চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে!

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:৫৭, জুলাই ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৯, জুলাই ২০, ২০১৯

রেজানুর রহমানতাহলে কি একথাই প্রমাণিত হচ্ছে, চোর পালালেই বুদ্ধি বাড়ে? কুমিল্লার আদালতে প্রকাশ্যে এক আসামি অন্য আসামিকে খুন করার পর আদালতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, আদালতের ভেতরে আসামি কীভাবে ছুরি নিয়ে ঢুকলো এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে দেশের বিশিষ্টজনরা দেশের আদালতগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সব আদালতেই নিরাপত্তা বাড়ানো হবে। কাজেই আমরা এবার আশা করতেই পারি দেশের আদালতগুলোয় কিছুদিনের জন্য হলেও নিরাপত্তার ব্যাপারটি বেশ গুরুত্ব পাবে। কারণ আমাদের দেশে হঠাৎ কোথাও কোনও কিছু একটা ঘটলেই তা নিয়ে বেশ তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে তখন মনে হয় এই বুঝি সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেলো। কিন্তু কিছুই ঠিক হয় না। এ যেন পুকুরের পানিতে ঢিল ছোড়ার মতো। পুকুরের পানিতে ঢিল ছুড়লে কী হয়? ঢিল ছোড়ার জায়গায় পানি কিছুক্ষণের জন্য সরে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই চারপাশের পানি আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে।

কুমিল্লার আদালতে প্রকাশ্যে এক আসামি কর্তৃক অন্য আসামিকে খুন করার ঘটনা উদ্বেগজনক। থানা, পুলিশ, আইন আদালতই হলো একটি দেশের সৎ, নিরপরাধ মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। বিশেষ করে আদালত তো বটেই। কারণ অসহায়, সুবিচারপ্রার্থী অসহায় মানুষ কিন্তু আদালতকেই নিরাপদ স্থান মনে করে। অথচ আদালতেই যদি প্রকাশ্যে খুনের ঘটনা ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষ ভরসা পাবে কোথায়?

দেশের সাধারণ মানুষ সত্যি এক অসহায় সময় পার করছে। খুন, ধর্ষণ, রাহাজানির ঘটনা যেন থামছেই না। ফেনীতে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হয়েছিল একটি সভ্য দেশে বোধকরি আর এ ধরনের অসভ্য ঘটনা ঘটবে না। অথচ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক মাদ্রাসায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। মাদ্রাসা শিক্ষক কর্তৃক কোমলমতি ছাত্রী ধর্ষণ হওয়ার একাধিক ঘটনা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কারণ মাদ্রাসা শিক্ষকদের আমরা শ্রদ্ধা ভরে ‘হুজুর’ বলে সম্বোধন করি। একজন মাদ্রাসা শিক্ষক সঙ্গে থাকা মানে বিশ্বাস ও ঈমান-আমলের সঙ্গে থাকা। এক কথায় তিনিই রক্ষক। অথচ রক্ষক যদি ভক্ষক হন তাহলে আমরা কার ওপর ভরসা করবো? এক্ষেত্রে তো দেখছি চোর পালালেও বুদ্ধি বাড়ে না। দেশের মাদ্রাসাসহ কোথাও কোথাও সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। দেশের যে স্থানে এ ধরনের লজ্জার ঘটনা ঘটে সেখানে হয়তো কিছুদিনের জন্য ব্যাপারটা নিয়ে বেশ হইচই হয়, তারপর পুকুরের ঢিলের মতো সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। যার ফলে সবচেয়ে অসহায় পরিস্থিতিতে পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। তাদের অসহায়ত্বের চিত্রটা খুবই করুণ। শহরে গ্যাসের দাম বেড়েছে, সঙ্গে সঙ্গে চতুর বাড়িওয়ালারা ভাড়াটেকে বাড়িভাড়া বাড়ানোর নোটিশ দিতেও শুরু করেছেন। একটার দাম বাড়লে অন্যটারও দাম বাড়বে, এই দেশে এটাই নিয়ম। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীরা এ ধরনের সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু সবকিছুরই তো একটা সীমারেখা আছে। আমাদের দেশে অনেকেই সীমারেখার কথা ভেবে দায়িত্ব পালন করেন না। বরং কীভাবে সীমারেখা লঙ্ঘন করে অবৈধ পন্থায় নিজের কাজ হাসিল করা যায়, সেই চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন। অনেকে সাধারণ মানুষকে তোয়াক্কাও করেন না। বরং সাধারণ মানুষকে ঠকানোর একটা ছুঁতো খুঁজতে থাকেন সবসময়। প্রসঙ্গক্রমে একটা মজার ঘটনা বলি। দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার কারণে বোধকরি বাজারে হঠাৎ করে মরিচের দাম বেড়েছে। ঢাকার একটি কাঁচাবাজারে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই—হঠাৎ মরিচের দাম বাড়ালেন কেন? সঙ্গে সঙ্গেই তিনি উত্তর দিলেন—গ্যাসের দাম বাড়ছে...কাজেই মরিচের দাম তো বাড়বেই...এই সাধারণ অংকটাও কি আপনি বুঝতে পারতেছেন না?

হ্যাঁ অংকটা খুবই সহজ। কিন্তু গ্যাসের দাম বেড়েছে বলেই কি মরিচের দামও বাড়বে? এটি একটা হাস্যকর যুক্তি না? এমনই কিছু হাস্যকর ঘটনা ঘটেই চলেছে আমাদের দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় গণপরিবহন রেলপথে। ঢাকা সিলেট রুটে ট্রেন দুর্ঘটনার পর দেখা গেলো সিলেট অঞ্চলের রেলপথের অবস্থা খুবই নাজুক। কোথাও কোথাও রেলের ব্রিজে বাঁশ দিয়ে স্লিপার আটকে রাখা হয়েছে। সিলেটে ট্রেন দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং শুধু সিলেট অঞ্চল নয়, দেশের সব রেলপথে ব্রিজ, কালভার্ট সংস্কার ও মেরামত করার তাগিদ দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতির তেমন কোনও উন্নতি হচ্ছে না। দেশের একটি জনপ্রিয় দৈনিকের খবরে প্রকাশ—অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের কারণে শুধু সিরাজগঞ্জেই নিহত হয়েছে ১২ জন। জানি না রেলপথ সংস্কারের তালিকায় রেলক্রসিং অরক্ষিত রাখার বিষয়টি জড়িত কিনা। দেশের রেলপথের অনেক রেলক্রসিং এখনও অরক্ষিত রয়েছে। যেকোনও মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা কি এমন কিছুর অপেক্ষায় আছি যে, দুর্ঘটনা ঘটবে তারপর আমাদের টনক নড়বে? ব্যাপারটা চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ার মতোই হয়ে যাবে না তো...?

বর্তমান সময়ে পত্র-পত্রিকা ও প্রচারমাধ্যমগুলোয় সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র হয়ে উঠেছেন বরগুনার রিফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান সাক্ষী রিফাতের স্ত্রী মিন্নি। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে আসছিলেন মিন্নি। কিন্তু ইতোমধ্যে স্বামী হত্যায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ মিন্নিকেই গ্রেফতার করেছে। পুলিশের দাবি স্বামী হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি। যদি পুলিশের দাবি সত্যে পরিণত হয়, তাহলে পারিবারিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হবে খুবই উদ্বেগজনক।

কুমিল্লার আদালত চত্বরে এক আসামি কর্তৃক অন্য আসামিকে খুনের ঘটনাটিও পারিবারিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক একটি বার্তা দিয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে পারিবারিক সম্পত্তি ভোগ দখলের নিন্দাজনক লড়াইকে কেন্দ্র করে। পারিবারিক সম্পত্তি নিজেদের কব্জায় আনার জন্য পরিবারেরই লোকজন ষড়যন্ত্র করে পরিবারের প্রধান ব্যক্তিকে হত্যা করে। এ ব্যাপারে আদালতে একটি মামলা হয়। এই হত্যা মামলার দুই আসামি পরস্পরের মামাতো ও ফুফাতো ভাই। উদ্বেগজনক ব্যাপারটি হলো—নিহত ব্যক্তি একজনের দাদা অন্যজনের নানা। দাদা এবং নানা সম্পর্কটা কতই না মধুর। অথচ শুধু সম্পত্তির লোভে তাকে হত্যা করা হলো? তার মানে কি সম্পত্তিই সব, পারিবারিক সম্পর্ক কোনও বিষয়ই না?

সম্পর্কের কথা যখন উঠলো তখন একটি অবাক করা চিত্র তুলে ধরছি। ‘তুই’ শব্দটি খুবই আন্তরিক সম্পর্ক প্রকাশ করে। আবার ‘তুই’ শব্দটিই অবজ্ঞারও কারণ হয়ে যায়। ‘তুই’ তো একটা ছোটলোক...এখানে ‘তুই’ শব্দটা ব্যবহার হয়েছে ঘৃণা ও অবজ্ঞা অর্থে। আবার ‘তুই’ আমার জানের জান...এখানে অনেক আপন ও প্রিয় বোঝাতে ‘তুই’ শব্দটি ব্যবহার হয়েছে।

কাজেই মূল কথা হলো শব্দের ব্যবহারই আসল। কে না জানেন দেশে কিশোরদের মাঝে অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। শুধুমাত্র ‘তুইতোকারি’ শব্দকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নাকি চার কিশোর খুন  হয়েছে। কী ভয়ানক ঘটনা, তাই না? এই ঘটনা পারিবারিক অবক্ষয়ের লক্ষণ।

পরিবারের কথা যখন উঠলোই, তখন মিন্নির ব্যাপারে একটু ভবে দেখুন  তো...সে যদি সত্যি সত্যি স্বামীর খুনের ঘটনায় জড়িত প্রমাণিত হয়, তাহলে পারিবারিক সম্পর্ক ও বিশ্বাসের জায়গাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? ব্যাপারটা নিয়ে কোথাও কোনও ভুল হচ্ছে না তো? পাছে না আবার চোর পালালেই বুদ্ধি বাড়ে?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ