ড. জাফর ইকবালের ‘চেরি পিকিং’

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৭:০৪, জুলাই ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৪, জুলাই ২০, ২০১৯



ডা. জাহেদ উর রহমান‘ন্যাড়া একবারই বেল তলায় যায়’ প্রচলিত প্রবচনটিকে আমার কাছে মাঝেমাঝেই অসম্পূর্ণ বলে মনে হয়। জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ন্যাড়া বারবারও বেল তলায় যায়, যদি সে বোকা হয়। আমার মনে হয় প্রবচনটা হওয়া উচিত ‘বুদ্ধিমানেরা একবারই বেল তলায় যায়’। ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল একজন খুব বুদ্ধিমান মানুষ, তাই তিনি বেলতলায় আর দ্বিতীয়বার যাননি। তার সাম্প্রতিক কলাম ‘বিভ্রান্ত হওয়া না হওয়া’ পড়ে আমার সে রকমই মনে হয়েছে।
ইন্টারনেট আসার পরে একটা ‘বিপদ’ হয়েছে, বিশেষ করে বিখ্যাত মানুষদের সব কার্যকলাপ মোটামুটি থেকে যায়। কেউ একটু কষ্ট করে খোঁজাখুঁজি করলে আগের অনেক কিছুই পেয়ে যাবে। নিজে কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও ড. জাফর ইকবাল সেটা মুহূর্তের জন্য সম্ভবত ভুলে গিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়া নিয়ে দারুণ উদ্বেল হয়ে একটা লিখা লিখতে না লিখতেই ‘দুষ্টু ছেলে’রা তার কিছুদিন আগেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে তার বক্তব্য নিয়ে এসে দারুন বিদ্রূপ করেছিল।
তাই এবার তিনি আর সেই পথে হাঁটেননি। এবার আমার মনে হয়েছে সরকারকে রক্ষা করার বক্তব্য তিনি নিয়ে এসেছেন কৌশলে, একেবারে সরাসরি তার বক্তব্য না জানিয়ে। তিনি ‘বিভ্রান্ত’ বলে এই সময়ের ভয়ঙ্কর এবং জনজীবনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উদাহরণ, যুক্তি ও কোনও ক্ষেত্রে ‘জাস্ট’ আবেগ ব্যবহার করে সরকারের পক্ষে মাঠে নামার চেষ্টা করেছেন বলেই আমার মনে হয়েছে।

ড. জাফর ইকবালের কলামটি দেখলে খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তিনি ‘কনফার্মেশন বায়াস’ এ আক্রান্ত। এই কারণেই ‘ঘাড় ধরে’ নিজের হাইপোথিসিস প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘চেরি পিকিং’ করেছেন, অর্থাৎ অনেকগুলো তথ্য বা ডাটা থেকে নিজের পছন্দসই কিছু ডাটা নিয়ে নিজের বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। কোনও সন্দেহ নেই অনেক মানুষ বিশেষ করে কম বয়সীরা তার কলামটি পড়ে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।

১. ‘চেরি পিকিং’-এর প্রথম উদাহরণ হচ্ছে বাংলাদেশের ধর্ষণের প্রসঙ্গে সুইডেনের ধর্ষণের ডাটা দেওয়া। তিনি বলেছেন সুইডেনের ধর্ষণের হার দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়েছেন। চাইছেন সমাজবিজ্ঞানীরা তাকে এটা একটু বুঝিয়ে বলবেন। দুঃখের ব্যাপার যে তথ্যটি তিনি নিয়েছেন, সেটা একটু যাচাই করে নিলেই হতো। ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখতে পারতেন সুইডেনে ধর্ষণের হার কেন এত বেশি। সুইডেনের ধর্ষণের হার পৃথিবীতেই খুব বড় আলোচনার বিষয়।
সুইডেনের ধর্ষণ আইন শুধু ইউরোপ নয় সারা পৃথিবীতে সবচেৎেয় নারীবান্ধব আইন হিসেবে স্বীকৃত। এই আইনে এমন সব বিষয় আছে যেটা বাংলাদেশে বসে কল্পনা করাও কষ্টকর। যেমন আর সব সভ্য দেশের মতো সুইডেনেও ম্যারিটাল রেইপ হিসেবে স্বীকৃত। সুইডেনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় যৌনাঙ্গের স্পর্শ বা প্রবেশ করার প্রয়োজন নেই, যে কোনও ধরনের সেক্সচুয়াল ফিজিক্যাল কন্ট্যাক্ট ধর্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে এখানে। কোনও ব্যক্তি যদি কোনও নারীকে একই ধরনের শারীরিক যৌন হেনস্থা একাধিক বার করে, তাহলে মামলার সময় ততগুলো ধর্ষণের মামলা হবে, এমনকি অন্যান্য পশ্চিমা দেশেও এসব ক্ষেত্রে একটা মামলাই হয়।

সুইডেনের ধর্ষণের সাম্প্রতিক আইনটিতে নারী যদি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে যৌন মিলনের অনুমতি না দেন, তাহলে যৌন মিলনের সময় যদি তারা কোনও বাধা না দিয়ে থাকলেও নারীটি পরবর্তী সময়ে এই যৌন মিলনকে ধর্ষণ হিসেবে মামলা করতে পারেন। এই পরিসংখ্যানও খুব ভালোভাবে আছে, সুইডেনে যেসব ধর্ষণের অভিযোগ আসে, তার একটা বড় অংশ দেশটিতে জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষদের দ্বারা সংঘটিত হয় না, এটা ঘটে বাইরে থেকে যাওয়া মানুষদের দিয়ে।

সর্বোপরি বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে ধর্ষণের মতো বড় অপরাধও সামাজিক লজ্জা এবং ক্ষমতাশালীদের নানা চাপের কারণে মানুষ প্রকাশ করে না, সেখানকার পরিসংখ্যান সুইডেনের মতো একটা উন্মুক্ত, অসাধারণ গণতান্ত্রিক সমাজের পরিসংখ্যানের তুলনীয় হতে পারে না।

২. এক সময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে থাকলেও ইদানিং নাকি তিনি আগের মতো বিচলিত হন না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘ক্রসফায়ারের কথা শুনতে শুনতে গা সওয়া হয়ে গেছে নাকি অপরাধের মাত্রা আমার যুক্তিতর্ককে আবেগ দিয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলছে বুঝতে পারি না’। ‘আমি কোনোভাবেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থন করতে পারি না কিন্তু... এবং যদি...’ বিনা বিচারে হত্যা নিয়ে এই ধরনের বয়ান আমাদের শিক্ষিত সমাজে এই বর্বরতা শুরু হওয়ার সময় থেকেই আছে।

তিনি কোনোভাবেই এই প্রশ্ন তোলেন না, একটি দল যখন এমন সর্বময় ক্ষমতা নিয়ে গত ১০ বছরের বেশি এক নাগাড়ে ক্ষমতায় আছে, তখন আইনের বা পুলিশের যে সব ঘাটতি/ত্রুটির কারণে অপরাধীদের সঠিক শাস্তি অনেকক্ষেত্রে হয় না, সেগুলোর ব্যাপারে সরকার পদক্ষেপ না নিয়ে মানুষকে কেন এভাবে বিনা বিচারে হত্যা করে যাচ্ছে? এভাবে বিনা বিচারে মানুষ খুনের মাধ্যমে কেন রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, সেটার জবাবদিহি রাষ্ট্রের একজন মালিক হিসেবে সরকারের কাছে চান না।

৩. তিনি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও কথা বলেন। তিনি লেখায় বলেন, ৮০ শতাংশ মানুষ বাসায় সরাসরি ব্যবহার করে না। তাই তিনি ২০ শতাংশ সুবিধাভোগীর জন্য এই ব্যাপারে মাথা ঘামাতে চান না। পরে অবশ্য ‘ব্র্যাকেট’-এর মধ্যে বলেছেন, গ্যাস ব্যবহার করে যেসব সেবা তৈরি হয় সেগুলোর ব্যাপারে তথ্য পেলে তিনি আবার ভাববেন।

ড. জাফর ইকবাল বিজ্ঞানের মানুষ। তার না জানার কোনও কারণ নেই বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পোৎপাদন এবং পরিবহনে গ্যাসের প্রয়োজন কতটা। তাই গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি কীভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে পারে এবং দুই ধরনের ইনফ্লেশনের মধ্যে কস্ট-পুশ ইনফ্লেশনের পেছনে যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রধানতম কারণ এটা তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন। আর এই দেশে একটা ছুঁতো পেলে দাম যতটুকু বাড়ার কথা, তার কয়েক গুণ বেশি বাড়ে সেটাও নিশ্চয়ই ভুলে যাননি তিনি। তাই এই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব জনজীবনে কত বড় হয়ে আসবে, সেটা তার মতো খুব বুদ্ধিমান মানুষ তো বটেই, খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান-সম্পন্ন মানুষও জানেন।

এছাড়া, যে এলএনজিকে দেখিয়ে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে সেই এলএনজির দাম গত ছয় মাসে অর্ধেকে নেমে এসেছে। যখন আমরা গ্যাসের মূল্য বাড়াচ্ছি ভারত তখন গ্যাসের মূল্য কমাচ্ছে। পত্রিকাতেই এসেছে ক্যাবের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন শুধু একটা বিতরণ কোম্পানি তিতাসের দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে গ্যাসের দাম না বাড়িয়েও সম্পূর্ণ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।

তাই গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সরকার যে সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে, তার মধ্যে বিভ্রান্তির কিছু কিন্তু ছিল না।

৪. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা দিয়ে তিনি তার লিখার মূল অংশটা শুরু করেছিলেন। গণতন্ত্র নিয়ে শিশুসুলভ কিছু প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেয়েছেন। বর্তমান সময়ের আলোচিত দুই জন নরেন্দ্র মোদি আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার উদাহরণকে ভিত্তি করে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র খুবই ভালো, কিন্তু তারপর থেমে গিয়ে মাথা চুলকাই বাক্যটা কীভাবে শেষ করবো বুঝতে পারি না।’

এখনও অসাধারণ গণতান্ত্রিক ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের কথা আমি বলছি না, বলছি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো এক সময়ের কর্তৃত্বপরায়ণ দেশের কথা যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে মুক্ত গণতান্ত্রিক হওয়া বইছে। আমাদের অনেকের কাছে অবাক লাগবে জেনে পৃথিবীর সবচেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধপীড়িত অঞ্চল সাব-সাহারার আফ্রিকায় গত এক দশকে গণতন্ত্রের সার্বিক উন্নতি হয়েছে। এইসব দেশে শুধু অবাধ নির্বাচন না, গণতন্ত্রের সব সূচকই উন্নত হয়েছে।
খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে, পৃথিবীতে নিখুঁত সিস্টেম বলে কিছুর অস্তিত্ব নেই। গণতন্ত্রের প্রবক্তা এবং এর দৃঢ় সমর্থনকারীদের কেউ দাবি করেন না যে, গণতন্ত্র নিখুঁত কোনও শাসন ব্যবস্থা। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘হাউ ডেমোক্রেসিজ ডাই’ গ্রন্থের লেখকদ্বয় স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিবলাট দেখিয়েছেন, গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যেই কোনও এক সময় ডেমাগগ এর উত্থান ঘটতে পারে এর বীজ গণতন্ত্রের মধ্যেই নিহিত থাকে। যার ফলে এক সময় গণতন্ত্র নিজেই সংকটে পড়ে যায়। তাদের বিচারে একটা গণতন্ত্রের একটা অন্তর্গত সংকট। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, একটা সমস্যা দেখিয়ে তারা কিন্তু গণতন্ত্র নিয়ে ‘যদি-কিন্তু’ করেননি, তারা এই প্রবণতার কারণ দেখিয়েছেন বরং পথ দেখিয়েছেন কীভাবে এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা যায়। সেই সমাধান অবশ্যই কোনোভাবেই গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে নয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সংশয় তৈরি করার মাধ্যমে ড. জাফর ইকবাল আসলে বর্তমান সরকারের তথাকথিত উন্নয়ন দেখিয়ে মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারটুকু হরণ করে ফেলার যে প্রোপাগ্যান্ডা তাতেই শামিল হয়েছেন আমার মনে হয়। অবাধ নির্বাচন হলে ক্ষমতায় কে না কে আসে তাই রাতে সিল মেরে হলেও আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় থাকুক, তার ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা কথাগুলোর মানে এটাই।

‘যতই আমার বয়স বাড়ছে আমি ততই নিজের ভিতর একটা পরিবর্তন লক্ষ করছি [...] এখন যখন বয়স হয়েছে, তখন আবিষ্কার করছি, কোনও বিষয়েই আর পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারি না।’ এই দেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি কট্টর কমিউনিস্ট রাজনৈতিক নেতা বা ইন্টেলেকচুয়াল বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একেবারে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা জীবনের বিশ্বাস-সংগ্রামের সঙ্গে চরম বৈপরীত্য খুব অপরিচিত নয় আমাদের দেশে। ড. জাফর ইকবালেরও এমন পরিবর্তনই দেখছি আমি।

একজন শিক্ষাবিদ ও অ্যাকটিভিস্ট হিসাবে ড. জাফর ইকবাল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে একজন উচ্চকণ্ঠ মানুষ। তার আলোচ্য কলামের শেষেও সেটার নজির আছে। তিনি নিশ্চয়ই জানেন আরও কিছু চেতনার সঙ্গে গণতন্ত্রও মুক্তিযুদ্ধের এক মৌল চেতনা। কিন্তু তিনি এমন একটি সরকারের পক্ষে এখন কলম ধরেন যে সরকারটি ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থেকে গিয়ে অথরিটারিয়ানিজমের চৌহদ্দি পার হয়ে প্রায় টোটালিটারিয়ান চেহারা নিয়েছে।

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ