উত্তাপ ফিরছে সংসদে

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৫:২৭, জুন ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৬, জুন ২৩, ২০১৯

মোস্তফা হোসেইনজাতীয় সংসদের উত্তাপ বাইরেও ছড়ায়। চলতি অধিবেশনে কয়েকজন সদস্য তেমনি কমবেশি আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছেন বাইরের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ও সাধারণ মানুষকেও। বলতে দ্বিধা নেই, এ সুযোগটি আসতে সহায়তা করেছে বিএনপি দলীয় এমপিদের সংসদে যোগ দেওয়ার কারণে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদসহ পাঁচ এমপি শপথ নেওয়ার পর অনেকেই তেমনি প্রাণবন্ত সংসদের কথা ভাবতে শুরু করেছেন। সর্বশেষ বিএনপি মনোনীত ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা যোগ দেওয়ার পর জাতীয় সংসদের অধিবেশন প্রকৃত অর্থেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মানুষ ভাবতে শুরু করে বিএনপি হয়তো ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। কারণ, তাদের রাজনীতি করতে হলে যে এর বিকল্প নেই। এই সুযোগে আলোচনায় আসছে বিএনপির সিদ্ধান্ত নিয়েও। বিএনপির এমপিগণ শপথ নেওয়ার আগে যে আলোচকরা বিএনপিকে সরাসরি সমালোচনা করেছেন তারাই এখন তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে বলে মনে করছেন। আর এটা তো সত্য,সংসদ অধিবেশন চলাকালে বিএনপি দলীয় এই ছয়জন যেটুকু মিডিয়া কভারেজ পাচ্ছেন তা তাদের দলের পক্ষে মেঠো বক্তৃতার মাধ্যমে এই মুহূর্তে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।
দলটি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে,তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। তাদের মিটিং-সমাবেশ করতে দেওয়া হয় না। যদিও পত্রিকাগুলো বিএনপির মানববন্ধনের খবর নিত্য প্রচার করছে। বিশ্লেষকরা বিএনপিকে কর্মসূচিবিহীন এমনকি লক্ষ্যবিহীন সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করছেন এরপরও। এটা তো সত্য—তাদের এমন কর্মসূচিগুলো জনমনে আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা প্রথম সংসদ সদস্য হওয়ার পর সংসদে যোগ দিয়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে যেতে সক্ষম হয়েছেন। এটা কি কম কথা? একজন সংসদ সদস্য যখন আলোচনা ও সংবাদ শিরোনাম হওয়ার সুযোগ পান, তখন মনে করতেই হবে তিনি সংসদে অন্তত আসন অলংকৃত করতেই যাননি। প্রশ্ন আসতে পারে, আসলে সংসদে উত্তাপ ছড়াতে গিয়ে তিনি দেশ ও দলের জন্য কতটা অবদান রাখছেন। আর সংসদীয় রীতি অনুযায়ী এবং সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি কতটা মেনে চলছেন ইত্যাদি। বিশেষ করে বাজেট অধিবেশন চলাকালে তিনি জনগণের জন্য কতটা বলতে পারছেন। অর্থাৎ তার বক্তব্যে জনস্বার্থ বিশেষ করে আলোচ্যসূচি অনুযায়ী তিনি কতটা বলতে পারছেন, বাজেট কীভাবে তিনি বিশ্লেষণ করছেন ইত্যাদি।

স্বীকার করতে হবে, বর্তমান সংসদ পরিচালক তথা স্পিকার সেক্ষেত্রে উদার নীতিকেই যথারীতি গ্রহণ করেছেন। বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তিনি নির্ধারিত সময় প্রদান করছেন। সরকারদলীয় সদস্যদের হইচই এবং প্রতিবাদের পরও নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে তিনি মাইক অফ করে দেননি। কিন্তু ওই সংসদ সদস্যগণ এটাকে কীভাবে ব্যবহার করছে তা বিবেচ্য।

দেখা গেছে, বাজেট অধিবেশনে অনেক এমপিই দলীয় এজেন্ডাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। বাজেট সম্পর্কে বিশ্লেষণ না থাকা অর্থাৎ বাজেটের ভালো-মন্দ দিক আলোচনা না করে যখন মেঠো রাজনীতিকে সংসদের ভেতরে নিয়ে আসেন, তখন সঙ্গতভাবেই সংসদীয় বিষয়গুলো আলোচনায় গৌণ হয়ে পড়ে। তবে এটা বলা যাবে না যে, সংসদের বাজেট অধিবেশনে কখনও দলীয় রাজনীতির বিষয় আলোচনা করা যাবে না। কিংবা আগে কখনও এটা হয়নি এমনটাও মনে করার কারণ নেই। বরং চলতি অধিবেশনেও আগের মতো সবাই কমবেশি দলীয় রাজনৈতিক বিষয়কেও আলোচনায় এনেছেন। এটা সরকার দলীয় এমপি হোক কিংবা বিরোধী দলীয় হোক। প্রশ্ন হচ্ছে, আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে তাদের এই রাজনৈতিক আলোচনাগুলো কতটা সংশ্লিষ্ট।

সুযোগ পেয়ে স্ববিরোধী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন বিএনপি থেকে নির্বাচিত এমপিগণ। এটা সরকার দলীয় সদস্যগণ সংসদেই মন্তব্য করেছেন। আবার অসংসদীয় শব্দ ব্যবহারের কারণে স্পিকার বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বক্তব্য থেকে কিছুটা এক্সপাঞ্জও করেছেন। এটাও সংসদীয় রাজনীতিতে অস্বাভাবিক কিংবা নতুন কিছু নয়। তবে, বিরোধী দল হিসেবে মনখোলা বক্তব্য দেওয়ার বাড়তি সুযোগটি যে তারা পেয়েছেন, তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। কথা হচ্ছে, পরে এই সুযোগটি তারা কতক্ষণ এবং কীভাবে ব্যবহার করবেন।

তারা তো ইতোমধ্যে বড় একটি সুযোগও হারিয়েছেন। তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলামকে সংসদের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তটি যে ভুল ছিল তা কি তারা বুঝতে পারছেন? মির্জা ফখরুল ইসলামের ছেড়ে দেওয়া আসনে আবার নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেখানে বিএনপি প্রার্থী যে নির্বাচিত হবেন তা কি হলফ করে বলা যাবে? তবে এটা ঠিক, বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, মির্জা ফখরুল ইসলামকে সংসদে পাঠানো থেকে বিরত থেকে। আজকে হারুনুর রশিদ যেমন বলছেন, সংসদে ছয় সদস্যের তাদের দলটিই প্রকৃত অর্থে বিরোধী দল, ২৬ এমপির জাতীয় পার্টি নয়। এই বক্তব্যটি আরও জোরালো হতো যদি মির্জা ফখরুল ইসলাম সাহেব সংসদে থাকতেন। আজকে ৬ এমপিকে যেভাবে মিডিয়া গুরুত্ব দিচ্ছে মির্জা ফখরুল ইসলাম যদি সংসদে থাকতেন তাহলে অবশ্যই এর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতেন। তাই এক যাত্রায় দুই ফল হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় বিএনপি দলীয় এমপিদের শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি কি আগামী দিনেও সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু করে বসে কিনা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির গত বৈঠকটি হয়েছে শপথ বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রায় দেড় মাস পর। তাও মুলতবি করতে হয়েছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে। দলটির অভ্যন্তরে নেতা পর্যায়ের বিভক্তি এবং মতানৈক্য যেভাবে দৃষ্টিগোচর হয়েছে, সেই সমস্যা কি তারা কাটিয়ে উঠতে পারবে? আগামী শনিবারও তাদের স্থায়ী কমিটির মুলতবি সভা হওয়ার কথা। সেখানে কি নেতাদের মধ্যে আস্থাহীনতা কাটানোর কোনও কার্যকর প্রয়াস নেওয়া হবে?

বিশ্লেষণকে আমলে এনে যদি তারা কর্মসূচি গ্রহণ করেন, তাহলে সুফল আসতেও পারে। তারা নিশ্চয়ই মনে করেন, শক্তিশালী একটি বিরোধী দল তাদের দলীয় প্রয়োজনেই শুধু নয়, সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্যও এই মুহূর্তে প্রয়োজন। আর তাদের সেই সুযোগটি গ্রহণ করতে হলে তাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এতে হয়তো এই মুহূর্তেই সরকারের ভিত নড়বড়ে করা সম্ভব হবে না, তবে তাদের ও গণতন্ত্রের ভিতটা শক্ত হবে।

এমন পরিস্থিতি এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য যে রাজনৈতিক শক্তিমত্তা প্রয়োজন তাকে স্বীকার করতে হবে। বিএনপি সেই শক্তি অর্জনে কতটা আন্তরিক তার ওপরই নির্ভর করে তাদের ভবিষ্যৎ।

সংসদের ভেতরে বিএনপি যে উত্তাপ ছড়াচ্ছে তা বাইরে নিতে হলে সেই শক্তি ছাড়া কখনও সম্ভব হবে না। অন্যের ঘাড়ে চড়ে নয়,নিজেদের বলে বলীয়ান না হতে পারলে সংসদের উত্তাপ বাইরের অনাকাঙ্ক্ষিত আষাঢ়ে আবহাওয়ার তাপকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হবে না এটা তো বলাই যায়।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

 

/এমওএফ/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ