অলির কথা শুনে জামায়াতও হাসে

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৪:৫২, জুন ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৪, জুন ৩০, ২০১৯

বিভুরঞ্জন সরকারএলডিপি নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ হঠাৎ নড়েচড়ে উঠেছেন। তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছেন। নাম ‘জাতীয় মুক্তিমঞ্চ’। মনে করা হচ্ছে ড. কামাল হোসেনের উদ্যোগে নির্বাচনের আগে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পাল্টা হিসেবেই অলির এই প্ল্যাটফর্ম। ঐক্যফ্রন্টে জামায়াত নেই। মুক্তিমঞ্চে আছে। তাই এই মঞ্চকে সূচনাতেই কেউ কেউ জামায়াত পুনর্বাসন মঞ্চ বলে অভিহিত করছেন।
মূলত তিনটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম গঠন বলে অলি আহমদ নিজেই গত ২৭ জুন সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন। লক্ষ্য তিনটি হলো:
১. একাদশ জাতীয় সংসদের পুনর্নির্বাচন।
২. বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি।
৩. রাজনৈতিক দলগুলোর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা।

তিনটি লক্ষ্যের কথা বললেও অলি আহমদ এটা ভালো করেই জানেন, একাদশ জাতীয় সংসদের পুনর্নির্বাচনের দাবি আদায় এখন প্রায় অসম্ভব। বরং খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি নিয়ে দেনদরবার করলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। আদালত বেগম জিয়াকে জামিন দিলে সরকার বিরোধিতা করবে না বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন। অলি আহমদ অবশ্য মনে করেন, ‘সরকারের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের আঁতাতের কারণেই খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন সফল হচ্ছে না’। বিএনপির ‘ব্যর্থতা’কে পুঁজি করেই সামনে এগোতে চান সাবেক বিএনপি নেতা অলি আহমদ। তিনি হয়তো প্রমাণ করতে চান, সরকারের সঙ্গে তার কোনও ‘আঁতাত' নেই। তিনি খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন সফল করতে পারবেন। তিনি সফল হন, অনেকেই হয়তো সেটা চাইবে।
তবে অলি আহমদ হঠাৎ খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে তৎপর হয়ে উঠলেন কেন, এটা কি তার নির্দোষ উদ্যোগ, নাকি এর পেছনে আবার ভিন্ন কোনও রাজনীতি আছে, সে প্রশ্নও উঠছে। এমনকি বিএনপিও অলি আহমদের উদ্যোগ নিয়ে সন্দেহমুক্ত নয় বলেই মনে হয়।
অলি আহমদের দল এখনও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটে আছে। আবার জোটভুক্ত চারটি দলকে নিয়ে তিনি জাতীয় মুক্তিমঞ্চও গঠন করলেন। ২০-দল দিয়ে যেটা সম্ভব হচ্ছে না, সেটা মুক্তিমঞ্চ দিয়ে হবে, এটা বিশ্বাস করার পক্ষে কোনও মোক্ষম যুক্তি আছে কি? শোনা যাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীর উৎসাহ ও মদতে অলি আহমদ এবার মাঠে নেমেছেন। জামায়াত তার প্ল্যাটফর্মে আছে। অলি আহমদও সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। অথচ বিএনপি থাকতে অলি আহমদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জামায়াতবিরোধী বলেই পরিচিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে অলি আহমদ জামায়াতে ইসলামীকে দেশপ্রেমিক দল হিসেবে সার্টিফিকেট দিয়ে বলেছেন, ‘দেশকে তারা (জামায়াত) অনেক ভালোবাসে। তাদের মধ্যে সংশোধনী এসেছে।’ অলি আরো বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের জামায়াত আর ২০১৯ সালের জামায়াত এক নয়।’
অলি আহমদের এই সার্টিফিকেট পেয়ে জামায়াত নিশ্চয়ই খুশিতে ‘বাগবাগ’। জামায়াত এখন খারাপ সময় অতিক্রম করছে। দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। জামায়াতের নামে নির্বাচন করার অধিকার তারা হারিয়েছে। জামায়াত নিষিদ্ধের একটি মামলা বিচারাধীন আছে। যে কোনও সময় জামায়াত নিষিদ্ধ হতে পারে। আবার জামায়াতের ভেতর থেকেও নতুন নাম-পরিচয়ে রাজনীতি করার তাগিদ আছে। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের এবং জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক নিয়েও নানা টানাপড়েন চলছে। কেউ বলেন, বিএনপি বদনাম ঘোচানোর জন্য জামায়াতকে দূরে রাখতে চায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে রাখছেও। আবার কারও মতে, জামায়াতই বিএনপি থেকে দূরে থাকছে। এটা সবারই জানা, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত একটি অত্যন্ত কৌশলী রাজনৈতিক দল। যে কোনও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার সক্ষমতা একমাত্র জামায়াতেরই আছে।
তবে এটাও ঠিক, এখন সময় জামায়াতের পক্ষে নয়। জামায়াত আত্মরক্ষা এবং নতুন করে আবির্ভূত হওয়ার কৌশল খুঁজছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, জামায়াত যেভাবে বিএনপির ঘাড়ে সওয়ার হয়েছিল, ঠিক একইভাবে এখন অলি আহমদের ঘাড়ে সওয়ার হতে চাইছে। এখন বিএনপি নিজেই যেখানে সংকটে ও বিপদে আছে, সেখানে জামায়াতের বোঝা তার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। বিএনপি জামায়াতের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় কিনা, সে প্রশ্ন উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন আসে, জামায়াত কি এখন বিএনপিকে নির্ভরযোগ্য মিত্র মনে করছে? জামায়াত নতুন হিসাবের খাতা খুলতে চায়। আর তাই অলি আহমদকে সামনে রেখে তারা নতুন পরিকল্পনা আঁটছে বলে বিশ্বাস করার অনেক কারণ আছে। অলি আহমদ এবং কল্যাণ পার্টির মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের মতো দু’জন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ যদি জামায়াতকে পৃষ্ঠপোষকতা দেন, তাহলে এর চেয়ে বড় অর্জন জামায়াতের আর কী হতে পারে!
তবে জামায়াতের পক্ষে ওকালতি করে অলি আহমদ খুব রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় দিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ কমে এসেছে। একাত্তরের গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত একটি দল আর রাষ্ট্রক্ষমতার ধারেকাছে যেতে পারবে না। জামায়াত যতই কৌশলের খেলা খেলুক না কেন, তারা ফাটা বাঁশের চিপা থেকে সহজে বের হতে পারবে না।
খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের নামে অলি আহমদ জামায়াতকে আবার ঘষেমেজে জাতে তোলার চেষ্টা করে রাজনীতিতে নিজেকে দৃশ্যমান করে তুলতে পারবেন না। নানা সময়ে নানা স্ববিরোধী কথা বলে অলি আহমদ নিজেকে হাস্যকর করে তুলেছেন। মানুষ এখন প্রকৃত রাজনৈতিক নেতার অপেক্ষায় আছে, ‘রাজনৈতিক কৌতুকাভিনেতা’র জন্য কেউ অপেক্ষা করছে না।
অলি আহমদ বলেছেন, ‘জনগণ ভয় পেয়ে ঘরে ঢুকে আছে, তাদের ঘর থেকে বের করে আনতে হবে এবং সরকারকে বোঝাতে হবে—আপনারা ভুল পথে আছেন, সোজা পথে আসুন।’ যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয়, সরকার ভুল পথে আছে, তাহলেও কি এটা মানা যাবে যে জামায়াতের জন্য রাজনীতিতে জায়গা তৈরি করতে গিয়ে সঠিক পথে আছেন অলি আহমদ? তিনি বলেছেন, ‘একাত্তরের জামায়াত আর এখনকার জামায়াত এক নয়।’ বিষয়টিকে একটু বদলে কেউ যদি বলেন, ‘একাত্তরের অলি আর এখনকার অলি এক নয়।’ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য অলি আহমদ যুদ্ধ করেছেন, আর জামায়াত করেছে বিরোধিতা। সেই জামায়াতের বন্দনা যখন অলির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, তখন জামায়াত হয়তো হাসে, কিন্তু সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। মানুষ ভয়ে ঘরে ঢুকে আছে অলি আহমদদের মতো রাজনীতিবিদের প্রতি ঘৃণায়। রাজনীতি যতক্ষণ জনগণের স্বার্থের অনুকূলে না আসবে ততক্ষণ মানুষকে আর ঘর থেকে বের করা যাবে বলে মনে হয় না।

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ