইত্যাদি কোনও কিছুই এখন দলবাজি ছাড়া ন্যায্য প্রাপ্তি হিসেবে অর্জন করা সম্ভব নয়। ফলে, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি অংশ তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দলবাজি করতে বাধ্য হচ্ছে। সমাজের আরেকটি বিভাজনও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এক দল দ্রুত ওপরের দিকে ধাবমান। এর ফলে আরেক দল দ্রুত নিচে নামছে, বলতে গেলে প্রান্তে চলে যাচ্ছে। অসাম্য এমনভাবে বাড়ছে, যার দাপটে মধ্যবিত্ত বলে কোনও শ্রেণিই আর থাকবে না বলে আশংকা আছে। সরাসরি দুই ভাগের সমাজ হতে চলেছে বাংলাদেশ–ধনী আর দরিদ্র বা উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্ত।

বাজারি অর্থনীতির আদর্শে উচ্চবিত্ত সমাজও গরিবি হটানোর কথা বলে। কিন্তু তা আসলে হয় না। মাথাপিছু আয় যত বাড়ছে, বৈষম্য তত উৎকট হচ্ছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় একটা ছোট আকারের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে, তেমনি সরকারের লোকজনের বেতন, ভাতা, নানা ধরনের উপহার বেড়েছে, তারা স্ফীত হয়েছে। বেতনের বাইরে স্পিড মানির বদৌলতে তাদের উপরি আয়ের স্পিডও দ্রুতগতিতে ধাবমান। সরকারের বাইরে বিশাল বাণিজ্য জগৎ থাকলেও কর্মসংস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। আবার হলেও পারিশ্রমিকের স্বল্পতায় দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করছে বিশাল এক জনগোষ্ঠী। শহরে, গ্রামে এই দলেই বিচরণ মধ্যবিত্তের। আসলে অন্তহীন দুর্নীতি, সরকারি উপহারে একটি ক্ষুদ্র, কিন্তু শক্তিশালী সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি হওয়ায় তারা প্রভুত্ব করছে আর সবার ওপর। এভাবে বৈষম্য বেড়ে চলেছে লাগামহীন।

এই যে ক্ষুদ্র, কিন্তু অতি শক্তিশালী শ্রেণির কথা বলছি, এরা একজোট হয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীর খাটুনির ফল বিনাশ্রমে উপভোগ করছে। বৈষম্য নিরসনকেই উন্নয়নের দর্শন হিসেবে গ্রহণ করে এগোতে না পারায় বাজারিকরণের নীতিকে আঁকড়ে ধরার ফলে এ দেশে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য বেড়ে বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে গেছে। শুধু উন্নয়ন দিয়ে আর সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সম্ভব হচ্ছে না। বহুমুখী কিছু ভাবতে হবে। আমাদের ভেতর ভয়ংকর এক প্রতিযোগিতার প্রবৃত্তি সৃষ্টি হয়েছে। বৈষম্যবৃদ্ধিকারী হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে সংস্কৃতি সচেতন মধ্যবিত্তের হার নিশ্চিত। অল্প কিছু হয়তো সুযোগ আর যোগাযোগের পথ ধরে উপরে উঠলেও উঠতে পারে।  

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা   

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ