'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ'

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৮:০৬, জুন ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৩, জুন ২৯, ২০১৯

প্রভাষ আমিনছাত্র সংগঠনই যে কোনও রাজনৈতিক দলের মূল শক্তি। আওয়ামী লীগের আগে গঠিত হয়েছিল ছাত্রলীগ। আর এই ছাত্রলীগের শক্তিতে ভর করেই শেখ মুজিবুর রহমান পাড়ি দিয়েছিলেন মুক্তিসংগ্রামের দীর্ঘ পথ। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর প্রথম টার্গেটের একটি ছিল ঢাকা বিশ্ববদ্যিালয়ের ইকবাল হল (এখন সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। কারণ ইকবাল হল ছিল ছাত্রলীগের প্রাণকেন্দ্র। আবার স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ভাঙনটি শুরু হয়েছিল ছাত্রলীগের বিভক্তি দিয়েই। পরে যা জাসদ নামে বঙ্গবন্ধু সরকারকে তটস্থ রেখেছিল। ছাত্র সংগঠন যেমন মূল সংগঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি, তেমনি আবার ছাত্র সংগঠনই সবচেয়ে বড় দায়ও হয়ে উঠতে পারে।
গত ১০-১১ বছরে আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় থাকার বিভিন্ন সময়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে ছাত্রলীগের নানা অপকর্মের কারণে। হত্যা, ধর্ষণ, মারপিট, লুটপাট, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি—হেন কোনও অপকর্ম নেই, যা ছাত্রলীগ করেনি। একবার বিরক্ত হয়ে শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রীর পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। সম্মেলনের এক বছরেরও বেশি সময় পর ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। তারপর ক্ষোভে উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পদবঞ্চিত বিক্ষুব্ধরা একাধিকবার মূল নেতৃত্বের সমর্থকদের হামলার শিকার হয়েছেন। বিক্ষুব্ধদের দাবির মুখে পূর্ণাঙ্গ কমিটির বেশ কয়েকজনকে বাদও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পদবঞ্চিতদের কাউকে এখনও নতুন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বঞ্চিতরা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান ধর্মঘট পালন করছে। কিন্তু অবস্থানে দাবি আদায় না হওয়ায় ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতরা শুক্রবার (২৮ জুন) থেকে আমরণ অনশন শুরু করেছে। পদবঞ্চিতদের নেতা রাকিব হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমাদের প্রাণের বিনিময়ে যদি ছাত্রলীগ কলঙ্কমুক্ত হয়, তবে তাই হোক।’
বাংলাদেশের সরকার, সরকারি দল, বিরোধী দল—সবকিছুই শেখ হাসিনার একক নিয়ন্ত্রণে। সবদিকেই তার নজর। কে অসুস্থ, কে হাসপাতালে, কে বঞ্চিত, কে প্রতারিত, কে বিক্ষুব্ধ—সব শেখ হাসিনার নখদর্পণে। সবাই তার মমতার ছোঁয়া পেয়েছেন। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, কেবল ছাত্রলীগই শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নইলে বাংলাদেশে কোনও একটা বিষয় নিয়ে কেউ একমাস ধরে বিক্ষোভ করছে, অবস্থান ধর্মঘট করছে; আর প্রধানমন্ত্রী সেখানে হস্তক্ষেপ করছেন না, এটা বিরল।
ছাত্রলীগ যেমন আওয়ামী লীগের কখনও সম্পদ, কখনও দায়। ছাত্রদলও তেমনি বিএনপির। এখন বলতে হয়, ছাত্রদল বিএনপির সম্পদ ছিল। আসলেই ছাত্রদলের সম্পদ হয়ে থাকা এখন অতীতকাল। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের মূল শক্তি হলেও দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু আরো অনেকের সহায়তা পেয়েছেন। কিন্তু বিএনপির উত্থানটা একদমই ছাত্রদলকেন্দ্রিক। জিয়াউর রহমান যখন ক্যান্টনমেন্ট থেকে রাজনীতি শুরু করলেন, তার মূল টার্গেট ছিল ছাত্রসমাজ। তাদের দলে টানতে তিনি মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে হিযবুল বাহার নামে এক জাহাজে সমুদ্রবিহারে যান। সেই বিহারে অনেক মেধাবী ছাত্রের ক্যারিয়ার বদলে গেছে। কলম ছেড়ে অস্ত্র তুলে নিয়েছেন হাতে। তখন সারাদেশে স্মার্ট তরুণরা দলে দলে ছাত্রদলে ভিড় করেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও ছাত্রদলের জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং গৃহবধূ থেকে রাজনীতির মাঠে খালেদা জিয়ার উত্থান ছাত্রদলের হাত ধরেই। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রদলের অসামান্য অবদান ছিল। ছাত্রদলের নীরু-বাবলু-অভিরা ছিলেন গ্ল্যামারাস ক্যাডার। তখন বিসিএস ক্যাডারের চেয়ে রাজনৈতিক ক্যাডারদের জনপ্রিয়তা বেশি ছিল। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে সবাই ধরে নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসছে। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে বিএনপি জয়ী হয়। এই জয়ের পেছনেও ছাত্রদলের বড় অবদান ছিল। আমার ধারণা বিএনপির দুই দফায় ক্ষমতায় থাকাটাই ছাত্রদলের সর্বনাশ করেছে, এখন যেটা ছাত্রলীগের হচ্ছে। দল ক্ষমতায় থাকার সময় তারা এত আরাম করেছে আর এত অর্থ কামিয়েছে যে তারা আর মাঠে নামতে চায় না। মজা করে সবাই বলে, চর্বি জমে গেছে। ২০০৮ সালের পর থেকে বিএনপি বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার চেষ্টা করেছে। কোনোবারই সফল হয়নি। না হওয়ার কারণ, ছাত্রদল মাঠে ছিল না। চর্বি খসিয়ে মাঠে নামার মতো ফিটনেস ছিল না তাদের। আন্দোলন-সংগ্রামেই যাদের উত্থান, তারা এখন আন্দোলন ভুলে গেছে। যে খালেদা জিয়া ছাত্রদল নেতাদের কাছে মায়ের মতো, সেই খালেদা জিয়া ১৬ মাস ধরে কারাগারে আছেন, ছাত্রদলের ১৬ জন নেতাও প্রতিবাদে মাঠে নামেননি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্রদলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা রীতিমতো সেলিব্রেটি ছিলেন, সারাদেশের মানুষ তাদের চিনতো। তখনকার মতো এখনও বিএনপি ক্ষমতার বাইরে, কিন্তু ছাত্রদল নামে যে একটা সংগঠন আছে, সেটাই ভুলে যাওয়ার দশা। ছাত্রদল যে বেঁচে আছে, সেটা তারা মনে করিয়ে দিলো বিক্ষোভ করে। ‘বিক্ষোভ করে তারা প্রমাণ করল, তারাও বিক্ষোভ করতে জানে’। তবে সে বিক্ষোভ সরকারের বিরুদ্ধে নয়, দলের বিরুদ্ধে। গত ৩ জুন ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে বিপ্লবী ছাত্রদল অচল করে দেয় বিএনপির নয়াপল্টনের কার্যালয়। ছাত্রদলের বিপ্লবী নেতারা নয়াপল্টন অফিসে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন, ভাঙচুর করেছেন, ককটেল ফাটিয়েছেন। হেনস্তা করেছেন বিএনপির আবাসিক নেতা রুহুল কবির রিজভী আহমেদকেও। তাদের এই মারমুখী ভূমিকা আমাকে নস্টালজিক করে তুলেছে। মনে পড়ছে সেই আশির দশকের ছাত্রদলের কথা।
ছাত্রদলের ভেঙে দেওয়া কেন্দ্রীয় কমিটি ছিল ৭৩৪ সদস্যের। আমার আফসোস, ইশ পুরো কেন্দ্রীয় কমিটি যদি একদিন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রাজপথে নামতো। কমিটি ভেঙে দেওয়ার প্রতিবাদে তারা নয়াপল্টনে যা করছে, তা যদি সরকারের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে করতো। ছাত্রদলের বিক্ষোভটা খুব অদ্ভুত। দুই বছর মেয়াদের কমিটি পাঁচ বছর পর বাতিল করার পরও বিক্ষোভকে আবদার বলাই ভালো। ভেঙে দেওয়ার সময়ই বলা হয়েছিল, দেড় মাসের মধ্যে কাউন্সিল করে নতুন কমিটি করা হবে। সংগঠন পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের। তারা কথা রেখেছেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই আগামী ১৫ জুলাই ছাত্রদলের তারিখ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট হয়নি বিক্ষুব্ধরা। ছাত্রলীগ অনেক আগেই নেতৃত্বের বয়স বেঁধে দিয়েছে। ২৯ বছরের বড় কেউ
ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসতে পারবে না। শুরুতে অনেকে ছাত্রলীগকে কচিকাঁচার আসর বলতো। এ নিয়ে অনেক হাসাহাসি হয়েছে। কিন্তু এখন সবাই বুঝতে পেরেছে ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়মিত ছাত্রদের হাতেই থাকা উচিত। কিন্তু ছাত্রদল এটা বুঝতে পারেনি। অনেকদিন ধরেই নিয়মিত ছাত্রের বাবারা ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। দেরিতে হলেও বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বুঝেছেন ছাত্রদলের নেতাদের বয়সের একটা সীমা থাকা দরকার। বিএনপি নীতিনির্ধারকরা এখন বিএনপি এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠনের মাধ্যমে নিজেদের রাজনীতি গোছাতে চাইছেন। যাতে সামনের দিনগুলোতে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে সবকিছু শুরু করা যায়। ছাত্রদলের কমিটি ভাঙার মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়াই শুরু হয়েছে। কিন্তু শুরুতেই তাতে প্রবল বাধা ঘরের ভেতর থেকেই। বিক্ষোভ করছেন বাতিল কমিটির নেতারা। তিন বছর আগে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া কমিটি বাতিল করলে ক্ষুব্ধ হওয়ার যুক্তিটা কী? তারা কি সারাজীবন ছাত্রদল করবেন? নেতৃত্ব বদল হবে না? তার চেয়ে বড় কথা, তারা যদি সফল হতেন, তাহলেও কথা ছিল।

আগামী ১৫ জুলাই ছাত্রদলের সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পাশাপাশি ছাত্রদলের নেতৃত্বের জন্য বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তবে সেই বয়সসীমাও ৩৫ বছর। ২০০০ সাল বা তারপর এসএসসি পাস করারাই কেবল ছাত্রদলের নেতা হতে পারবেন। ছাত্রলীগের বয়সসীমা যেখানে ২৯, ছাত্রদলের সেখানে ৩৫ করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও খুশি নন বিক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতারা। বরং বয়সের এই সীমা বেঁধে দেওয়ার ঘটনা তাদের বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। তারা এখন প্রতিদিন নয়াপল্টনে ককটেল ফাটাচ্ছেন, অফিসে ভাঙচুর করছে। আসল কথা হলো, বয়সের এই সীমা মানলে বর্তমান কমিটির অনেকেই আর ছাত্রদলের নেতৃত্বে থাকতে পারবেন না। তাই তারা এই বয়সসীমা তুলে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। নইলে সম্মেলন পণ্ড করে দেওয়ারও হুমকি দিচ্ছেন। তার মানে, ৩৫ বছরের বেশি বয়সীরাও ছাত্রদলের নেতা হতে চান। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যে বয়সে দেশের সর্বেসর্বা হয়ে গিয়েছিলেন, সে বয়সে তার অনুসারীরা ছাত্রদলের নেতা হতে চান। কী আশ্চর্য।

এই লেখাটা মাথায় আসার পর থেকে শিরোনাম ঠিক করে রেখেছিলাম ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’। ছেলেবেলা থেকে মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা প্রহসন হিসেবে এই নাটকের নাম মুখস্থ। কিন্তু এই নামের অর্থ কী, জানতাম না। তবে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন না করে নিজের দলের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নামে ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ নেতারা যা করছেন, তাকে আমার কাছে প্রহসনই মনে হচ্ছে। পরে জানলাম, ‘বুড়ে শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ অর্থ যে বুড়োরা খোকা সাজতে চায়। এখন মনে হচ্ছে, ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ নেতাদের জন্যই যেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত নাটকটি লিখেছিলেন।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ