বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখন বাস্তবতা

Send
বিনয় দত্ত
প্রকাশিত : ১৬:৫৪, জুন ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৬, জুন ২৪, ২০১৯

বিনয় দত্তউচ্চশিক্ষার জন্য আমাদের দেশে ১০৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থী অনেক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজেদের কারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কি একই মানের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের দিচ্ছে? প্রশ্নটা আমার। বা শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কি এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়নে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে? এই দুটি প্রশ্ন প্রায়ই আমাকে খোঁচা দেয়। খোঁচার মাত্রা আরো বেশি হয়েছে যখন আমি নিজে জেনেছি রাজধানীর একটি নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়তে গেলে একজন অভিভাবককে ১০-১২ লাখ টাকা গুনতে হয়। এটি শুধু একজন শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি, বাকি খরচ তো রয়েই গেলো। এই বিশাল অঙ্কের টাকা দিতে হয়, কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকার থেকে আলাদা করে ভর্তুকি দেওয়া হয় না। সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা বলে, কিন্তু স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য বা স্থায়ী ক্যাম্পাস করার জন্য সরকার থেকে সহজ শর্তে কোনও ঋণ ব্যবস্থা নেই। জমি কেনার জন্যও আলাদা কোনও ছাড় দেওয়া হয় না। তার ওপর আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভ্যাট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে।

যাই হোক, দুঃখের বিষয় হলো, বিশ্বব্যাপী যখন শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়, তখন আমাদের দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভ্যাট বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিক্ষা নিয়ে আমাদের বা রাষ্ট্রের বা প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি কী? আমরা কি শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে দেখছি, নাকি পণ্য? আমরা কি শিক্ষাতে বিনিয়োগ করছি, নাকি খরচ?

আমাদের দেশে শিক্ষার প্রক্রিয়া ও শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে অনেক প্রশ্ন এবং বিতর্ক আছে। এসব প্রশ্ন এক জায়গায় করলে আজকের লেখা আর শেষ হবে না। শুধু একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরি, বিগত বেশ কয়েক বছরে সর্বোচ্চ বিসিএস থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণির পিএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তো আছেই। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া। এই যে অগণিত প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া আমরা বন্ধ করতে পারলাম না। এই দায় কার? সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, পঞ্চম থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে যে সময় পর্যন্ত, সেই সময়ের শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন কি হয়েছে? তারা যখন কর্মক্ষেত্রে যাবে, তখন তাদের কী গতি হবে? এই ভাবনাটা যখনই আমার মাথায় আসে, তখনই আমি ভাবি কতটা অদক্ষতা থাকলে আমরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো মামুলি বিষয় বন্ধ করতে পারিনি।

আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, মেডিক্যালের যে শিক্ষার্থী প্রশ্নপত্র পেয়ে মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ কী? সে যখন পূর্ণাঙ্গ ডাক্তার হয়ে বের হবে, তখন সে কী করবে? এই দায় অবশ্যই শিক্ষার্থীর নয়, অভিভাবকের নয়। এসব দায় না চাইলেও সরকারের ওপর বর্তাবে। তার কারণ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে পারেনি বলেই শিক্ষার্থীরা প্রশ্নপত্র পেয়েছে এবং সেই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছে।

শুরু করেছিলাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিয়ে। এবার সেই প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমার কেন জানি মনে হয়, শিক্ষার মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের উদাসীনতা সবচেয়ে বেশি। তার কারণ আমাদের দেশে এখনো ১১টি ধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। আমরা এখন পর্যন্ত এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিনি। হয়তো আমাদের চেষ্টাও নেই নিয়ন্ত্রণে আনার।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির তথ্যানুসারে, আমাদের দেশে ১০৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৫টির শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে। এই ৯৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩,৫৪,৩৩৩ জন। এই বিশাল অঙ্কের শিক্ষার্থীর বিপরীতে মোট শিক্ষক আছেন ১৬,০২০ জন। মজার তথ্য হলো, ৯৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে উপাচার্য নেই ২০টিতে, সহ-উপাচার্য নেই ৭২টিতে, কোষাধ্যক্ষ নেই ৫৩টিতে। কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয় আবার বেআইনিভাবে নিজেরাই ‘ভারপ্রাপ্ত’ উপাচার্য নিযুক্ত করেছে। যার কোনো বিধান নেই।

যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নেই, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। উপাচার্যবিহীন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর পড়াশোনার মান নিয়ন্ত্রণ করছে কে? এই প্রশ্ন স্বভাবতই চলে আসে।

২.

১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত আসন না থাকার যুক্তিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯২ সালে এর অনুমোদন শুরু হয়। গত ২৭ বছরে বিভিন্ন সরকারের আমলে দেশে মোট ১০৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পায়। সারা দেশে শাখা খুলে সনদ বিক্রি করত বলে তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় সরকার ২০১৬ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেয়। একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১০৪টি।

এতগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু একদিনে হয়ে যায়নি। হয়তো প্রয়োজনের তাগিদে, শিক্ষার্থীদের চাপের কারণে বা ব্যবসায়িক কোনও উদ্দেশ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে। প্রশ্ন হলো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে যে কারণেই অনুমোদন দেওয়া হোক, এর মূল কাজ শিক্ষা দান এবং গবেষণা করা। শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কী পরিমাণ গবেষণা হয়?—এই বিষয়গুলোও তো মনিটরিং জরুরি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০১৪ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটি গবেষণা করেছিল। তখন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা ছিলেন ব্যবসায়ীরা। সমান অংশীদার ছিলেন শিক্ষাবিদরা। আর প্রায় এক-পঞ্চমাংশের উদ্যোক্তা ছিলেন রাজনীতিবিদ বা রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাদবাকিদের মধ্যে ছিলেন চিকিৎসক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বা এনজিও উদ্যোক্তারা।

যেখানে প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আছেন, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিশেষ সুযোগ বা ছাড় দেওয়া জরুরি। বলা যেতে পারে, যারা ভালো করবে তাদের বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে। এতে করে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও নিজেদের মান উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত হবে। আর যারা ভালো করছে না, তাদের শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা ইউজিসিকেই করতে হবে। যদিও ইউজিসি’র ক্ষমতা এবং সীমাবদ্ধতা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন ও পরিচালনার প্রথম আইনটি হয়েছিল ১৯৯২ সালে। সেটা বাতিল করে ২০১০ সালে নতুন আইন হয়। সেই আইনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখভালের দায়িত্ব ইউজিসি’র। তাই ইউজিসিকে তদারকি করতে হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু শুধু শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি’র ওপর নির্ভর করে, সেহেতু তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতা কীভাবে কাটানো যায়, সেসব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ট্রাস্টিবোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা উচিত। অসাধু কোনও উদ্যোক্তা যদি লাভের আশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখন বাস্তবতা। প্রচুর শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিচ্ছেন। দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদানও যোগ হচ্ছে। ৩৪তম বিসিএসে মেধা তালিকায় সবার সেরা হয়েছিলেন ওয়ালিদ। এই ওয়ালিদ কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বিসিএসের ইতিহাসে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে প্রথম হওয়ার গৌরবও এই ওয়ালিদের হাতে। এছাড়া আরও অনেকেই বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন।

৩.

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক কারা হবেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস আছে কি না, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কী কী বিষয় পড়ানো হবে, কারা পড়াবেন, উপাচার্য আছেন কি না, গবেষণার জন্য আলাদা বরাদ্দ আছে কি না, পর্যাপ্ত ল্যাব ও গ্রন্থাগার আছে কি না, টিউশন ফি শিক্ষার্থীদের আনুকূল্যে আছে কি না, এসব বিষয় তদারকি না করে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার বলে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেয়ে যায়, তাহলেও তা থেকে ভালো কিছু আশা করে যাবে না। সুতরাং শিক্ষার ক্ষেত্রে মান যেন সবচেয়ে বড় বিবেচনার বিষয় হয়।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা কোনোভাবেই অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বরং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালোমানের শিক্ষার্থী তৈরির ব্যাপারে ভূমিকা রাখছে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাওয়ার পর তা যেন সঠিক প্রক্রিয়ায় চলে, তা দেখার দায়িত্ব যাদের, তাদের আরো গুরুত্ব এবং আন্তরিকতার সঙ্গে এই কাজ করতে হবে।

আরও বড় বিষয় হলো, একটি দেশে কী পরিমাণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, তার যেমন সঠিক মানদণ্ড প্রয়োজন; প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদেও কতসংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন, তারও একটি সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। ১০৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকেরই অবস্থান রাজধানী ঢাকায়। তাহলে বাকি জেলা শহরগুলোর শিক্ষার্থীরা কী করবে? কোন জেলায় কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় হবে, তার একটি সঠিক পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন ছিল। এই ভাবনা যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি’র মাথায় নেই, তা বোঝায় যায়।

উচ্চশিক্ষা নিয়ে এসব ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরও শিক্ষার্থী বের করা সম্ভব, আন্তর্জাতিক মানের গবেষক ও গবেষণা তৈরি করা সম্ভব। এসব সম্ভাবনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার মাধ্যমেই সম্ভব।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

benoydutta.writer@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ