বিশ্ববেহায়া!

Send
ওমর শেহাব
প্রকাশিত : ১৬:৩০, জুলাই ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩১, জুলাই ১৬, ২০১৯

ওমর শেহাবগত রবিবার ঘুম থেকে উঠে জানতে পারলাম স্বৈরাচার এরশাদের মৃত্যু হয়েছে। হঠাৎ করে ১৯৯০ সালের এক দিনের কথা মনে পড়ে গেলো। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। আমার সমবয়সী মামাতো ভাই থাকার কারণে মাঝে মধ্যেই তাদের বাসায় বেড়াতে যেতাম, রাতে থাকতাম। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ সকালে আমার ঘুম ভাঙলো অনেক মানুষের কোলাহলে। বাসার মানুষের কথাবার্তা থেকে অনুমান করলাম খুব বড় একটা কিছু হতে যাচ্ছে। তারপর যখন বয়সে আমার চেয়ে একটু বড় ভাইরা বের হলেন, সাহস করে আমি তাদের পিছু নিলাম। গেটে গিয়ে দেখে মনে হলো পৃথিবীর সব মানুষ আমার চট্টগ্রাম শহরের সেই ছোট্ট রাস্তার বুকে নেমে এসেছেন। সবাই স্লোগান দিচ্ছেন, আর কারো কারো হাতে এরশাদের ছবি। ছবির ওপর ঝুলছে জুতার মালা। বিটিভিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার ছবি দেখে আমি ইতোমধ্যে জানি, তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট। তার ছবির ওপর ঝাড়ু আর জুতা দেখে বুঝলাম, তিনি খুব খারাপ মানুষ। কিন্তু তখনও জানতাম না, তিনি স্বৈরাচার আর বিশ্ববেহায়া!
তারপর বড় হতে হতে নব্বই পরবর্তী গণতন্ত্রের প্রথম দিনগুলো আরেকটু ভালো করে বোঝা শুরু করলাম। তখন দুটি সাময়িকী বের হতো। খুব সম্ভবত নামগুলো ছিল সুগন্ধা ও আজকের সূর্যোদয়। কোনও এক পত্রিকায় গেদু চাচা ছদ্মনামে কেউ একজন লিখতেনও। যাই হোক, এসব পত্রিকায় ততদিনে পতিত এরশাদের নোংরামির রগরগে বর্ণনা পড়ার কথা মনে আছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় উত্তরাধিকার সামরিক বাহিনীর এই দুর্বৃত্ত সদস্য ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করে দেন। সহজ-সরল পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, আমাদের সংবিধানে তো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা বলা আছে। শুধু জনপ্রতিনিধিরা দেশ চালনা করতে পারবেন। সেখানে তো প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের কোনও কথা বলা নেই। তাহলে এরশাদ দেশের শাসনকর্তা হলেন কোন অধিকারে? হিসাব সহজ। এরশাদ ঘোষণা করলেন সংবিধান নাকি স্থগিত আর সংসদ নাকি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এত কিছু করার ক্ষমতা তিনি পেলেন কী করে? এরশাদের এই ক্ষমতার উৎস ছিল বন্দুকের নল। পাড়ার খারাপ ছেলেপেলেরা যখন অস্ত্র হাতে গুণ্ডামি করে, তখন আমরা তাদের সন্ত্রাসী বলি। কিন্তু সামরিক বাহিনীর কোনও কর্মকর্তা যখন আমাদের ট্যাক্সের টাকায় কেনা অস্ত্র হাতে গুণ্ডামি করে, তখন তাদের বলা হয় প্রধান সামরিক আইন কর্মকর্তা।

এই জায়গায় এসে আমি পাঠককে ঠান্ডা মাথায় একটু চিন্তা করতে বলি। সংবিধান স্থগিত করা হয়েছে—এই সংবিধান কারা এনেছেন, কীভাবে এনেছেন? এই সংবিধান এসেছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন এই সংবিধানের জন্য। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন এই সংসদের জন্য। তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পরিবার থেকে দূরে থেকেছেন এই সংবিধান আর সংসদের জন্য। আমাদের জাতীয় চার নেতাকে মেরে ফেলা হয়েছিল এই সংবিধান আর সংসদের জন্য। এরশাদ এই সংবিধান আর সংসদ স্থগিত করে আমাদের ইতিহাস আর শহীদদের সঙ্গে বেঈমানি করেছেন। সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা সংবিধান স্থগিত করার শপথ নেন না, তারা শপথ নেন সংবিধান সমুন্নত রাখতে দরকার হলে জীবন দেওয়ার। এরশাদ শুধু দেশের সঙ্গে বেঈমানি করেননি, তিনি সামরিক বাহিনীর আদর্শের সঙ্গেও বেঈমানি করেছেন।

এখনকার আওয়ামী লীগ দিয়ে যাদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে পরিচয়, তারা হয়তো বললে বিশ্বাস করবেন না—একসময় আমাদের একটি চমৎকার উদার গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর প্রথম যেই সংবিধান ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের কালিতে লেখা হয়, তার চারটি মূলনীতির একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতা ব্যাপারটি কী? এর মানে হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় বা রাজনীতিতে একর্ধমের শ্রেষ্ঠত্বভিত্তিক কোনও সংকীর্ণ আদর্শের জায়গা থাকবে না। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সব ধর্মের আর নিধার্মিক মানুষেরা সবাই সমান হবে। মানুষকে মাপা হবে দেশের প্রতি তার ভালোবাসা আর ত্যাগ দিয়ে, কে কোন ধর্মে বিশ্বাস করে, সেটি দিয়ে নয়। আমাদের সংবিধান লিখেছিলেন রাজনীতিবিদরা, যাদের শিকড় এই দেশের মাটি আর মানুষের মধ্যে গাড়া। চোরের মতো রাতের অন্ধকারে উড়ে এসে জুড়ে বসা এরশাদের তো আর সেই উপায় নেই। যার এক ডাকে মানুষ মিছিল করে আসা তো দূরের কথা, একটা কাকও ‘কা’ করবে না, তিনি তাহলে রাজনীতিতে কী করে ঢুকবেন? এরশাদ ঠিক করলেন তিনি সাম্প্রদায়িকতার পেছনের দরজা দিয়ে রাজনীতিতে ঢুকবেন। দেশের নব্বই শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্ম পালন করলেও তারা যথেষ্ট মুসলিম হচ্ছিলেন না, তাই এরশাদ ১৯৮৪ সালের এপ্রিলের এক তারিখে শুক্রবারকে ছুটির দিন ঘোষণা করলেন। এরপরও দেশের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ইমান এরশাদের চোখে যথেষ্ট পাকা মনে হচ্ছিল না। তাই ১৯৮৮ সালের ৫ জুন ইসলাম ধর্মকে দেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, দেশ তো নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না, হজে যায় না, পূজাও দেয় না। দেশের আবার তাহলে ধর্ম কী?  আসলে দেশের কোনও ধর্ম নেই। যেকোনও দেশের দুর্বৃত্তপরায়ণ রাজনীতিবিদরা সবসময় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে যারা দুর্বৃত্ত, তাদের হাতে রাখতে পছন্দ করেন। এরশাদ তার কাজকর্মের মধ্য দিয়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যারা ধর্মান্ধ আর সাম্প্রদায়িক, তাদের কাছে টানার চেষ্টা করলেন। আর সংখ্যালঘু মানুষরা এই বার্তা পেলেন, তারা আসলে নিজদেশে উদ্বাস্তু, অনাকাঙ্ক্ষিত। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, এরশাদ যে রাজনীতিবিদ হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, তাতে নিরীহ সংখ্যালঘু মানুষকে অপমান করলে তো তার সমর্থন কমে যাবে। এর উত্তর হলো, যার রাজনীতিতে আশা বন্দুকের নলের সাহায্যে, ভোটের দিন তার ভোট আপনিই পড়ে, কারো সমর্থন লাগে না। আমাদের সমাজে সাম্প্রদায়িকতার যে উত্থান, সেটির শুরু প্রথম স্বৈরাচার জেনারেল জিয়ার মাধ্যমে হতে পারে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এরশাদ। যাদের ইতিহাসের চেয়ে বর্তমানে আগ্রহ বেশি, তারা পাশের দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কীভাবে ধর্মান্ধ হিন্দুদের উজ্জীবিত করে, সেটি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

প্রতিবছর ভালোবাসা দিবস এলে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। কারণ এটি হলো ঢাকার রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের এক উত্তাল মুহূর্তে জাফর, জয়নাল, দীপালী সাহা, আইয়ুব, ফারুক, কাঞ্চনসহ অনেক শহীদের আত্মাহুতির বর্ষপূর্তি। লেখক সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেলগীর সচলায়তন ব্লগে পরম ভালোবাসায় সেই দিনটির ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। সেখান থেকে জানা যায়, এর শুরুটা হয়েছিল ১৯৮২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। দেশ তখনও সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট। কেউ এরশাদের সমালোচনা করলেই সাত বছর কারাদণ্ড। এরশাদের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান নতুন শিক্ষানীতি প্রস্তাব করলেন।  প্রথম শ্রেণি থেকে আরবি বাধ্যতামূলক করা হলো। উচ্চশিক্ষা অর্জনের শর্ত ঠিক করা—হয় মেধা, নয়তো ব্যয় নির্বাহ করার ক্ষমতা। সারাদেশের শিক্ষক ও ছাত্ররা শিক্ষাক্ষেত্রের এই পাকিস্তানি ভূত চাপানোর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। ১৯৮৩ সালের জানুয়ারিতে এক মহাসমাবেশে এরশাদ বলে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে আল্পনা আঁকা নাকি ইসলামবিরোধী। তরুণ ছাত্ররা প্রতিদিন বিভিন্ন শহরে আন্দোলন আর প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে থাকে। ১৪ ফেব্রুয়ারি পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ স্মারকলিপি দিতে যায়। কিন্তু কাপুরুষ এরশাদ ভয় পেয়ে তার পেটোয়া বাহিনী লেলিয়ে দেয়। এমনকি শিশু একাডেমির বাচ্চাদেরও পেটানো হয়! এই আক্রমণে শহীদ হন বেশকিছু নাম জানা আর না জানা মানুষ, যাদের কথা ওপরে বলেছি। এরপর দেশে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। একসময় এরশাদ পিছু হটেন, আর সেই জঘন্য শিক্ষানীতি বাতিল হয়।

এরপর ১৯৮৭ সালের আন্দোলন আরও বেগবান হয়, পুলিশের গুলিতে নিহত হন নূর হোসেন। তার ভুল বানানে লেখা ‘স্বৈরাচার নীপাত যাক’ কথাটি এখন আমাদের ইতিহাসের অংশ। আমি তখন ছোট, কিছুই মনে নেই। কিন্তু এখন চল্লিশের কাছাকাছি বয়সে এসে অনুভব করার চেষ্টা করি পঁচিশ বছর বয়সী এই চিরতরুণ অটোরিকশাচালক দেশের জন্য যা করে গেছেন, আরো একশবার জন্ম নিলেও কি আমি তার মতো করতে পারবো? শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলনের কথা মনে আছে। স্বৈরাচার পতনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এরশাদের সন্ত্রাসীদের গুলিতে এই অসম্ভব মেধাবী চিকিৎসক ও আন্দোলনকর্মী শহীদ হন। তার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই সেই অবিস্মরণীয় সকাল, যেটি দিয়ে এই লেখাটি শুরু।

এরশাদ বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করে সেটিকে বৈধ করার জন্য সংবিধানে সপ্তম সংশোধনী এনেছিলেন। সেটি আদালতে অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম চালু করার জন্য যে অষ্টম সংশোধনী, সেটিও হয়তো অবৈধ ঘোষিত হবে।

এখন একটি বাচ্চা ছেলেও বুঝবে, বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করা এক ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহিতা। তার ওপর সপ্তম সংশোধনী বাতিল করার পর আদালত রায়ে বলেছেন, যারা এই কাজ করেছেন তাদের যেন বিচার করা হয়। তাহলে রায় হওয়ার পর গত আট বছর যে পার হলো, এই পুরোটা সময় ক্ষমতায় ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। কেন তারা এরশাদের বিচার করেনি? কারণ তারা এরশাদকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ঘোষণা করে মাথায় তুলে রেখেছে। জয়নালের হত্যার নির্দেশ দানকারী, দীপালী হত্যার নির্দেশ দানকারী, জাফর হত্যার নির্দেশ দানকারী,  আইয়ুব হত্যার নির্দেশ দানকারী, ফারুক হত্যার নির্দেশ দানকারী, কাঞ্চন হত্যার নির্দেশ দানকারী, নূর হোসেন হত্যার নির্দেশ দানকারী, মিলন হত্যার হত্যার নির্দেশ দানকারী স্বৈরাচার, বিশ্ববেহায়া, দুশ্চরিত্র এরশাদকে করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত! যার জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত কারাগারের অন্ধকারে কাটানোর কথা ছিল, তিনি বাকি জীবন নিশ্বাস নিতে পেরেছেন মুক্ত বাতাসে, যে বাতাসে শত তরুণের হৃত যৌবন আর হারানো স্বপ্নের হাহাকার মিশে আছে। এই ব্যাপারটি ঘটেছে আওয়ামী লীগ আর সরকারের বদান্যতায়।

লেখক: কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিজ্ঞানী, আয়নকিউ, মেরিল্যান্ড, সংযুক্ত শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র।

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ