ক্রিকেট স্বপ্ন

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৪:২৬, জুলাই ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৭, জুলাই ০৩, ২০১৯

আহসান কবিরক্রিকেট বাংলাদেশে এক স্বপ্নের নাম। খেলায় হেরে যাওয়াটা তাই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা! স্বপ্ন বলেই বাংলার অনেক মানুষ মনে করে খেলায় বিজয় আছে, হার বা পরাজয় বলে কিছু থাকতে পারে না! প্রেম, রাজনীতি ও যুদ্ধে শেষকথা বলে যেমন কিছু নেই, তখন খেলাতে বিজয়াকাঙ্ক্ষাটাই শেষ কথা বলে ধরে নিচ্ছে মানুষ! সেই জনপ্রিয় ইংরেজি গানের মতো—‘উইনার টেকস ইট অল’। বিজয়ীর হাত ধরে হাঁটে পৃথিবীর সব সুখ হাসি! এবারের বিশ্বকাপে নিউ জিল্যান্ডের সঙ্গে হেরে যাওয়ার পর আমাদের মুশফিকের রানআউট মিস নিয়ে কথা ওঠেছিল। গতকালও (২ জুলাই) ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটিতে রোহিত শর্মার একটি ক্যাচ মিস করেছিল তামিম ইকবাল। তাকে নিয়েও সমালোচনা চলছে। সমালোচনা হয় আমাদের ক্যাপ্টেন মাশরাফিকে নিয়েও।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন যুগ নিয়ে আসা পঞ্চপাণ্ডবকেও (পাঁচ বিখ্যাত ক্রিকেট খেলোয়াড় মাশরাফি, তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদুল্লাহ) সমালোচনায় বিদ্ধ হতে হয়। ২০১৯-এর বিশ্বকাপে মাশরাফির (নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে খেলায় পরাজয়ের পর) সমালোচনায় বলা হচ্ছে—বাংলাদেশ টিমে এখন দশজন খেলোয়াড় ও একজন ক্যাপ্টেন! কেউ কেউ বলেছেন—এমপি মাশরাফিকে না, ক্যাপ্টেন মাশরাফিকে চাই। দুই একজন অবশ্য দশ ওভার বল করতে না পারা, ৮টি ম্যাচে মাত্র একটি উইকেট পাওয়া নিয়ে সমালোচনা করেছেন।

মাশরাফি ড্যাশিং ব্যাটসম্যান না যে তার রান করা নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন উঠবে। তবে ক্রিকেট ইতিহাসে ‘ডাক’ মারার ‘সুন্দর ঐতিহ্য’ রয়েছে! ১৮৬৬ সালে ইংল্যান্ডে এক ম্যাচে প্রিন্স অব ওয়েলস (সপ্তম এডওয়ার্ড) শূন্যরানে আউট হওয়ার পর এক পত্রিকা খবরের শিরোনাম দিয়েছিল—the prince had retired to the royal pavilion on a ducks egg! সেখান থেকেই ক্রিকেটে শূন্যরান করে আউট হওয়াকে ‘ডাকমারা’ বলা হয়। সবচেয়ে বেশি ডাক মারার রেকর্ড পাকিস্তানি ক্রিকেটার শহীদ আফ্রিদির! আন্তর্জাতিক ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট মিলিয়ে ৬০ বার আফ্রিদি এই কাজ করেছেন। ঢাকা স্টেডিয়ামে এক তরুণী একবার প্ল্যাকার্ডে লিখেছিল—‘আফ্রিদি ম্যারি মি’। হয়তো সেই তরুণী না জেনেই লিখেছিল! সবচেয়ে বেশিবার ডাক মারার মতো প্লেবয় হিসেবে আফ্রিদির অবস্থান ইমরান খানের পরেই! হোটেল রুমে মেয়ে মানুষ নিয়ে ধরা পড়ার কারণে দল থেকে বাদ পড়াসহ আরও অনেক কেলেঙ্কারির নায়ক এই আফ্রিদি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আফ্রিদি যে ম্যাচে ৩৭ বলে ১০০ করেছিল, সেই ম্যাচে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে মাঠে নামার সময়ে সে তার ব্যাট খুঁজে পাচ্ছিল না। পরে বোলার ওয়াকার ইউনিসের ব্যাট ধার করে সে মাঠে নেমে ওই রেকর্ডটা করেছিল! তারপর অবশ্য অনেক ক্রিকেটার ব্যঙ্গ করে বলতো, সেদিন আফ্রিদির ব্যাট বড় ছিল, কিন্তু মাঠ অনেক ছোট ছিল!

তবে শ্রীলংকার মুত্তিয়া মুরালিধরন ও সনাৎ জয়সুরিয়াও কম যান না। ডাক মারতে মারতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। একজন ডাক মেরেছেন ৫৯ বার, অন্যজন ৩৪ বার। টেস্ট ম্যাচে কার্টলি ওয়ালশ ডাক মেরেছিলেন ৪৩ বার। তবে অস্ট্রেলিয়ার টিমের বিখ্যাত দুই ভাই ইয়ান ও গ্রেগ চ্যাপেলের গল্পটা মজার। দুই ভাইয়ের নাম সংক্ষেপে লেখা হতো এভাবে–chappell I I chappell g. ১৯৮১-৮২ সালে গ্রেগ চ্যাপেল পরপর সাতটা ম্যাচে ডাক মারলে ব্যঙ্গ করে তার নাম লেখা হতো—chappell o! এমন আরেক দুই ভাইয়ের নাম মার্ক ওয়াহ এবং স্টিভ ওয়াহ। মার্ক ওয়াহ ১৯৯২ সালে পরপর চারটা ম্যাচে ডাক মারলে টিমমেটরা তার নাম দিয়েছিল audi. কারণ audi কোম্পানির লোগোতে চার শূন্যের সমাহার রয়েছে। টিমমেটরা এও ঘোষণা দেন, পরের ম্যাচে (পাঁচ নম্বর ম্যাচে) ডাক মারলে তার নাম বদলে হবে Olympic. কারণ অলিম্পিকের লোগোতে পাঁচটা শূন্য থাকে! ভাগ্যিস পরের ম্যাচে মার্ক ওয়াহ ডাক মারেননি!

ফুটবলের মতো ক্রিকেট নিয়ে অনেক কুসংস্কারও আছে। ঢাকা স্টেডিয়ামে কোনও দল (বিশেষ করে আবাহনী ও মোহামেডান) গোল না পেলে সমর্থকরা কর্নার কিকের সময় গ্যালারিতে চিৎকার করে বলতেন—ভাই সকল ঝাড়া দিয়া বসেন। গোলের আশায় এরপর সমর্থকরা গায়ের পোশাক (বিশেষ করে লুঙ্গি) ঝাড়া দিয়ে বসতেন। বেশি রান পাওয়ার আশায় ভারতীয় ক্রিকেটার শেহবাগ জার্সিতে কোনও নম্বর রাখতেন না। একসময়কার বাংলাদেশি ক্যাপ্টেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল দোয়া পড়তে পড়তে ব্যাট করতেন। ওজু করে মাঠে নামতেন পাকিস্তানি ক্রিকেটের বড় মিঞা খ্যাত জাভেদ মিঞাদাদ। অস্ট্রেলিয়ার রিকি পন্টিং হাঁটতেন ক্রিজে টেনশন কমানোর জন্য। পাকিস্তানি ক্রিকেটার আবদুল রাজ্জাক যে ব্যাটে রান পেতেন সেই ব্যাট দিয়েই পরের ম্যাচগুলো খেলতে চাইতেন। আবদুল রাজ্জাক এমন এক খেলোয়াড় যিনি ওপেনিং পজিশন থেকে শুরু করে দশ নম্বর পজিশন পর্যন্ত প্রতিটি পজিশনেই খেলেছেন। আবদুল রাজ্জাকের মতো এমন কীর্তি (নামতে নামতে এক থেকে দশ) আরো আছে ল্যান্স ক্লুজনার, শোয়েব মালিক ও হাসান তিলকারত্নে। 

উদযাপনের বিচিত্র ভঙ্গি আছে ক্রিকেটারদের। ৫০ বা ১০০ রান করার পর একসময়ের ইউসুফ ইউহানা বুকে ক্রুশ আঁকতেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর (নাম বদলে মো. ইউসুফ হয়েছিলেন) সেঞ্চুরি করলে মাঠে সেজদা দিতেন। সেঞ্চুরি করার পর বাংলাদেশের মো. আশরাফুলও মাঠে সেজদা দিতেন। শচীন টেন্ডুলকার শূন্যে মুখ তুলে মন্ত্র পড়তেন। উইকেট পেলে পাখির মতো ওড়ার ভঙ্গি করতেন পাকিস্তানের শোয়েব আখতার। বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের বুকে বুক লাগিয়ে উদযাপনের দৃশ্যটা এখনও অনেকের চোখে লেগে আছে।

ক্রিকেট হচ্ছে গৌরবময় অনিশ্চয়তা আর পরিসংখ্যানের খেলা। ব্যঙ্গ করে যতই বলা হোক, মিথ্যা তিন প্রকার—মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা ও পরিসংখ্যান, ক্রিকেটের পরিসংখ্যানে কখনও ভুল হয় না। যতোই নারী কেলেংকারি থাকুক ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং দৈত্য ক্রিস গেইলের, টেস্টের প্রথম বলে ছয় মারার রেকর্ড এখনও তার আছে! যতোই অলস রানার হিসেবে বদনাম থাকুক, দারুণ ব্যাটসম্যান পাকিস্তানের ইনজামামুল হক। তার বোলিং এবং প্রথম বলে উইকেট পাওয়ারও রেকর্ড আছে। রেকর্ড আছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভিভ রিচার্ডের ক্রিকেট এবং ফুটবল খেলার।রেকর্ড আছে একসময়ের কেনিয়ার ক্রিকেট ক্যাপ্টেন আসিফ করিমের ক্রিকেট এবং ডেভিস কাপে টেনিস খেলার! দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাপ্টেন গ্রায়েম স্মিথের একশ’র বেশি টেস্ট ম্যাচে অধিনায়কত্ব করার রেকর্ড আছে, রেকর্ড আছে সৌরভ গাঙ্গুলির পরপর চার ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার। রেকর্ড আছে ইন্ডিয়ান ফিল্মের নায়ক সাইফ আলী খানের দাদা ইফতেখার আলী খান পতৌদির দুটো দেশের হয়ে খেলার! ইফতেখার আলী খান পতৌদি ইংল্যান্ড এবং ইন্ডিয়া দুই দেশের হয়েই ক্রিকেট খেলেছেন। আবার ক্রিকেটে টিভি রিপ্লে ও থার্ড অ্যাম্পায়ার প্রথা চালু হওয়ার পর প্রথম যিনি আউট হয়েছিলেন, তার নাম শচীন টেন্ডুলকার। প্রথম আউটের রেকর্ড টেন্ডুলকারের, আর তাকে আউট করেছিলেন জন্টি রোডস। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পরের ইনিংসে জন্টি রোডসকে আউট করেছিলেন টেন্ডুলকারই! একমাত্র ভারত ৬০ ওভার, ৫০ ওভার ও ২০ ওভারের ক্রিকেটে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে!

আলোর ঝলকানি, আভিজাত্য আর ভদ্রতার মোড়কে জড়ানো ক্রিকেটের অন্ধকার দিকও আছে। বাণিজ্য এবং করপোরেটশিপ এখন নিয়ন্ত্রণ করে ক্রিকেটকে। তাই ক্রিকেট নিয়ে বাজি আর ক্রিকেটারদের সঙ্গে নারী সংযোগ জন্ম দেয় গসিপ কিংবা রসালো আলোচনার। ভারতের ক্রিকেট ক্যাপ্টেন মনসুর আলী খান যখন বলিউড নায়িকা শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে প্রেম এবং বিয়েতে জড়ান, তখন যেমন আলোচনার জন্ম দেয়, তেমন আলোচনার জন্ম দেয় ইমরান খানের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও। শেনওয়ার্ন, ক্রিস গেইলরা যখন নারী কেলেংকারি করে পত্রিকার শিরোনাম হন, তখন অনেকের মনে পড়ে সঙ্গীতা বিজলানীর সঙ্গে সাবেক ইন্ডিয়ান ক্রিকেট ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আজাহারউদ্দীনের প্রেম। তাদের ঘর ভাঙাও তেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ইন্ডিয়ার বর্তমান ক্রিকেট ক্যাপ্টেন বিরাট কোহলি আর অভিনেত্রী আনুশকা শর্মার প্রেম ও বিয়ে যেমন আলোচনায় আসে, তেমনি আসে এদেশের রুবেল হ্যাপি কিংবা আশরাফুল ও এক বিতর্কিত অভিনেত্রীর প্রেমের খবর। বাজিকরদের সঙ্গে মিশে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য পাকিস্তানি ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরামকে যেমন সাড়ে তিন লাখ রুপি জরিমানা দিতে হয়, নিষিদ্ধ হন পাকিস্তানের সেলিম মালিক, সাময়িক নিষিদ্ধ হতে হয় পাকিস্তানের আসিফ বা আমিরকে। তেমনি ভারতের মো. আজাহারউদ্দীন আর অজয় জাদেজাকেও এসবের মুখোমুখি হয়ে ক্যারিয়ারে ইতি টানতে হয়। বাংলাদেশের একসময়ের ‘আশার ফুল’ আশরাফুলকেও ক্যারিয়ারের ইতি টানতে হয়েছে, নিষিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি কয়েক বছরের জন্য। তবে ম্যাচ ফিক্সিং, বাজি আর ক্রিকেট ‘দুই নম্বরি’তে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের কোনও তুলনা নেই। দুই নম্বরিতে তারা অতুলনীয়! তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটার লেসলি হিল্টন জড়িয়ে পড়েছিলেন খুনের সঙ্গে। খুনের ঘটনায় তার ফাঁসি হয়। আর দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ক্যাপ্টেন হ্যানসি ক্রনিয়ের ম্যাচ ফিক্সিং ও বাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়াতে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন–এও সম্ভব? ক্রনিয়ের বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুটাও এখনো রহস্য হয়ে আছে।

তারপরও ক্রিকেট স্বপ্নের নাম। বিজয়ের আনন্দে সবাই আকাশ ছুঁতে চায়। ১৯৬০ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এক টেস্টে ভারতের আব্বাস আলী বেগ যখন পঞ্চাশ রান পূর্ণ করে সাজঘরে ফিরতে থাকেন, তখন এক নারী এসে তাকে পরম মমতায় চুমু খেয়েছিল। ২০১৯-এর ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফল যেমনই হোক, আমাদের বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের কপালে আমরা ভালোবাসার চুমু এঁকে দিতে চাই! এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আমরা তিনটি ম্যাচে জিতেছি। বিশ্বকাপের শেষ সময়ে এসে অনেক হিসাব-নিকাশ হয়েছে। ২ জুলাই ভারতের সঙ্গে হেরে গিয়ে আমাদের সেমিফাইনালের স্বপ্ন শেষ। পরের খেলা পাকিস্তানের সঙ্গে। এবারের বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচটিতে যেন জয় এনে দিতে পারে- সেই স্বপ্ন  নিয়েই অপেক্ষা করছি। তবুও আমরা বলে যাবো—‘তারা জিতলে আমাদের, হারলেও আমাদের’। আমাদের গর্ব, অহংকার আর ক্রিকেট ঐক্যের প্রতীক তারাই।

যেন মনে রাখি সেই গীতিকবিতা—

সোনার ছেলেরা লড়বে যখন তাদের সাহসে রেখো

সোনার ছেলেরা খেলবে যখন তাদের তালিতে রেখো

আমার পক্ষে না থাক বন্ধু দেশের পক্ষে থেকো!

লেখক: রম্যলেখক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ