অবশেষে সুন্দরবন জয়

সালেক উদ্দিন
০৫ জুলাই ২০১৯, ১৭:০৭ আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৯, ১৪:১৮

সালেক উদ্দিন আমাদের অহংকার সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা থেকে বাদ পড়ছে এবং বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হচ্ছে—এমন একটি আশঙ্কায় ক’দিন ধরেই ভুগছিলাম। এর কারণ ছিল আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৩তম অধিবেশন। অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে আমাদের সুন্দরবনসহ ৬টি বিশ্ব ঐতিহ্যকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। মূলত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ বন্ধ করা, সুন্দরবনের চারপাশের শিল্প কারখানা অনুমোদন ও কার্যক্রম বন্ধ করার বিষয়টি উল্লেখ করে কমিটি বলেছিল, বাংলাদেশ সরকার সুন্দরবন রক্ষায় যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়নি। এর ফলে এই ঐতিহ্য অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির যুক্তি যৌক্তিক না অযৌক্তিক সে বিষয়ে পরে আসছি। তার আগে সুন্দরবন নিয়ে যে দু-চারটা কথা না বললেই নয় তা হলো,পৃথিবীর সর্ববৃহৎ তিনটি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের একটি হলো সুন্দরবন। প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলির অন্যতম সুন্দরবন গঙ্গা মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা এবং ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলাজুড়ে বিস্তৃত। দশ হাজার বর্গ কিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ছয় হাজার বর্গ কিলোমিটারের বেশি রয়েছে বাংলাদেশে এবং বাকি অংশ ভারতের মধ্যে। সুন্দরবনকে জালের মতো জড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক স্রোতধারা, কাদাচর এবং ক্ষুদ্রায়তন দ্বীপমালা। এই বনভূমি পৃথিবী খ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল। এছাড়াও বিরল প্রজাতির ডলফিন, কচ্ছপ, চিত্রা হরিণ, পাখিসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্রও এই বনাঞ্চল। এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ, মহিষ, জাভা গন্ডার, ভারতীয় গন্ডার ও সাধু পানির কুমির। ২০০৪ সালের হিসাব মতে, সুন্দরবন ৫০০ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল, যা পৃথিবীতে বাঘের একক বৃহত্তম অংশ। এখানে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার চিত্রা হরিণ রয়েছে।

সুন্দরী গাছের অরণ্যভূমি সুন্দরবন সুন্দরী গাছের নামানুসারেই নামকরণ হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। তবে সুন্দরী গাছের পাশাপাশি সেখানে গেওয়া, গরান ও কেওড়া গাছের সমাহারও কম নয়। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত হিসাব মতে, সর্বমোট ২৪৫টি শ্রেণি এবং ৩৩৪টি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে সেখানে। গঙ্গা থেকে আসা নদীর মিঠা পানির এবং বঙ্গোপসাগরের নোনা পানির মিলনের মধ্যবর্তী স্থান হওয়ার কারণে সুন্দরবনের নদীগুলো নোনা পানি ও মিঠা পানি মিলন স্থান।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্মান দেয় ইউনেস্কো। তাতে শর্ত ছিল এই বনের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয় এমন কোনও তৎপরতা চালানো যাবে না। শর্ত লঙ্ঘনের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হলে তার বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্মান চলে যাবে।

আমাদের গর্বের সুন্দরবনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। মুঘল আমলে স্থানীয় এক রাজা সুন্দরবনের ইজারা নেন। ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরের কাছ থেকে স্বত্বাধিকার পাওয়ার পরপরই সুন্দরবন এলাকার মানচিত্র তৈরি করা হয়। ১৮২৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সুন্দরবনের স্বত্বাধিকার অর্জন করে। ১৮৭৮ সালে সমগ্র সুন্দরবন এলাকাকে সংরক্ষিত বন হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় সুন্দরবনের ৬০১৭ বর্গ কিলোমিটার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের অংশে পড়ে।

এবার আসা যাক বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ প্রসঙ্গে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি বলেছে, বাংলাদেশ সরকার গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ইউনেস্কোর কাছে সুন্দরবন রক্ষায় নেওয়া উদ্যোগগুলো চিহ্নিত করে একটি প্রতিবেদন দেয়। তাতে বলা হয়, সুন্দরবনের চারপাশে কোনও শিল্প কারখানা অনুমোদন দেওয়া হয়নি। সরকারের প্রতিবেদন সম্পর্কে কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়, বাংলাদেশ বলেছিল কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষার আগে সুন্দরবনের পাশে কোনও শিল্প-কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেবে না।
এর আগে ইউনেস্কো বাংলাদেশকে এই মর্মে শর্ত করে দিয়েছিল যে বাংলাদেশ যদি সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্মান ধরে রাখতে চায় তাহলে তিনটি উদ্যোগ নিতে হবে।

১. রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প সুন্দরবন থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে।

২. ভারতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সুন্দরবনের মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে।

৩. সুন্দরবন ঘিরে বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ যেসব শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে সে সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করতে হবে।

ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত বাংলাদেশের সুন্দরবন থেকে অদূরে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বড় ধরনের হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বলা হয়েছে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ বিশ্ব ঐতিহ্যের জন্য চারটি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
১. কয়লার ছাইয়ের কারণে বায়ুদূষণ।

২. বর্জ্য হিসেবে অবমুক্ত ছাই ও পানি থেকে দূষণ।


৩. ড্রেজিং ও জাহাজ চলাচল বৃদ্ধিজনিত হুমকি।

৪. শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং এ সংক্রান্ত অবকাঠামো তৈরির কারণে সৃষ্ট সমন্বিত নেতিবাচক প্রভাব।

ইউনেস্কোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ বন্ধ করেনি এবং বারবারই বলে এসেছে এটি সুন্দরবন থেকে নিরাপদ দূরে আছে। এরপরও ইউনেস্কো রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যাপারে আপত্তি তোলে। ইউনেস্কো যেমন অবস্থান পরিবর্তন করেনি তেমনি বাংলাদেশের সরকারও তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি। এর একটিই কারণ হতে পারে, বাংলাদেশের সরকার দেশপ্রেম কূটনৈতিক দক্ষতার সম্পর্কে আস্থাশীল ও নিশ্চিত ছিল।

সবশেষে আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৩তম সভায় এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হলো। প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল এই শুনানিতে আমাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। সভায় বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে সুন্দরবনের ক্ষতির ব্যাপারে ইউনেস্কোর যুক্তি ও তথ্যে বেশ কিছু ত্রুটি ছিল। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী বলতেই পারি, ২১ সদস্যবিশিষ্ট বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটিতে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার পর সর্বসম্মতভাবে সুন্দরবনকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এর আগে কিউবা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং চীন সুন্দরবনকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করার নতুন সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করে এবং আলোচনাকালে আজারবাইজান, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত, তিউনিসিয়া, তানজানিয়া, বুর্কিনাফাসো, উগান্ডা, জিম্বাবুয়ে ও পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সরাসরি এ সিদ্ধান্তের পক্ষে বক্তব্য প্রদান করে। এতে সুন্দরবন সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রশংসিত হয়। তারা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও পরিবেশ রক্ষায় পদক্ষেপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনকে স্বাগত জানান। সব মিলিয়ে সুন্দরবনকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে বাদ দেয় ইউনেস্কো।
আমাদের অহংকার আমাদের গর্বের সুন্দরবনের বিপন্নতা নিয়ে সত্যিকার অর্থেই চিন্তিত ছিলাম। বিশেষ করে আমাদের বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী যেভাবে বিষয়টিকে হাইলাইট করছিল তাতে অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে অন্যদের মতো আমারও চিন্তিত হওয়ারই কথা। আশার কথা এই যে, তাদের কথা সত্য প্রমাণিত হয়নি। বাকুতে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৩তম অধিবেশনে সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় তার অবস্থান অটুট রেখেছে।

তবে অধিবেশনে কমিটির নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বছর বাংলাদেশ সরকার বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানাবে এবং আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে হালনাগাদ তথ্য-সংবলিত প্রতিবেদন জমা দেবে।

বাংলাদেশের সরকার সুন্দরবন রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিক। আমাদের গর্ব আমাদের অহংকার সুন্দরবনের অবস্থান বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অটুট থাকুক—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।


লেখক: কথাসাহিত্যিক

 

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের পদ থেকে সরানো হলো আশরাফুলকে
জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের পদ থেকে সরানো হলো আশরাফুলকে
শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে মিললো ৮৮ লাখ টাকা, বিদেশি মুদ্রা কত পেলো?
শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে মিললো ৮৮ লাখ টাকা, বিদেশি মুদ্রা কত পেলো?
সীমান্তে ধান কাটতে বাধা, বিএসএফকে লাঠিসোঁটা নিয়ে গ্রামবাসীর ধাওয়া
সীমান্তে ধান কাটতে বাধা, বিএসএফকে লাঠিসোঁটা নিয়ে গ্রামবাসীর ধাওয়া
টঙ্গীতে মাদ্রাসায় শিশুকে যৌন নির্যাতনের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ
টঙ্গীতে মাদ্রাসায় শিশুকে যৌন নির্যাতনের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ
সর্বশেষ সর্বাধিক