অপরিশোধ্য ঋণ

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৪:০৬, জুন ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৮, জুন ২৬, ২০১৯

দাউদ হায়দারডাক নাম ‘ঝরা’। পিতামাতার দেওয়া ‘আনিসা আখতার’। রশীদ হায়দারের সঙ্গে বিয়ের পরে ‘আনিসা হায়দার’।
আমাদের পরিবারে ‘ঝরা’। ছোটদের, তথা অনুজ-অনুজার সম্বোধন ‘ঝরাভাবী’। ভুলেই গিয়েছি ‘আনিসা’। পরিবারে পোশাকি নাম বেমানান, বা, অনুচ্চারিত। পরিবারে ডাকনামই আপন। বাকি বাহুল্য।
‘ঝরাভাবী’ রশীদ হায়দারের স্ত্রী, আমাদের মেজভাইয়ের স্ত্রী, এও যেন অঘরোয়া। বিয়ের আগে থেকেই তিনি পারিবারিক, ঝরা-দুলালের (রশীদ হায়দারের ডাকনাম) সম্পর্ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়াকালীন, মায়ায় জড়িয়েছেন দু’জন, জড়িয়ে, বিয়ের আগেই পারিবারিক। সম্পর্ক। কারণও নিবিড়। আনিসা আখতারের বাড়ি পাবনার সাধুপাড়ায়। রশীদ হায়দারের বাড়ি দোহারপাড়ায়। দূরত্ব আড়াই মাইলও নয়। এক অর্থে ‘পাড়াতুতো’।
আমাদের কাছে ‘ঝরাভাবী’ নন, বাড়ির বড়ো ‘কন্যা’। কারণও গভীর। রশীদ হায়দারই প্রথম আমাদের বংশে, মোহাম্মদ হাকিমউদ্দীন শেখ—রহিমা খাতুনের দ্বিতীয় ছাওয়াল, পয়লা বিবাহিত। অগ্রজ জিয়া হায়দার ব্যাচেলর (জিয়া হায়দার তখন মার্কিন দেশে, উচ্চশিক্ষার্থে)।

পাবনা থেকে ঢাকা গেলুম আমরা।—ষাট দশকের (গত শতাব্দীর) দ্বিতীয়ার্ধের কথা বলছি। ঝরাভাবী সংসারের হাল ধরেছেন। বাড়িতে মা, রশীদ হায়দারের চারজন অনুজা-অনুজ। বাড়িতে সবমিলিয়ে সাতজন। সবকিছুর দেখভালে ঝরাভাবী। পান থেকে চুন খসতে দেন না। সবকিছুতেই নিপুণ পরিপাটি। মা বলেন, ‘আমার লক্ষ্মী’। এই ‘লক্ষ্মীর’ দাপটে দিশেহারা হই। ‘শাসন করা তারেই সাজে সোহাগ করে যে’। একটু দুষ্টুমি করলেই ধমক। এও বাহ্য। ‘পড়তে বসো’। পড়ালেখা-ছাড়া আর কোনও বাক্য নেই যেন। কী পড়ছি, কতটা পড়েছি, পড়ে কতটুকু বুঝেছি, কেবল জানান দেওয়া নয়, রীতিমতন পরীক্ষাও দেওয়া। আশ্চর্য এই, পরীক্ষায় পাসফেল নেই, বরং নতুন পড়া। সব পড়া শেষও করতে দেন না। শুরু করেন গল্প। তাঁর পঠিত সাহিত্যের গল্প। বিদ্যাসাগরের ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’র গল্প। সীতার বনবাসের গল্প। রামায়ণ, মহাভারতের গল্প। পঞ্চতন্ত্রের গল্প। কাদম্বরীর গল্প। বঙ্কিমের উপন্যাসের গল্প। রবীন্দ্রনাথের গল্প, উপন্যাসের গল্প। শরৎচন্দ্রের প্রেমমাখা গল্পও। বিদেশি লেখকের গল্প উপন্যাসের কাহিনীও বাদ নেই। এত পড়েছেন কবে? বিয়ের আগেই? কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বাইরেও আরো পড়া, সব ছড়িয়ে দেন আমাদের মনমননে, উদ্দেশ্য শিক্ষিত করা, সাহিত্যে রুচি তৈরি করা। খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পড়তেন। ভালোমন্দের বিচারও ছিল খাঁটি সমালোচকের, ঠাট্টা করতুম, ‘ঘরোয়া, হেঁসেলের পণ্ডিত। কেন লেখেন না?’

উত্তর, ‘তোমাদের পাঁচভাইয়ের দাপটে লেখার জো আছে?’

—‘এতেক কহিয়া ক্ষান্ত নহে দেবী’; কার লেখা পাঠ্য-অপাঠ্য দ্বিধা নেই বলতে। ‘ধেৎ, তোমার লেখা পড়া যায় না, কী সব ফালতু লেখো। কবিতাটবিতা কিচ্ছু হয় না, পড়িও না আজকাল।’ এই ধমকেই চুপ নন, ‘কার জন্যে লিখছ?’—দারুণ প্রশ্ন। শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছেন প্রতিনিয়ত। শিক্ষিত হইনি।

‘আমরা ছাইভস্ম লিখি’, অর্থাৎ দেবরকুল, পড়তেন না আর। ‘কত পড়ব? পত্রিকার পাতা খুললেই এ-ভাই ও-ভাইয়ের লেখা।’ স্বামীর (রশীদ হায়দার) লেখা বিষয়ে কোনও মন্তব্য নেই, বলেন, ‘লেখার আগেই কাহিনী শুনেছি।’—এই যে শোনা, মামুলি নয়। শুনে, অনেক গল্পকাহিনীর ভালোমন্দ বিচারে খোলনালচেও পাল্টে দিয়েছেন। ঘরোয়া শিক্ষক, নীরব শিক্ষক, অনুচ্চ সমালোচক, অনুচ্চ পর্যবেক্ষক—সবই ঝরাভাবী। পরিবারে, পারিবারিক দোলাচলে, সাহিত্যেও।

গর্ব ছিল তাঁর, শামসুর রাহমান, রশীদ করিম, সেলিনা হোসেন থেকে আবু সাইদ জুবেরী, আহমদ বশীর প্রমুখ কবিসাহিত্যিক কে খায়নি তাঁর রান্না? খাইয়েছেন আপন আত্মীয়বোধে। সেলিনা হোসেন বলেন, ‘ঝরাভাবীর রান্না ভোলার নয়।’—তাহলে তিনি ‘রন্ধনশিল্পী’ও। কেবল সাহিত্যের বিচার বিশ্লেষণেই নয়।

ঝরাভাবীর সঙ্গে কথা বললে, বাইরের লোকের কথা, ‘খুবই সহজসরল, একান্তই ঘরোয়া, পারিবারিক।’

—এই পর্যন্ত ঠিক। কিন্তু গভীর রাজনৈতিক বোধেও ছিলেন চিন্তাশীল। তাঁর সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কথা বললে, নানা প্রশ্ন তুলে যেসব তত্ত্বকথা বলতেন, অবাক মানি, প্লেটো-অ্যারিস্টটল-মার্ক্স-এঙ্গেলস, মাও সে তুংও বলেননি। এমনকি আজকের রাজনীতিকরাও। বলতেন সমাজ দেশ মানুষ বিশ্ব নিয়েও।  এই যে বোধ, এই বোধে নিজে সুচারু, উজ্জীবিত করেছেন আমাদের, দুই কন্যা হেমা, ক্ষমাকেও। হেমা, হেমন্তী হায়দার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল ছাত্রী, ডিগ্রিধারী। সংসারী। পুত্র রাতুল, কন্যা বায়াকে নিয়ে। দ্বিতীয় কন্যা ক্ষমা, শেমন্তী হায়দার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক, গণসংযোগ বিভাগে, জানেন মায়ের বোধ বিশুদ্ধতা।

ঝরাভাবী ছিলেন ধর্মাধর্মের ঊর্ধ্বে, বলতেন, ‘আমি শুদ্ধ হলে সব শুদ্ধতাই ধার্মিক’। চমৎকার কথা। তাঁর এই বচন জীবনে কতটা পাথেয়, পদে-পদে মান্য। তাঁর কাছে এই শিক্ষা, অপরিশোধ্য ঋণ।

—কেবলই কি ঋণী? বলছিলেন, ‘যে-ভাষায় লেখো না কেন, তুমি বাংলার কবি। বাংলা ছাড়া তোমার খ্যাতি পাংশু।’

মিথ্যে বলেননি। পৃথীবীর নানা দেশে যাই, বক্তৃতা দিই, পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, ‘বাংলার, বাংলাদেশের লেখক-কবি।’

—তাঁর অর্থ, আন্তর্জাতিকতায় শামিল নই।

না হই, ঝরাভাবী গেঁথে দিয়েছেন শৈশবে কৈশোরে দেশীয় শিল্পসংস্কৃতি-গল্পগাথা। দেশীয় পুরাণ থেকে রবীন্দ্রনাথ।

—এই যে-গাথা, অপরিশোধ্য ঋণ।

ঝরাভাবী মায়ের চেয়ে কম নন। তাঁর শাসন, স্নেহ, নানাবিধ সোহাগে যে-জীবনের অধিকারী, মনে হয় আজ, চার দশকের বেশি নির্বাসিত জীবনে, তিনিই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। তাঁকে হারিয়ে একটি কবিতা লিখছি, বেদনাবিধুর কবিতা, প্রথম লাইন; ‘আমার সমস্ত বেদনার উৎসে, অপরিশোধ্য ঋণে/তুমি ছিলে সংগোপনে।’

ঝরাভাবী, আনিসা হায়দার, মারা গেছেন ১৮ জুন, সকালে (বাংলাদেশ সময়)। তাঁর মৃত্যু শোকের, শোক বাংলা শিল্পসাহিত্যেরও।

তাঁর কথা অমৃত সমান, যে শোনে সে পুণ্যবান। তিনি ছিলেন সর্বংসহা, মাতা বসুমতী। মাতার মৃত্যু নেই।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ