আদর্শহীন দলের ভবিষ্যৎ থাকে না

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:৩১, জুলাই ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩২, জুলাই ১৭, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাজাতীয় পার্টির এক কেন্দ্রীয় নেতাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এরশাদ সাহেব তো মারা গেলেন, আপনাদের দলের ভবিষ্যৎ কী?’ তার উত্তর ছিল, ‘জানি না, আমি দল করেছি এরশাদ সাহেবের জন্য, তিনি নেই, আমিও আর দলে নেই।’ 
সাবেক সেনা শাসক এইচএম এরশাদ দল গঠন করেছিলেন সেনা ছাউনিতে। এই দলের গঠনতন্ত্র আছে, একধরনের আদর্শ উদ্দেশ্য সেই গঠনতন্ত্রে লেখা আছে, লক্ষ্যও স্থির করা আছে। কিন্তু এসবের কোনও গুরুত্ব কখনও দলের চেয়ারম্যান বা নেতাকর্মীদের কাছে ছিল না। জাতীয় পার্টি একটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন দল, যার একমাত্র মালিক ছিলেন এরশাদ। তিনি যখন ইচ্ছা করেছেন, যেকোনও পদে যখন-তখন পরিবর্তন আনতে পারতেন, এজন্য দলের উচ্চপর্যায়ে কোনও বৈঠক বা কারও মতামত নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। ব্যক্তিগত সম্পদের মতো তিনি এই দলকে ব্যবহার করেছেন এবং সম্পদ ভাগাভাগির মতো দলের মালিকানাও নিজের ভাই জিএম কাদেরকে দিয়ে গেছেন।
মানুষ রাজনীতি করে রাজনৈতিক বোধ থেকে। সেই বোধ হলো রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করা। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা কখনও সেই বোধ থেকে রাজনীতি করেননি। কারণ এই দল গণতান্ত্রিক পন্থায় তৈরি হওয়া কোনও দল নয়, তার প্রতিষ্ঠাতা স্বৈরশাসক হিসেবে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এবং সেই দলে তিনি ছাড়া আর কারও কোনও মর্যাদা বা মূল্য ছিল না। 

কিন্তু তবুও বাস্তবতা হলো, ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়েও, দুর্নীতির দায়ে জেল খেটেও এরশাদ এদেশের রাজনীতিতে শক্তভাবে প্রাসঙ্গিক থেকেছেন বড় দুই দলের সঙ্গে, যারা তার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। প্রায় ৩০ বছর ধরে জাপা টিকে আছে এবং প্রধান দু’টি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া, না যাওয়া অনেকাংশে নির্ভর করেছে দলটির সমর্থনের ওপর। অবশ্য এক্ষেত্রে এরশাদের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। তিনিও মারা গেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে জাতীয় পতাকাবাহী হয়েই।

বাংলাদেশের রাজনীতির এই দেউলিয়া চরিত্র নিয়েই এদেশের মানুষকে রাজনীতিকদের নেতৃত্ব মেনে নিতে হচ্ছে। 

সেই আলোচনা থাক। কী হতে পারে জাতীয় পার্টির, সেখানেই আলোতকপাত করা যাক। জাতীয় পার্টির প্রাণ ছিলেন এরশাদ। তার মৃত্যুতে এখন দলের শক্তি কতটুকু আছে, সেটা বোঝা যাবে শিগগিরই। এরশাদের অবর্তমানে দলীয় সংহতি কতটা অটুট থাকবে, ভবিষ্যতে জাপার রাজনৈতিক চরিত্র কেমন হবে, তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে দলের বর্তমান নেতৃত্বের কোন্দলের প্রসঙ্গ। এরশাদ বেঁচে থাকতেই আমরা দেখেছি, একেকসময় একেকজনের প্রভাব তার ওপর। ভাই জিএম কাদের আর স্ত্রী রওশন এরশাদের দ্বন্দ্ব বহুদিন ধরেই প্রকাশ্য। 

যেহেতু জাতীয় পার্টির সেই অর্থে কোনও রাজনৈতিক আদর্শ নেই, তাই এই দলের দ্বন্দ্ব এরশাদের অবর্তমানে বাড়তেই থাকবে এবং তার সমাধান হবে ভাঙনের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের নানা সময় যে ব্র্যাকেট বন্দি অবস্থা দেখা গেছে, ইতিপূর্বে তার নতুন প্রদর্শন হতে পারে এই দলে। জাপা (কাদের) আর জাপা (রওশন) হওয়ার সম্ভাবনা তীব্র। দলের নেতাকর্মীরা এই দুই ভাগে ভাগ হবেন বলেই ধারণা করছি। তৃতীয় আরেকটি ফ্রন্ট খুলতে পারে এরশাদ পুত্র এরিক এরশাদের নেতৃত্বে, যার পেছনে থাকতে পারেন সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক। 

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে ভাই জিএম কাদেরকে মনোনীত করে গেছেন এরশাদ। স্ত্রী রওশন এরশাদ তা মন থেকে মেনে নেননি বলে দলের ভেতরেই আলোচনা আছে। রওশন এবং জিএম কাদেরের অনুসারীদের মধ্যে একধরনের দূরত্ব বরাবর ছিল। এরশাদ যখন পূর্ণ সুস্থ ছিলেন, তখনই তিনি তা দেখে গেছেন। দলের সিনিয়র নেতাদের একটি অংশ, বিশেষ করে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন বাবলু, রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদরা জিএম কাদেরকে এড়িয়ে চলেন বলেই প্রতীয়মান হয়। 

এরশাদকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টি প্রায় ৩০ বছর গুরুত্বের সঙ্গে টিকে ছিল ঠিকই, কিন্তু প্রতিমুহূর্তেই বিভাজনের রেখা তৈরি করে পারস্পরিক বিরোধের ক্ষেত্র রচনা করতে দেখেছি। প্রায় সময় এরশাদ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আবার চাপে পড়ে দ্রুত সেই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছেন। যেমন একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন এরশাদ। প্রথমে জিএম কাদেরকে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা মনোনীত করেন তিনি। পরে সিদ্ধান্ত পাল্টে স্ত্রী রওশনকে ওই পদ দেন। এ কারণেই সবাই বলাবলি করছেন, এরশাদের অবর্তমানে দলের নেতৃত্বে জটিলতা দেখা দিতে পারে। 

দ্বন্দ্ব সত্য। কিন্তু দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি ঐক্যের সাধনার। জাতীয় পার্টির রাজনীতিই ছিল এরশাদকে ঘিরে, তার কারণেই দলটি এত দিন ঐক্যবদ্ধ ছিল। আদর্শহীন দলের প্রতিষ্ঠাতাবিহীন নেতৃত্বের কোনও ভবিষ্যৎ থাকে না। জাতীয় পার্টিরও নেই বলেই মনে করছি। 

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ