‘মিন্নি’ কোনও সরল আখ্যান নয়

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৬:৪১, জুলাই ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৩, জুলাই ২০, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহসকল অপরাধের পেছনেই আখ্যান থাকে। রকমারি আখ্যান। যার বেশিরভাগই লোকমুখে প্রচার পায়। তৈরিও হয় লোকের মুখে মুখে। প্রচার পাওয়া একেক আখ্যান শুনে অপরাধের কারণ এবং পেছনের কুশীলবদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সাধারণ জনতা। এক গল্প এসে আরেক গল্পকে ভুল প্রমাণিত করে। আম মানুষেরাও দ্রুত পাল্টে ফেলে তাদের সিদ্ধান্ত। খানিক আগেই অপরাধী বা ঘটনার ভিলেন যে, নতুন গল্প এমন নাটকীয় মোড় এনে দেয় যে মুহূর্তেই ভিলেন বনে যান নায়ক। আর নায়ককে ছুড়ে দেওয়া হয় ঘৃণার আঁস্তাকুড়ে। বরগুনার রিফাত, নয়ন এবং মিন্নিকে নিয়ে তেমন আখ্যানই লোকমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিত্যনতুন গল্প।
এখানে বলে রাখা দরকার, প্রযুক্তির কল্যাণে অপরাধ ঘটে যাওয়ার সময়কার ছবি বা ভিডিও এখন দ্রুত জনসম্মুখে চলে আসে। সেই ছবি, ভিডিও অবলম্বনেও গল্প তৈরি হয়। মজবুত গল্প। কারণ ছবি তো মিথ্যা বলে না! দৃশ্যমান বা ধারণ করা ছবিকে সত্য মানলেও, এই ছবি বা ভিডিওর পেছনেও কিন্তু অনেক সত্য থাকে। সেই বাস্তব সত্য ছবিতে অনেক সময়ই ছায়া ফেলে না। ফলে ছবি দেখে সাধারণের ভাবনায় যে গল্প তৈরি হয়, তা প্রকৃত অর্থেই গল্প হয়ে ওঠে। আমরা যখন প্রথম রিফাতের ওপর আক্রমণের ছবি দেখতে পাই গণমাধ্যম এবং ফেসবুকে, তখন আমাদের কাছে উপস্থাপিত গল্পটি ছিল এমন—সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে স্বামীর জীবন বাঁচাতে পারলেন না স্ত্রী। যে ছবিগুলো প্রকাশিত হলো, তাতে আম জনতা দেখতে পেলেন—একজন অসহায় স্ত্রী কিভাবে স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে লড়াই করছেন। গণমাধ্যম ও ফেসবুকে ওই স্ত্রীর গুণকীর্তন প্রবাহিত হতে থাকে। তবে এই আখ্যান দীর্ঘায়ু হলো না। ধীরে ধীরে নতুন নতুন গল্প প্রকাশ পেতে থাকে।

রিফাতের স্ত্রীর সঙ্গে অভিযুক্ত নয়ন বন্ডের পূর্ব ও বর্তমান সম্পর্ক। রিফাতের সঙ্গে নয়নের বিরোধ। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে রিফাত, নয়নদের ঘনিষ্ঠতা। মোবাইল ছিনতাইয়ের মতো নানা গল্প উড়তে থাকে বরগুনাসহ দেশের আকাশে-বাতাসে। এরই মধ্যে নয়ন নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে। পরের গল্পটা গতানুগতিক। অনেক সত্য গল্প আড়াল করে নয়নের মৃত্যু হয়। এরপর সকল গল্প তৈরি হতে থাকে মিন্নিকে ঘিরে। স্বাদু গল্প। মিন্নি আটক হয়। তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। পুলিশ তাদের মতো করে গল্পের চিরকুট প্রকাশ করতে থাকে। আমজনতা সেই চিরকুট ধরে মহাআখ্যান তৈরি করে চলছে। এই আখ্যান কেবল ফেসবুক বা আড্ডার জনতাই তৈরি করছে না। তৈরি করছে গণমাধ্যমও। সেই আশির দশকের রিমা হত্যা মামলার  ‘মুনির-খুকু’র সময়ও এমনটা দেখা গেছে। সকলে যেন এই ঘটনা থেকে যৌন রস আস্বাদে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে মিন্নি-রিফাত ও মিন্নি-নয়নের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় এমনকি মিন্নি ব্যবহার্য কাপড়-কসমেটিকসও গল্পের উপকরণ হয়ে উঠেছে।

রিফাত হত্যায় কে বা কারা জড়িত, এই হত্যায় মিন্নির ভূমিকা কী ছিল? এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে আদালত থেকে। এখন রিমান্ডে থাকা মিন্নির যে বক্তব্য দেয়ালের বাইরে আসছে, তা নির্ভর করে গল্প তৈরিও অবিবেচকের কাজ। কারণ অতীতে বহু অপরাধের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় অভিযুক্ত বা আটককারীর কাছ থেকে সুবিধাজনক বক্তব্য আদায় করা হয়ে থাকে। পরে আদালতের কাছে গিয়ে বিষয়টি প্রকাশ পেতে দেখেছি আমরা। সুতরাং এখনই কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছা ঠিক নয়। সমস্যা হলো সমাজে যে আখ্যানগুলো প্রচার পায়, তা কিন্তু কোনও কোনও ক্ষেত্রে তদন্তে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও কোনও পক্ষের প্রতি অন্ধ অবস্থান দেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিচলিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে। বিশেষ করে মূলধারাও গণমাধ্যমও যখন গল্পের ফাঁদে পড়ে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো বাড়তি চাপ অনুভব করে তাৎক্ষণিক কিছু উদ্যোগ নিয়ে ফেলে, পরবর্তী সময়ে যা ভুল বলেও প্রমাণিত হয়। এতে প্রকৃত ঘটনা ও অপরাধী আড়ালে রয়ে যায়। এই মুহূর্তে মিন্নিকে মূল অপরাধী বা নষ্ট মেয়ে বলে প্রমাণ করতে গিয়ে, সাধারণ জনতা হয়তো কোনও একটি পক্ষকে স্থায়ী ‘খালাস’ দিয়ে দিচ্ছে। খেয়াল রাখা প্রয়োজন কোনও অপরাধ সূত্রই ‘সরল’ নয়।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ