এই মুহূর্তে জাতীয়তাবাদী শক্তির কর্তব্য

Send
শায়রুল কবির খান
প্রকাশিত : ১৪:২৪, জুলাই ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৫, জুলাই ২১, ২০১৯

শায়রুল কবির খানদেশে একটি নির্বাচনি তারিখে ‘নির্বাচনি তামাশা’ হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ নির্বাচন ২৯ ডিসেম্বর রাতেই ভোটাধিকার হরণ করে আবারও ক্ষমতা দখল নির্বাচন প্রহসনে পরিণত। জনগণ এই নির্বাচনের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে বা হবে তেমন মনে করতে পারছে না। ক্ষমতাসীনদের চাপানো জনগণের অস্থিরতাগুলো সাময়িক থেমেছে বটে কিন্তু তারা আশঙ্কামুক্ত নয়। অতীতে যে জনমত সৃষ্টি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনাগুলো সমাজের শরীরে পুরোমাত্রায় রয়ে গেছে। কারণ, জনগণ এখন চরম হতাশ। ক্ষমতাসীনদের এক নায়কতন্ত্র এছাড়া চলমান রাজনীতিতে জাতীয় জীবনের প্রধান সংকটগুলো সমাধানের কোনও কর্মসূচি দৃশ্যমান নয়, বরং সংকট ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের বিপরীতে রাজনৈতিক দলগুলো ‘জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে’ বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের কর্মতৎপরতা গতিশীল করে তোলাই হলো এই সময়ের মুখ্য দাবি। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের নামে কার্যত নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে। নাগরিকদের অধিকার ফিরে পাওয়ার ইতিবাচক একটি নানামুখী কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করার এখনই প্রকৃষ্ট সময়। যে সব ব্যক্তি-সংগঠন দেশে একটি অর্থপূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ক্রীয়াশীল করতে চান তাদের ছোটখাটো মত-পার্থক্য বিসর্জন দিয়ে ‘জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্য’ বৃহত্তর ঐক্য সৃষ্টির একটা পদক্ষেপ এখনই নেওয়া প্রয়োজন। এই গণতান্ত্রিক ঐক্য প্রচেষ্টা যেন সঠিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে, সেজন্য সামাজিক ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে কর্মকৌশল তৈরি করাও জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে।

যে নির্বাচন হয়ে গেলো, সেটি একটি উপলক্ষ মাত্র। এই উপলক্ষকে অর্থবহ কার্যকর করতে হলে লাগবে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এর মধ্যে দিয়ে তৈরি করা যাবে সৃজনশীল ও ক্রমবিকাশমান কর্মসূচি। আমাদের আশাহত জনগণের সামনে যদি আশার আলো তুলে ধরতে হয় এবং পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলোর ভুলভ্রান্তি ও নিষ্ক্রিয়তার ভেতর থেকে একটি সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি করতে হয় তাহলে অবশ্যই নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে।

দেশপ্রেমিক, চিন্তাশীল, সৎ ও মেধাবী যে সমস্ত মানুষ যাদের অবদানে দেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে, বর্তমান ব্যবস্থায় যারা অসহায় হয়ে পড়ে রয়েছেন, হাজার হাজার নিষ্ঠাবান রাজনৈতিককর্মী যারা গ্রামে-গঞ্জে, শহর-বন্দরে দিশেহারা পরিস্থিতিতে অবমূল্যায়িত হয়ে পড়ে রয়েছেন তাদের সবাইকে এই ঐক্য প্রক্রিয়ার স্ব-স্ব ক্ষেত্রে যুক্ত করতে হবে।

যে কর্মসূচিগুলো প্রাথমিক খসড়া হিসাবে নেওয়া প্রয়োজন–

সন্ত্রাস-মাদক, শিশু ও নারী নির্যাতনকে অসম্ভব করে তুলতে হবে। শহরে, গ্রাম-গঞ্জে, বাজার হাট, দোকান-পাট, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, বিমানবন্দরসহ নাগরিক প্রহরায় জনসমাগমের সব জায়গায় সালিশ কমিটি গঠন করে, তার রেকর্ডকৃত অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট বাধ্যতামূলকভাবে থানায় ডায়েরির ব্যবস্থা করা।

সবার সম্পদের জবাবদিহিতা দরকার। দুর্নীতিকে শুধু নয়, জ্ঞাত আয়ের অতিরিক্ত ব্যয়, স্বনামে-বেনামে অর্জিত সম্পত্তির জবাবদিহিতার জন্য নিয়মিত হিসাব দাখিলের ব্যবস্থা করা। প্রকাশিত তথ্য যাচাইয়ের জন্য এলাকা ভিত্তিক সমাজ-নৈতিকতার নাগরিক কমিটিকে যুক্ত রাখা এই প্রক্রিয়া ধারাবাহিক থাকলে অনেকাংশে দুর্নীতি রোধ হবে।

কৃষককে বাঁচাতে হবে। চোরাচালান রোধে বাস্তব কর্মসূচি লাগবে। ভূমি সংস্কার ও ভূমি উদ্ধারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।

ফারাক্কা ও তিস্তার প্রভাবে মরুকরণ রোধের জন্য খাল খনন ও নদী খননের মধ্য দিয়ে পানির নিশ্চিত সরবরাহ করতে হবে। সারাদেশে নগর, শহর ও গ্রামে-গঞ্জে বিশুদ্ধ পানির জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।

শহরের সঙ্গে গ্রামীণ উন্নয়নের ভারী শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। দেশে সার্থক শিল্প উন্নয়নের স্বার্থে জাতীয় উন্নয়নে কর্মকৌশল লাগবে। দেশ প্রেমিক শিল্পদ্যেগী শ্রেণির উদ্ভব ঘটাতে হবে।

গ্রামীণ অবকাঠামোর পরিবেশ সযত্ন রেখে বিন্যাস করতে হবে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গুণগত শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শিক্ষানীতির আমূল পরির্তন দরকার। জাতীয় সরকারের ক্ষমতার এখতিয়ারে বিকেন্দ্রীকরণে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

যে কোনও দলের অভ্যন্তরে আন্তঃদেশীয় ও সংসদসহ সব প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড অহিংস, শান্তিপূর্ণ, সহনশীল গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চালু রাখতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা রাখতে হবে।

উপজাতী জন্মসূত্রে পেশাজীবী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিম্নস্তরে কর্মজীবী, বৃদ্ধ নারী শিশু এতিমসহ সবস্তরে মানুষ্য মর্যাদা নিশ্চিত রাখা। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বাহিরে গুটিকয়েকের সুবিধার্থে ব্যয়বহুল হাসপাতাল নির্মাণের বদলে গ্রামে-গঞ্জে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো জনস্বাস্থ্যের অর্থবহ ব্যবস্থা করতে হবে।

পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে নারীর সর্বজনীন পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন দরকার। পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গতিশীল পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজন। জনস্বার্থে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষের অবাধ চলাচলে মৌলিক অধিকারের কোনও রকম বাধাসৃষ্টি, পথ আগলে চাঁদাবাজি, নানান অপকৌশলে কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত না করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাধান করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বিরজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই প্রাথমিক কর্মসূচিগুলো দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণের কিছু কিছু প্রতিফলন থাকলে আধুনিক স্বনির্ভর গতিশীল গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

লেখক: সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংসদ

 

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ