জাতীয় সংসদ গরম, উত্তেজনা চরম

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৮:৩৯, জুন ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৮, জুন ২৩, ২০১৯

মো. জাকির হোসেনবাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নতুন সেনসেশন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। গত ১১ জুন (মঙ্গলবার) রাতে তিনি সংসদে যোগ দেওয়ার পর থেকেই প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছেন। তিনি সংসদে দাঁড়ালেই ৩০০ জন এমপি উত্তেজিত হয়ে পড়েন বলেও দাবি করেছেন। এ লেখাটা শুরু করার আগে আমি ইউটিউবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. হারুনুর রশীদের বাজেট বক্তৃতা শুনেছি। বাজেট নিয়ে তিনি খুব কম কথাই বলেছেন। পুরা সময় বাজেটের বাইরে অত্যন্ত তীব্র ভাষায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। সরকার দলীয় এমপিদের ক্ষীণ প্রতিবাদ ভেসে এলেও তাদের উত্তেজিত হতে দেখিনি। ভিডিওতে দেখা যায়, বিএনপির এমপি মো. হারুনুর রশীদের  বক্তব্যের সময় প্রধানমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত ছিলেন। সরকারের দুর্বলতার সমালোচনা করা, সরকারকে পরামর্শ দেওয়া গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও সংসদীয় রীতি।
বিএনপির অন্য এমপিরা মোটামুটি নির্বিঘ্নে তাদের বক্তব্য সংসদে উপস্থাপন করতে পারলেও রুমিন ফারহানার ক্ষেত্রে কেন ৩০০ জন এমপি উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন? ৩০০ জন উত্তেজিত হচ্ছেন অন্য ৪৯ জন কেন হচ্ছেন না? তাদের সঙ্গে রুমিন ফারহানার কোনও সমঝোতা চুক্তি রয়েছে? রুমিন ফারহানায় কেন এত উত্তেজনা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমি তার বক্তব্যে দু’টি প্রসঙ্গ খুঁজে পেয়েছি, যা উত্তেজনার মূল কারণ হয়ে থাকতে পারে।

প্রথমত, রুমিন ফারহানা সংসদে যোগ দিয়ে সংসদকে ‘অবৈধ’ বলেছেন এবং দ্বিতীয়ত, তিনি জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ দাবি করে বক্তৃতা করেছেন। আওয়ামী লীগ ও মহাজোট থেকে নির্বাচিত এমপিদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যে সংসদকে রুমিন ফারহানা ‘অবৈধ’ মনে করেন, সে সংসদে তিনি এলেন কেন? সংবাদে প্রকাশ, সংসদে আসতে তাকে বিএনপির অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে। আশীর্বাদের জন্য লন্ডন অবধি দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে। সৎ, চরিত্রবান মানুষেরা অবৈধ জিনিসকে এড়িয়ে চলেন কিংবা অবৈধ বিষয়কে সমাজ-রাষ্ট্র থেকে উৎখাত করতে আন্দোলন করেন, শক্তি প্রয়োগ ও অর্থ ব্যয় করেন। কেবল অসৎ, দুশ্চরিত্র, মতলববাজরাই অবৈধ বিষয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। অসৎ সঙ্গকে আলিঙ্গন করেন। রুমিন ফারহানা জেনে-শুনে কেন অবৈধ সংসদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়ালেন? অবৈধ সংসদের প্রতি কেন, কিসের এত দুর্নিবার আকর্ষণ? আর অবৈধ সংসদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে তা থেকে নাজায়েজ ফায়দা নিয়ে, বক্তৃতার মজা লুটে তাকে অবৈধ বলে গালি দেবেন, তাহলে আপনাকে আমরা ভালো, বৈধ বলবো কী করে? তেলে-জলে যেমন মিশ খায় না, তেমনি বৈধের সঙ্গে অবৈধের সম্পর্ক হতে পারে না। সরকার গণতন্ত্রের স্পেস দিচ্ছে না বলে ‘অবৈধ সংসদে’ যোগ দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার সুযোগ নিচ্ছেন বলে বিএনপি সাংসদদের কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছেন। বিএনপি সাংসদদের এ রূপ দাবি যদি যৌক্তিক হয় তাহলে কেউ তো এ দাবিও করতে পারেন যে, সৎপথে জীবন-যাপনের জন্য সরকার চাকরির ব্যবস্থা করছে না বলে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে আয়-রোজগারের সুযোগ নিচ্ছি। এ দাবির অসারতা তখন প্রমাণ করবেন কীভাবে?

রুমিন ফারহানা, আপনি একজন ব্যারিস্টার। আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার মুজিবনগর সরকার নামে সমধিক পরিচিত। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুজিবনগর সরকার নীতি-নির্ধারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এই সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সকল ক্ষেত্রেই বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনা করে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় গঠন করে বেসামরিক প্রশাসনকে সংগঠিত করে। মুজিবনগর সরকারের হাত ধরেই পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার-অলবদরদের পরাজিত করে স্বাধীন বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। ১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার তাদের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করেন। নব প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মুজিবনগর সরকার এ সংবিধানের আওতায়ই পরিচালিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক দলিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এই ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ১৯৭১ সনের ২৬ মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান ও সে ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদনের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান’। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের যে সংবিধানের প্রবর্তন হয় সে সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদের বরাতে চতুর্থ তফসিলে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের একটি ক্রান্তিকালীন অস্থায়ী বিধান হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হবে। চতুর্থ তফসিলের ৩(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, “১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ হইতে এই সংবিধান-প্রবর্তনের তারিখের মধ্যে প্রণীত বা প্রণীত বলিয়া বিবেচিত সকল আইন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বা যে কোনও আইন হইতে আহরিত বা আহরিত বলিয়া বিবেচিত কর্তৃত্বের অধীন অনুরূপ মেয়াদের মধ্যে প্রযুক্ত সকল ক্ষমতা বা কৃত সকল কার্য এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং তাহা আইনানুযায়ী যথার্থভাবে প্রণীত, প্রযুক্ত ও কৃত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল।”

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলা হয়েছে। জিয়াউর রহমান তার প্রতিবাদ করেননি। বরং, আপনার দলের নেতা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে মেনে মুজিবনগর সরকারের অধীন একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। বর্তমান সংবিধানের জন্মলগ্ন থেকে সংযোজিত চতুর্থ তফসিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে অনুমোদন ও সমর্থনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনুমোদন ও সমর্থন করেছে ও বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে সংবিধানের অংশে পরিণত করেছে। তদুপরি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি এখন বাংলাদেশের সংবিধানে সংযুক্ত করা হয়েছে ও এ ঘোষণাপত্রকে সংবিধানের একটি মৌলিক কাঠামো হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দান করা হয়েছে। এর ফলে ঘোষণাপত্রটি বাংলাদেশের সংবিধানের একটি অপরিবর্তনীয় বিধানে পরিণত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’-কে বাংলাদেশের সংবিধানের ‘জেনেসিস’ বা সৃষ্টিতত্ত্ব বলা হয়েছে। আপনি যদি মুজিবনগর সরকারের সংবিধান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে স্বীকার করেন, তাহলে বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া অন্য কাউকে স্বাধীনতার ঘোষক বলার সুযোগ নেই। কারণ ঘোষণাপত্রে কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ রয়েছে। আর যদি না মানেন, তাহলে আপনার নেতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা থাকেন না। কেননা তিনি মুজিবনগর সরকারের অধীন একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। এরপরও জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলা কেবল অবৈধই নয়, এটি সংবিধানবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে অস্বীকার করা বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম সত্তাকে অস্বীকার করার শামিল।

আপনাদের ২০ দলীয় জোটের নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের চাকরিকালীন বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্রিগেড কমান্ডার মীর শওকত আলী অলি আহমদ সম্পর্কে লিখেছেন-‘He in fact was the first officer who took risk and on his own initiatives informed Gen. Ziaur Rahman regarding Declaration of Independence on night 25/26 March 71.’ যার অর্থ দাঁড়ায়, বস্তুত তিনিই প্রথম কর্মকর্তা যিনি ঝুঁকি নিয়ে নিজ উদ্যোগে একাত্তরের ২৫/২৬ মার্চ রাতে স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অবহিত করেন’। মীর শওকতের এই প্রতিবেদনটি পরবর্তী সিনিয়র অফিসার হিসেবে জিয়াউর রহমান নিজেই সত্যায়িত করেছেন। এই দলিলটি কর্নেল (অব.) অলির বই Revolution, Military Personnel and The War of Liberation in Bangladesh এ সংযোজিত আছে।

প্রকৃত সত্য হচ্ছে জিয়ার প্রথম ঘোষণায় বঙ্গবন্ধুর নাম না বলায় চট্টগ্রামের সচেতন মানুষের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। বিশেষ করে বিশিষ্ট শিল্পপতি ও রাজনীতিবিদ এ কে খান, চট্টগ্রাম বিশ্ববদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. এ.আর. মল্লিক ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য, দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠিাতা সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ এর প্রতিবাদ করেন এবং সত্তর ঘোষণা সংশোধনের আহ্বান জানান। প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানিতে জানা যায় মরহুম এ কে খান জিয়ার সংশোধনী ঘোষণার মুসাবিদা তৈরি করেন। ফলে জিয়া ২৮ মার্চ তার পূর্ববর্তী ঘোষণা পরিবর্তন করে বলেন, ‘on behalf of our great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman’. (সূত্র: এ কে খান স্মারক গ্রন্থ, হেলাল হুমায়ুন, আমার জীবনকথা ও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম, ড. এ.আর. মল্লিক, বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম: মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম, ডা. মাহফুজুর রহমান)। দ্বিতীয় ঘোষণার দ্বারা জিয়ার প্রথম ঘোষণা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে গিয়েছিল। জিয়ার প্রথম ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কারণ হলো, এ ঘোষণার দ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ সৃষ্টি হয়েছিলে।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি ব্যক্তি মুজিব বা আওয়ামী লীগ নেতা মুজিব নন, বরং জনপ্রতিনিধিদের মনোনীত নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি গৃহীত হয়েছে। ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কসোভোর স্বাধীনতা ঘোষণার ওপর আন্তর্জাতিক আদালতের উপদেশমূলক মতটি লক্ষ করলে এটি স্পষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক আদালতের দীর্ঘ অভিমতে স্বাধীনতার ঘোষকের কর্তৃত্বের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, মার্চ মাসেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অনানুষ্ঠানিক সরকার পরিচিালিত হয়ে আসছিল। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিক ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুজিব প্রদেশে সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠা করে ডি ফ্যাক্টো শাসকে পরিণত হন। মুজিব তার শাসনকে সংহত করার জন্য একের পর এক নির্দেশ (মোট সংখ্যা ৩১) জারি করেন। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনকে ডি ফ্যাক্টো প্রেসিডেন্ট ভবন হিসেবে উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার সালিক লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার জন্য মুজিব ইতিমধ্যে তাঁর সশস্ত্র সংগঠন তৈরি করে ফেলেছেন। কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানী কার্যত মুজিবের কমান্ডার-ইন-চিফ। তার প্রাইভেট বাহিনী গড়ে উঠলো আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্তদের নিয়ে। ‘আওয়ামী লীগের সামরিক প্রস্তুতির সঙ্গে যেসব সামরিক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন, তারা হলেন, ব্রিগেডিয়ার মজুমদার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাসুদুল হাসান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়াসিন, মেজর (পরে ব্রিগেডিয়ার) মুশাররফ, মেজর জলিল ও মেজর মঈন। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ও অন্যরা তাদের লেখনী ও বক্তব্যে ওসমানীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয় নিশ্চিত করেছেন। ২৫ মার্চের আগেই বঙ্গবন্ধুর ডি ফ্যাক্টো কমান্ডার-ইন-চিফ কর্নেল ওসমানী কর্তৃক প্রণীত সামরিক পরিকল্পনার বিবরণ দিতে গিয়ে ব্রিগেডিয়ার সালিক লিখেছেন, ‘তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সৈনিকদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করলেন, যেন তারা মুজিবের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বেরিয়ে আসতে পারে। সামরিক পরিকল্পনার মধ্যে ছিল।

এক. পূর্ব পাকিস্তান অবরোধের জন্য ঢাকা বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দখল করা।
দুই. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘাঁটি করে ঢাকা নগরের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ। এর দায়িত্ব ছিল ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর। সশস্ত্র ছাত্ররা তাদের সাহায্য করবে।
তিন. ইপিআর ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পরিত্যাগকারীদের দায়িত্ব ছিল ক্যান্টনমেন্ট দখলের জন্য প্রচণ্ড আঘাত হানা’। আঘাত হানার সময় সম্পর্কে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু ঢাকা রেডিওর বাংলা সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যাওয়াকে আঘাত হানার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করলে ওসমানী বলেন, আর্মি অফিসারকে ইঙ্গিত দেওয়ার এটা নিয়ম নয়। আপনি কোনও বিশেষ সংকেত দিন, যেটা ওনাকে (ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে) জানাতে হবে। তখন বঙ্গবন্ধু বললেন, আমার মেসেজ টেপরেকর্ড করে রাখব। একটা রেকর্ড ইপিআরকে দেব, আরেকটা কপি জহুর আহমেদ চৌধুরীকে দেব। সেটা পেলে তারা অ্যাকশনে যাবে।’

৭১ এর ২৭ মার্চের আগে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জিয়ার কোনও সম্পৃক্ততা ছিল না। এমনকি আওয়ামী লীগের সামরিক প্রস্তুতির সঙ্গে যেসব সামরিক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন সেখানেও জিয়ার কোনও সম্পৃক্ততা ছিল না। তাহলে জিয়াউর রহমান নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান দাবি করে স্বাধীনতা ঘোষণার কর্তৃত্ব পেলেন কোথায়? ২৭ মার্চ জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে থাকলে ২৬ মার্চ বিএনপি কেন স্বাধীনতা দিবস পালন করছে?

আন্দোলন করে এ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হলে বিএনপি সংসদে যেতো না। সংসদে যেহেতু যোগ দিয়েছেনই তাই বৈধ-অবৈধ বিতর্ক, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি এবং ব্যক্তি খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়াকে রাজনীতির একমাত্র উপজীব্য না করে সরকারের গঠণমূলক সমালোচনা করুন, পরামর্শ দিন। সরকার আপনাদের যৌক্তিক পরামর্শ গ্রহণ না করলে সরকারকে আখেরে তার মূল্য দিতে হবে। আপনাদের চোখের সামনে উদাহরণ রয়েছে। নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পিতা-মাতা-ভাইসহ পরিবারের সকলকে হারিয়ে সংসদনেত্রী শেখ হাসিনা এটিকে রাজনীতির একমাত্র উপজীব্য করেননি। মামলা করেছেন দশকের পর দশক অপেক্ষা করেছেন মামলার রায়ের জন্য। কেবল পরিবারের সদস্যদেরকেই হত্যা করা হয়নি, প্রিয় সংগঠন আওয়ামী লীগকে ছিন্ন-ভিন্ন করে ফেলা হয়। সংগঠনকে দুই ভাগ করে ফেলা হয়। বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ নিষিদ্ধ করা হয়। নেতা-কর্মীদের জেলে পুরা হয়। সব হারিয়েও শেখ হাসিনা দমে যাননি। ফিনিক্সের মতো জেগে উঠেছেন। বাংলাদেশকে নেতৃত্বে দিয়ে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্বপ্নের অগ্রযাত্রায় অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, জার্মানিসহ বিশ্বের কয়েক ডজন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের সাফল্যগাঁথার স্বীকৃতি দিয়েছে। এরা কেউই আওয়ামী লীগের সদস্য কিংবা অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন নয়।

বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে জাতিসংঘের ২০১৯ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে প্রবৃদ্ধির প্রথম সারিতে থাকবে বাংলাদেশ। গত ১৯ জুন বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির তথ্য তুলে ধরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলেছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৪৫টি দেশের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এডিবি বলেছে, ২০১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ সাত দশমিক নয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এডিবি তাদের এশীয় উন্নয়ন আউটলুকে আভাস দিয়েছে যে, বাংলাদেশ ২০১৯ ও ২০২০ অর্থবছরে আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে, যা হবে একটি নতুন রেকর্ড এবং বাংলাদেশ এশীয় প্যাসিফিক অঞ্চলে দ্রুততম প্রবৃদ্ধি অর্জন অব্যাহত রাখবে।

সংসদে উত্তেজনা ছড়ানোর পরিবর্তে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন ও প্রশিক্ষণ গ্রহণকে অগ্রাধিকার দিন। আগামীতে জনগণ আপনাদেরকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিলে যেন সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন। ২০০৬ এর অভিজ্ঞতা দিয়ে বদলে যাওয়া এ বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়া যাবে না কোনোভাবেই। সবার শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: zhossain1965@gmail.com

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ