স্বৈরাচারের চিরবিদায়

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৬:১৩, জুলাই ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৭, জুলাই ১৪, ২০১৯

প্রভাষ আমিনএরশাদকে আমি যতটা ঘৃণা করতাম, তাতে তার মৃত্যুতে আমার উল্লসিত হওয়ার কথা। কিন্তু সকালে খবরটা শোনার পর উল্লাস হচ্ছে না, বরং মন কিছুটা খারাপই হলো। একধরনের শূন্যতাই বরং ঘিরে থাকলো। শূন্যতার কারণ খুঁজতে গিয়ে বুঝলাম, এরশাদ আসলে আমার জীবনের বড় একটা অংশ জুড়ে ছিলেন। এখন আর নেই। তাই শূন্যতা। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ যখন জোর করে ক্ষমতা দখল করেন, তখন আমি স্কুলছাত্র। আর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণআন্দোলনের মুখে এরশাদের পতনের সময় আমি বিশ্ববিদ্যালের ছাত্র, পাশাপাশি সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করছি। মাঝের এই ৯ বছরের একটা বড় সময় আমি কাটিয়েছি রাজপথে, স্বৈরাচার এরশাদের পতনের আন্দোলনে। এই সময়টাকেই মনে করি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। যৌবনে আমি এরশাদের অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখলের প্রতিবাদ করতে পেরেছিলাম বলে আমি সন্তুষ্ট। পরে ক্ষমতার স্বার্থে এরশাদের সঙ্গে বিভিন্ন দলের আপসের খবরে কখনও কখনও মনে হয়েছে—এরশাদবিরোধী আন্দোলন করে ভুল করিনি তো! কিন্তু নিজেই নিজের প্রশ্নের জবাব দিয়েছি, ভুল করিনি। তখন যদি আমি স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে মাঠে না থাকতাম, তাহলে আজ নিজেই নিজেকে ঘৃণা করতাম।

রাজনীতিবিদরা নিজেদের স্বার্থে এরশাদকে কাছে টেনেছেন, তাতে কিন্তু আমাদের যৌবনের আন্দোলন-অর্জন বিফলে যায়নি। বরং আমরা সৌভাগ্যবান,আমাদের যৌবনে আমরা এমন একটি আন্দোলন করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সময় আসলে সবচেয়ে বড় উপশমকারী। আজ ২৯ বছর পর পেছনের দিকে তাকালে মনে হয়, এরশাদ আসলে একজন ব্যক্তি, তিনি একটি সিস্টেমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন মাত্র। ব্যক্তি এরশাদের প্রতি ক্ষোভের তীব্রতা এখন আর নেই। এরশাদের প্রতি এখন আর ঘৃণা নয়, করুণা আছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যাওয়ার সময় ভারতকে ভাগ করে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দুটি রাষ্ট্র গড়ে দিয়ে যায়। একদিন আগে গড়া রাষ্ট্র দুটির একটি ভারত পরিচিত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে। আর পাকিস্তান বরাবরই সেনাশাসিত, কখনও প্রত্যক্ষ, কখনও পরোক্ষভাবে। ২৩ বছরের সংগ্রাম শেষে একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা পায় বাংলাদেশ। পাকিস্তান থেকে ভৌগোলিকভাবে আলাদা হলেও কারও কারও অন্তরে পাকিস্তান রয়ে গিয়েছিল, এখনও আছে। পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশও স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সেনাশাসনের খপ্পরে পড়ে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা ঘটনাপ্রবাহে ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান। শুধু শাসনে নয়, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানাভাবেই বাংলাদেশকে পাকিস্তানিকরণের চেষ্টা হয়। স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতার কাছাকাছি চলে আসেন। রাজাকার শাহ আজিজ হয়ে যান প্রধানমন্ত্রী।

জিয়া যে প্রক্রিয়ায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে রাজনীতিতে এসেছেন, ঠিক একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন এরশাদ। ১৯/১৮ দফা দিয়ে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা, প্রথমে একটি জোট করা, তারপর দল করা এবং বিভিন্ন দল থেকে নেতা ভাগিয়ে এনে নিজের দল গোছানো। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো, জিয়াউর রহমানকে তার অনুসারীরা ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের’ প্রবক্তা হিসেবে দাবি করেন, আর এরশাদের পরিচয় স্বৈরাচার।

এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতির অনেক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করেছেন। সবসময় সব আমলে স্বৈরাচাররা ক্ষমতায় এসে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে ধর্মকে পুঁজি করে। জিয়াউর রহমান ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্ত করেছিলেন। এরশাদ আরেক ডিগ্রি বেশি, তিনি সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ‘ইসলাম’কে যুক্ত করেন। ধর্মের ভিত্তিতে গড়া পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে। কিন্তু জিয়া-এরশাদ রাষ্ট্রের সেই মৌলিক কাঠামোয় আঘাত করেছিলেন। যে খপ্পর থেকে এখনও বেরোতে পারেনি বাংলাদেশ।

অনেকেই আজ ব্যক্তি এরশাদকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তবে আপনি বা আমি ক্ষমা করা না করায় কিছু যায়-আসে না। ইতিহাসে তার অবস্থান নির্ধারিত। এরশাদের বিদায়ের দিনে আজ আমার মনে পড়ছে, নূর হোসেন, মিলন, সেলিম, দেলোয়ার, ময়েজউদ্দিন, জেহাদ, কাঞ্চন, দীপালি সাহাসহ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহিদদের। নয় বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অনেক যুক্তি ছিল। কিন্তু স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আসলে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, ছিল একটি সিস্টেমের বিরুদ্ধে। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ব্যক্তি এরশাদের বিদায় ঘটেছিল, রবিবার ঘটলো চিরবিদায়। তার এই বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন স্বৈরাচারী সিস্টেমেরও চিরবিদায় ঘটে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ