মমতার মাথায় কি পচন ধরেছে?

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:৩১, জুলাই ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩২, জুলাই ১৮, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীনেতাকর্মী, সংগঠন, কর্মসূচি—এই নিয়ে রাজনৈতিক দল। নেতা নেতৃত্ব দিয়ে সংগঠন গড়ে তুলবেন, তাদের দলের কর্মসূচিকে মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় করবেন, আর নির্বাচন এলে তার ওপর নির্ভর করে নির্বাচনে অবতীর্ণ হবেন, নির্বাচনে যাচাই করবেন তারা কতটুকু সফল হলেন। গত একশ’ বছর ধরে এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে এই ছিল নিয়ম। এখন উপমহাদেশে রাজনীতিতে এই নিয়ম নাকি অ্যানালগ হয়ে গেছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে এখন নির্বাচনি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার কর্মসূচি স্থির করার, প্রচার-প্রচারণা চালানোর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
প্রশান্ত কিশোর এখন ভারতের এমন এক বড় ঠিকাদার। ২০১৪ সালের ষষ্ঠদশ লোকসভা নির্বাচনে ধনবাদী গোষ্ঠী প্রশান্ত কিশোরকে ভারতীয় জনতা পার্টির তথা নরেন্দ্র মোদির জন্য নিয়োগ করেছিলেন। সম্ভবত তার প্রেসক্রিপশন অনুসারে নির্বাচন হয়েছে এবং নরেন্দ্র মোদির দল এককভাবে ২৮২ আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছিল।
নরেন্দ্র মোদি যে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর লোকসভা ভবনে গিয়ে পার্লামেন্ট ভবনের সিঁড়ি প্রণাম করে ‘ইয়েহি লোকতান্ত্রিক কা মন্দির হে’ বলেছিলেন, তাও নাকি প্রশান্ত কিশোরের শিখিয়ে দেওয়া বুলি। সম্ভবত প্রশান্ত কিশোরের ঋষিপনায় সব নকল সোনা বাজারে আসছে। কারণ সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির এমপি সংখ্যা ৩০৩ জন আর তার মাঝে ২৩০ জন ফৌজদারি মামলার দাগী আসামি। অথচ আগে এসব দাগী আসামি পঞ্চায়েতের মেম্বার হওয়ার কথাও কখনও কল্পনা করতো না।

১৯৪৬ সালের নির্বাচনে স্থির হয়েছিল মাওলানা আবুল কালাম আজাদ কলকাতা কেন্দ্র থেকে নির্বাচন করবেন। তখন বাংলা কংগ্রেসের নেতারা মাওলানা আজাদের সঙ্গে দেখা করে বেশকিছু জনসভা করার কর্মসূচি দিলেন। মাওলানা বললেন, আমি পোস্টার ছাড়া কিছুই করবো না, জনসভা করার প্রশ্নই আসে না। মানুষ মাওলানাকে ভোট দিলে দেবে, না দিলে না দেবে।

বাংলা কংগ্রেসের নেতারা এই বিষয় নিয়ে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। একথা শুনে মাওলানা আজাদ আর কলকাতা কেন্দ্র থেকে নির্বাচনই করলেন না। তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে নির্বাচন করলেন দিল্লির দরিয়াগঞ্জে নির্বাচনি কেন্দ্র থেকে। আর কোনও জনসভা, কর্মীসভা কিছুই করলেন না। শুধু এক লাইনের একটা পোস্ট দিলেন। তাতে লেখা ছিল—‘কংগ্রেস প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মার্কা চরকা’। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।

তখনকার নেতা ছিলেন দেবতার মতো। সাধারণ মানুষ কখনও চাইত না নেতারা অপমানিত হোক। এখন নেতা এমপিদের কোনও নম্বরে ফেলা যায় না। নম্বর ছাড়া রিকশার মতো। আইন-কানুন কিছুই মানে না। মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা তাদের জন্য কিছুই নেই। সম্ভবত সে কারণে প্রশান্ত কিশোরের মতো নির্বাচনি ঠিকাদারদের উদ্ভব হয়েছে।

যা হোক, আমার লেখার বিষয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মনে হচ্ছে মমতার মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে মমতা উড়ে এসে জুড়ে বসেননি। তৃণমূল থেকে কঠোর পরিশ্রম করে এই পর্যন্ত উঠে এসেছেন। প্রিয় রঞ্জন দাস মুন্সি যখন যুব কংগ্রেসের সভাপতি, তখন তার হাত ধরে যুব কংগ্রেসে প্রবেশ করেছিলেন মমতা। শেষ পর্যন্ত যুব কংগ্রেসের সভাপতিও হয়েছিলেন মমতা। বাংলার কংগ্রেসের নেতাদের কখনও সমীহ করেননি। যুব কংগ্রেস আর কংগ্রেসের অন্তঃকলহে বামফ্রন্ট বারবার ক্ষমতায় মুখ দেখেছিল। পশ্চিমবঙ্গে মমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসে টিকতে পারেননি তিনি। কংগ্রেসে প্রবীণ নেতা সমাবেশ বেশি, সুতরাং তার সিরিয়াল আসতে সময় নেবে ভেবে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন। বুদ্ধিটা খারাপও করেননি।

বিজেপি নেতৃত্বাধীন অটল বিহারি বাজপেয়ির মন্ত্রিসভায় রেলমন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা। তার হাত ধরেই বিজেপি পশ্চিমবাংলায় প্রবেশ করেছে। খাল কেটে কুমির এনেছেন মমতা নিজেই। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস আসন পেয়েছে ২২টা, অথচ ষষ্ঠদশ লোকসভা তার আসন ছিল ৩৪টি। এবার বিজেপি পেয়েছে ১৮টি আসন। মমতা স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এবার তিনি দিল্লির মসনদে বসবেন।

সোনিয়া গান্ধীর প্রাণান্ত প্রয়াণের পরেও মমতা আর মায়াবতীর কারণে বিজেপি বিরোধী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে নির্বাচনি জোট করতে পারেনি কংগ্রেস। এবারে নির্বাচনে কংগ্রেস ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পেয়েছে ৫১টি, অথচ ষষ্ঠদশ লোকসভায় বিজেপি এই ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পেয়েছিল ২৮২টি। মমতা আর মায়াবতীর লোভ শুধু বিরোধী দলকে নয়, সমগ্র ভারতের জন্য এক ভয়াবহ বিপদ ডেকে এনেছে।

যাহোক, ২০২১ সালে পশ্চিমবাংলার বিধানসভা নির্বাচন। অবশ্য নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহরা ইচ্ছে করলে পশ্চিমবাংলার অন্তর্বর্তী নির্বাচনের আয়োজন করতে পারেন। কারণ মমতার দলের বিধায়করা যেভাবে বিজেপিতে যোগদান করছেন, তাতে তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো কোনও বিচিত্র ব্যাপার নয়।

মমতা এখন পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রিত্ব ঠিক রাখার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তিনি এবার তার অফিসিয়াল কার্যালয় নবান্নে নির্বাচনি ঠিকাদার প্রশান্ত কিশোরকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। মমতা, তার ভাইয়ের ছেলে অভিষেক আর প্রশান্ত কিশোরের মাঝে একান্ত বৈঠক হয়েছে। সম্ভবত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে কলকাতার নজরুল মঞ্চে মমতা তার দলের কাউন্সিল ডেকেছিলেন। সমগ্র রাজ্য থেকে তিন হাজার কাউন্সিলর নজরুল মঞ্চে সমবেত হয়েছিলেন। মমতা তার বক্তৃতায় দলের কর্মীদের বললেন, যারা এতদিন মানুষের কাছ থেকে ‘কাটমানি’ খেয়েছেন, তারা সবাই এবার কাটমানি ফেরত দিন।

কর্মীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ কোনও বিরোধী দলের নয়, তৃণমূল প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। কাটমানির অভিধানিক অর্থ যাই হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে সরকারি প্রকল্পের অনুমোদন দিতে, পরিষেবা পেতে জনপ্রতিনিধি বা ক্ষমতাবান নেতার হাতে যে টাকা তুলে দিতে হয়, তাকে কাটমানি বলা হচ্ছে। বামফ্রন্ট আর তৃণমূল কংগ্রেস কাটমানি, তোলাবাজির দল। গত ৪০ বছরব্যাপী তারা এ বাণিজ্য করেছে। এ টাকা ফেরত দেওয়া কি সহজ ব্যাপার! এমন লাওয়ারিশ টাকার হিসাব কি কেউ কোনোদিন রাখে!

থানায় একটা মামলা করতে গেলেও আগে বামফ্রন্টের সময় বামফ্রন্ট আর তৃণমূলের সময় তৃণমূলের স্থানীয় ক্যাডারদের ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। না হয় থানা মামলা নেয় না। বামফ্রন্ট ৩২ বছর আর তৃণমূল কংগ্রেস গত ৮ বছর এই নিয়মে রাজ্য চালিয়েছে। অথচ স্বাধীনতার পর কংগ্রেস ২৩ বছর রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু তাদের কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, তোলাবাজি, কাটমানি—কোনও কিছুর অভিযোগ এই মাত্রায় ছিল না।

কংগ্রেস থেকে বামফ্রন্ট ক্ষমতা নিতে পেরেছে সৈয়দ বদরুদ্দোজার কারণে। সৈয়দ বদরুদ্দোজা ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা। ১৯৪৭ সাল থেকে তিনি বিধানসভার এমএলএ ছিলেন। তিনি অনেকবার লোকসভারও এমপি ছিলেন। তার বন্ধু ছিলেন জ্যোতি বসু। বদরুদ্দোজার সমর্থনের কারণে জ্যোতি বসু বিধানসভায় জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। কংগ্রেস মুসলিম ভোটব্যাংক হারিয়েছিল বলে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল।

মমতা নাকি কাটমানি ফেরত দেওয়ার কথা বলেছেন নির্বাচনের ঋষি প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শে। প্রশান্ত কিশোর নাকি মমতাকে বলেছেন তার সার্ভে মতো তৃণমূলের কর্মীরা নাকি বিজেপির দিকে ঝুঁকে আছে। আর তারা তোলাবাজির কারণে অজনপ্রিয় হয়ে গেছে। সুতরাং তাদের সর্বনাশ করে বিদায় দেওয়া উচিত হবে। মমতা নজরুল মঞ্চে কাউন্সিল থেকে তাই করলেন। এখন জেলায় জেলায় তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শাণ দিতে কাটমানি বিরোধী মিছিল হচ্ছে। সর্বশেষ বিজেপিও মিছিল বের করেছে।

পশ্চিমবাংলার বড় তোলাবাজ মুকুল রায় তো এখন বিজেপিতে। মুকুল রায় মমতার দীর্ঘদিনের সঙ্গী ছিলেন, ডান হাত বলা চলে। তিনি মমতার আদ্যোপান্ত অনেক কিছুই জানেন। বিধানসভায় অধিবেশনেও কাটমানির কথা উঠেছে। বিরোধী বিধায়করা মমতাকে সেখানে কাটমাটি লেখা প্ল্যাকার্ড দেখাচ্ছে। সম্ভবত মমতা কর্মীশূন্য হয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচন হচ্ছে ২০২১ সালে। এত স্বল্প সময়ের মধ্যে দল গুছিয়ে জিতে আসা খুবই কঠিন হবে মমতার জন্য।

কাটমানির অভিযোগ কর্মীদের বিরুদ্ধে। মমতা নিজেই তো ক্লিন ইমেজের নন। তার বিরুদ্ধেও অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, যা সিবিআই তদন্ত করছে। সিবিআই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। মমতার মতো এসব নেতার হাতে পড়ে ভারতীয় রাজনীতি তার সৌন্দর্য হারাচ্ছে। আর বিজেপির হাতে পড়ে ভারতের সংহতি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ