‘মানুষের মুখে ব্যালট পেপার’ দেখা যায় না, তাই এমন বাজেট

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:১৭, জুন ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৮, জুন ২৭, ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমানরাজনীতি আর রাজনীতিবিদ নিয়ে কবীর সুমনের একটা স্যাটায়ার গান আছে, যার শুরু এরকম—‘হেলিকপ্টার হেলিকপ্টার নেতা আসছেন, নেতা আসছেন, পাখা ঘুরছে পাখা ঘুরছে নেতা ভাসছেন, ভাসছেন’। নিশ্চয়ই অনেকেই শুনেছেন গানটা। বরাবরের মতো এবারের বাজেট দেখেও দুঃখ পেলাম, গানটার স্যাটায়ারও আমাদের ক্ষেত্রে আর প্রযোজ্য না। লেখার শেষ অংশে আবার আসবো এই গানটার প্রসঙ্গে, তার আগে আসুন বাজেট থেকে একটু ঘুরে আসি।
জীবনসঙ্গী নির্বাচনের জন্য ঘটকের কাছে যান সেসব মানুষ, যারা নিজেরাই নিজেদের জীবনসঙ্গী নির্ধারণ করতে পারেননি। এই বছরের বাজেটে ঘটকালি সেবা পেতে বাড়তি খরচ হবে। এটা জানার পর অবিবাহিত নারী-পুরুষ মন খারাপ করতেই পারেন। কিংবা কেউ ঘটকালি সেবা নিয়েও বিয়ে করতে ব্যর্থ হয়ে, কিংবা কোনও উপযুক্ত সঙ্গী পেয়ে তার সঙ্গে ভবিষ্যৎ জীবন কেমন হবে সেটা জানতে জ্যোতিষীর কাছে গেলেও অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে। এই ব্যয় বৃদ্ধি এবার তার প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে নেগেটিভ ধারণা দিতেই পারে। 

প্রতিবছর বাজেট প্রস্তাবনার পর মিডিয়াগুলো দুটো তালিকা প্রকাশ করে–দাম বাড়বে এবং দাম কমবে। আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিকরা বাজেটের খুঁটিনাটি সম্পর্কে খুব বেশি আগ্রহী নন। বাজেট সম্পর্কে তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে তাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য পণ্য বা সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের কী সুবিধা বা অসুবিধা হবে।

নাগরিকরা হয়তো অনেকেই খেয়াল করেন না বাজেট শুধু দাম বাড়া আর কমার খতিয়ান দেওয়ার বাইরে আমাদের আরও অনেক তথ্য দেয়। একটা সরকার কীভাবে, কার কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করছে এবং কোন কোন খাতে কী পরিমাণ বরাদ্দ করছে সেটা সেই সরকারের দর্শন আমাদের সামনে প্রকাশ করে। চারদিকে প্রচণ্ড উন্নয়নের প্রপাগান্ডা শুনি আমরা, কিন্তু সমাজের চারপাশে তাকালে আমরা দেখি মানুষের সীমাহীন দারিদ্র্য, দেখি ধন-বৈষম্যের চরম বৃদ্ধি, দেখি কোটি কোটি কর্মহীন মানুষ, সমাজে চলে নানারকম অস্থিরতা-অপরাধ। বাজেট পর্যালোচনা করে সরকারের যে দর্শনের কথা বলেছিলাম, সেটা খুঁজে পেলে আমরা বুঝব এই দেশে এমনটাই হওয়ার কথা ছিল।

তাই নিজেদের আদার ব্যাপারী বানিয়ে বাজেটকে ‘জাহাজ’ মনে করে তার খোঁজ রাখা থেকে বিরত থাকলে বোকামি হবে। বরং বাজেটের আগাপাশতলা দেখে বুঝতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, শোরগোল করতে হবে, নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে লড়াই করতে হবে।

বাংলাদেশের রাজস্বের প্রধান অংশের দুই-তৃতীয়াংশ আসে নানা ধরনের পরোক্ষ কর (ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, আবগারি শুল্ক) থেকে। আর প্রত্যক্ষ কর (আয়কর, করপোরেট ট্যাক্স, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) থেকে আসে বাকিটা। পরোক্ষ কর অমানবিক, কারণ এটা ধনী-দরিদ্র সবার ওপর সমান হারে কর আরোপ করে। তাই একটা মানবিক কর ব্যবস্থায় মোট রাজস্বের ৭০-৮০ শতাংশ প্রত্যক্ষ কর থেকে আসা উচিত। কিন্তু গত কয়েক বছর এই করের হার ৩৫ শতাংশ হলেও এবার এটা ৩২ শতাংশের কিছু বেশি।

পরোক্ষ করের প্রভাব নিয়ে একটা সুন্দর উদাহরণ হতে পারে চিনি। এবারও চিনির ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে এককেজি চিনির আমদানি মূল্য ২৮ টাকার মতো। আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ সবকিছু হিসাব করলে প্রতিকেজি চিনির ওপর শুল্কের পরিমাণ ২১ টাকার বেশি। একজন ভিক্ষুক কিংবা ব্যাংক লুট করে হাজার হাজার কোটি টাকা বানানো মানুষ যখন চিনি কেনে, তখন উভয়কেই এই একই পরিমাণ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এভাবেই পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা না কমিয়ে বরং আরও বাড়িয়ে সরকার মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র পর্যন্ত সবার জীবনে আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

ওদিকে প্রত্যক্ষ কর, আয়কর নির্ধারণে অত্যন্ত কম সামর্থ্যবান এমনকি দরিদ্র মানুষের ওপর আয়কর ধার্য করা হয়েছে। প্রতিবছর এই দেশে গড়ে ৬ শতাংশের মতো মূল্যস্ফীতি থাকলে গত পাঁচ বছর কীভাবে করমুক্ত আয়ের সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় স্থির থাকে? শুধু মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলেও এই সীমা অন্তত ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা হওয়া উচিত হতো। দেখা যাক, বর্তমান আয়করমুক্ত সীমা কীভাবে এমনকি দরিদ্র মানুষের ওপর কর চাপায়।

বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত হতদরিদ্র মানুষ হচ্ছে সেই মানুষ যিনি প্রতিদিন ১.৯ ডলারের নিচে জীবনযাপন করেন। একটা পরিবারে যদি পাঁচ জন সদস্য থাকেন, তাহলে সেই পরিবার দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে হলে তার মাসিক আয় হতে হবে ২৪ হাজার ২০০ টাকার বেশি। অথচ করমুক্ত সীমার ক্ষেত্রে ব্যক্তির মাসিক আয় দাঁড়ায় ২০ হাজার ৮০০ টাকা। মানে একটা পরিবারের সদস্য পাঁচ জন থাকলে এবং সেই পরিবারে যদি একজনই উপার্জনকারী থাকেন, তাহলে এমনকি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করলেও তাকে আয়কর দিতে হবে।

মজার ব্যাপার, ধনীদের আয়করের ওপর সারচার্জ (সম্পদের ওপর না) প্রযোজ্য হওয়ার নিম্নসীমা কিন্তু ২ কোটি ২৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৩ কোটিতে নেওয়া হয়েছে। যে সারচার্জ ধনীদের আয়করের ওপর প্রযোজ্য হয়েছে, সেটাও সামান্য (আয় না থাকলে সারচার্জও নেই)। তাই এই সারচার্জ ধন বৈষম্য কমাতে আদৌ কোনো প্রভাব ফেলবে না। বিখ্যাত বই ‘ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ গ্রন্থে লেখক থমাস পিকেটি বলেছেন, প্রগ্রেসিভ ওয়েলথ ট্যাক্স আরোপ করা ছাড়া বৈষম্য কমবে না কোনোভাবেই। তার এই পথ নির্দেশ দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছেন জোসেফ স্টিগলিদজ এবং পল ক্রুগম্যানের মতো নোবেল লোরিয়েটরা। তাই স্পষ্টভাবেই বলা যায়, ধনীদের ওপর প্রগ্রেসিভ ওয়েলথ ট্যাক্স আরোপ না করে আয়করের ওপর তথাকথিত সারচার্জ আরোপ করা শুধুমাত্র একটা ‘আইওয়াশ’।

কিছুক্ষণ আগেই দেখিয়েছি এই রাষ্ট্রের কর আহরিত হয় সমাজের মধ্যবিত্ত থেকে নিচের দিকে দরিদ্র মানুষদের কাছ থেকে। কিন্তু রাষ্ট্রের যে ব্যয়, এইসব সাধারণ মানুষদের প্রকৃত কল্যাণ করতো (শিক্ষা, স্বাস্থ্য,  সামাজিক নিরাপত্তা) সেই খাতগুলোতে বরাদ্দ খুবই কম। এই তিনটি খাতে বাজেটে জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ সাকুল্যে ৪ শতাংশের সামান্য বেশি। আমরা এর মধ্যেই জেনে গেছি, এসব খাতে ব্যয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এমনকি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ পাকিস্তানও এসব খাতে আমাদের চেয়ে বেশি বাজেট বরাদ্দ দেয়।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার সংবিধানে সমাজতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছে। এটা যে কত বড় ‘ফাজলামো’ সেটা বোঝা যায় ওয়েলফেয়ার খাতে এই সামান্য ব্যয় দেখে। সমাজতন্ত্র দূরে থাকুক, একটা পুঁজিবাদী কল্যাণ রাষ্ট্র (যেখানে ওয়েলফেয়ার খাতে ব্যয় জিডিপির অন্তত ২০%) তৈরির পথেও নেই আমরা, বরং এসব খাতে ক্রমাগত বরাদ্দ কমিয়ে আমরা পেছনে হাঁটছি।

একটা রাষ্ট্র কল্যাণ খাতে ব্যয় বাড়ালে কী অসাধারণ ব্যাপার ঘটতে পারে, সেটার এক দুর্দান্ত উদাহরণ নেপাল। জাতিসংঘের এলডিসি প্রোফাইলে ২০১৭ সালে নেপালের মাথাপিছু আয় দেখানো আছে ৭৪৫ ডলার, যা বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ। নেপালের মানব সম্পদ সূচকে স্কোর ৭১.২ আর বাংলাদেশের সেটা সামান্য বেশি, ৭৩.২।

এই সূচকের মধ্যকার কিছু কম্পোনেন্ট এ দুই দেশের তুলনাটা দেখি। নেপালে শিশু মৃত্যুর হার ৩৪.৫, আর আমাদের ৩৪.২। সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তির অনুপাত নেপালে ৬৯.৬, আর আমাদের দেশে ৬৩.৫। অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান আছে অপুষ্টির শিকার নাগরিকদের অনুপাতে। যেখানে বাংলাদেশে ১৫.১ শতাংশ মানুষ অপুষ্টির শিকার, সেখানে নেপালে এই হার আমাদের প্রায় অর্ধেক, ৮.১ শতাংশ।

আমাদের তুলনায় ৬০ শতাংশ মাথাপিছু আয় নিয়ে আমাদের সমান সার্বিক মানব সম্পদ সূচক অর্জন করেছে নেপাল এবং অনেক উপ-সূচকে আমাদের চেয়ে ভালোও করেছে। নেপাল এই কল্যাণ খাতগুলোতে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ব্যয় করতে পারে না, তবুও তাদের ব্যয় আনুপাতিক হারে আমাদের তুলনায় অনেক বেশি, তাই তাদের রাষ্ট্রের বৃহৎ জনগোষ্ঠী এগিয়ে যায়। আমাদের রাষ্ট্রটি এটা করে না, তাই আমাদের সাধারণ জনগণ আরও পিছিয়ে যায়।

সামান্য কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার অনুমতি, ব্যাংক লুটপাট বন্ধে কোনও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ দূরেই থাকুক বরং লুটপাটকারীদের নতুন নতুন সুবিধা দেওয়া, টাকা পাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া, শেয়ারবাজারে লুটপাটের পথ চালু রাখার মতো পদক্ষেপ লুটেরা ধনীদের আরও ধনী বানাবে। আবার চিনি, তেল, গুঁড়াদুধ, মোবাইলে কথা বলার মতো বিষয়ে শুল্ক আরোপ এবং কল্যাণ খাতে ব্যয় কমানো সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের আরও পিছিয়ে দেবে। এভাবেই এই রাষ্ট্রের সরকার সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সম্পদ আহরণ করে সেটা তুলে দেয় হাতে গোনা কিছু মানুষের হাতে। তাই বৈষম্য কমা দূরে থাকুক, বাড়তে থাকে তীব্র গতিতে।

কলামের শুরুতে লেখা গানটায় ফিরে যাই। নেতার আগমন নিয়ে নানা রকম স্যাটায়ার করে কবীর সুমন জানান, সবাই নেতাকে দেখতে এসেছে কিন্তু নেতা যা দেখছেন সেটা সুমনের ভাষায় ‘মানুষের মুখে ব্যালট পেপার নেতা দেখছেন’। ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসিতে রাজনীতিবিদদের কাছে জনগণ আদতে যে ব্যালট পেপারের বেশি কিছু নয়, সেটা নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন সুমন। আমার আফসোস লাগে, আমাদের দেশে ২০১৪ সাল থেকে এই বিদ্রূপটাও করা যায় না আর। আমাদের জনগণের মুখে আর ব্যালট পেপার দেখা যায় না; এই দেশের সরকার গঠিত হতে, ক্ষমতায় থাকতে আর ব্যালটের দরকার নেই।

সব সমালোচনার পরও বলা যায়, ‘জনগণের মুখে ব্যালট পেপার’ দেখা গেলে তবু সরকার জনগণকে কিছুটা হলেও ভয় পায়, তার সুবিধার কথা কিছুটা হলেও ভাবে। তাই জনগণের মুখে ব্যালট পেপার দেখা না গেলে এমন বাজেটই হওয়ার কথা। এমনকি অনিচ্ছায় হলেও ৯৯ শতাংশ মানুষের জন্য কিছু করার দায় এখন আর সরকারের নেই। জনগণের মুখে ব্যালট পেপার দেখা যায় না বলেই ধনীকে আরও ধনী, গরিবকে আরও গরিব বানানো হয়, জনগণের মুখে ব্যালট পেপার দেখা যায় না বলেই এই রাষ্ট্রে কোটি কোটি তরুণ বেকার থাকে, জনগণের মুখে ব্যালট পেপার দেখা যায় না বলেই এমন ‘গতানুগতিক’ বাজেট আসবে আগামী দিনেও।

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ