বিশ্বাসের সরলতা

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৭:৩৭, জুলাই ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৮, জুলাই ২১, ২০১৯

আমীন আল রশীদসরকারি কর্মচারীদের সবচেয়ে বড় অস্ত্রের নাম ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’। যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনও সদস্য প্রকাশ্যে কোনও নাগরিককে গুলি করে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, তাহলে তদন্ত রিপোর্টে উক্ত অপরাধকে  ‘সরল বিশ্বাসে কৃত’ কিংবা ‘আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি’ বলে উল্লেখ করে অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেওয়া সম্ভব।
মূলত সব আইনের শেষাংশে এই ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বিষয়টি যুক্ত করে গণকর্মচারীদের সুরক্ষা দেওয়া হয়। এমনকি নাগরিককে তথ্য দিতে বাধ্য করার বিধান ‘তথ্য অধিকার আইন’ও যদি কোনও কর্মকর্তা জেনে-বুঝে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে লঙ্ঘন করেন, তারপরও তার এই কাজকে সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ বলে প্রমাণ করা সম্ভব এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা আইনের এই ধারাবলে সুরক্ষা পেতে পারেন।
সুতরাং ‘পেনাল কোড অনুযায়ী সরল বিশ্বাসে সরকারের কোনও কর্মচারী অপরাধ করলে সেটি অপরাধ নয়’ বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় বইলেও আসলে এটি নতুন কিছু নয়। জনাব ইকবাল মাহমুদ একটি পুরনো কথাই নতুন করে বলেছেন। যারা আইনের এই বিধানটি জানেন না, তারাই এটি নিয়ে সমালোচনা করছেন। আবার অনেকে জানতেন কিন্তু দুদক চেয়ারম্যানের কাছ থেকে এরকম প্রত্যাশা করেননি বলে হয়তো সমালোচনায় মুখর হয়েছেন।

যদিও ‘সরল বিশ্বাস’-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান শনিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, একটি প্রশ্নের বিপরীতে তিনি যে উত্তরটি দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি দুর্নীতি শব্দটি উচ্চারণ করেননি। 

তবে দুদক চেয়ারম্যান দুর্নীতি শব্দটি উল্লেখ করুন বা না করুন, বাস্তবতা হলো, দেশে প্রচলিত সব আইনেই সরকারি কর্মকর্তাদের সরল বিশ্বাসের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এটি কে কীভাবে ব্যবহার করবেন, তা নির্ভর করে দেশের প্রশাসনযন্ত্রে সুশাসন ও জবাবদিহিতা কতটুকু রয়েছে, তার ওপর। 

আমাদের গণকর্মচারীদের সম্পর্কে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগ, সেটি হলো, তারা জনগণের করের পয়সায় বেতন পান, সে কারণে তাদের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বলা হলেও বস্তুত তারাই জনগণকে তাদের অধীন মনে করেন। বিশেষ করে, সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাদের কতজন নিজেকে জনগণের কর্মচারী বা সেবক মনে করেন, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী  ভাবসাব দেখেও অনেক সময় সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয় যে, আসলে কে কার সেবক বা কর্মচারী!

যার করের পয়সায় তার বেতন হয়, সেই সাধারণ মানুষই প্রতিনিয়ত নানাবিধ হয়রানির শিকার হয় সরকারি অফিসে গিয়ে। বিশেষ করে সরকারি সেবাদানে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানে। ঘুষ ছাড়া কয়টি অফিসে কাজ হয়, সেটি একটি বড় গবেষণার বিষয়। কিন্তু ঘুষ দেওয়ার পরও কতজন নাগরিক নির্ঝঞ্ঝাটে তার সেবাটি পান, তাও আরেকটি গবেষণার বিষয়। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন টিআইবি অবশ্য এই ইস্যুতে মাঝেমধ্যে গবেষণা করে এবং সেসব গবেষণায় প্রাপ্ত ফল অত্যন্ত হতাশাজনক। যদিও যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে জরিপ বা গবেষণা করা হয়, স্বভাবতই তারা আত্মপক্ষ সমর্থন করে এবং নিজেদের ধোয়া তুলসিপাতা বলে দাবি করে।

গত মাসেই টিআইবির একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও দুর্নীতি কমার কোনও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ‘জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার: নীতি ও চর্চা’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রভাবের কারণে জাতীয় শুদ্ধাচারের কোনও কোনও কৌশলের চর্চা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা বেড়েছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে যোগ্যতা নয় বরং ক্ষমতাসীনদের পছন্দ প্রাধান্য পাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রসঙ্গত, কোনও মামলায় সরকারি কর্মচারীদের গ্রেফতার করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে—এমন বিধানেরও সমালোচনা আছে। কিন্তু যেহেতু রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী বলে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮-এর এই বিধান পরিবর্তন করা যায়নি। নাগরিক সমাজ, লেখক-বুদ্ধিজীবী ও টিআইবির মতো সংস্থা এই আইনের বিরোধিতা করলেও তাতে সরকার কর্ণপাত করেনি। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র বরারবরই তার কর্মচারীদের সুরক্ষা দিতে চায়।

এরকম বাস্তবতায় ১৮ জুলাই সচিবালয়ে ডিসি সম্মেলনের পঞ্চম দিনের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি সরল বিশ্বাসে কাজে ভুল করেন, তাহলে সেটা অপরাধ হবে না। এমনকি এটা বড় কিছু হলেও তা অপরাধ হবে না।’

পাঠকের মনে থাকতে পারে, গত বছরের মার্চ মাসে বরিশালে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরাপার্সনের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের কিছু ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল। যেখানে দেখা যায় ওই সাংবাদিকের পুরো শরীরে ভয়ঙ্কর আঘাতের চিহ্ন। মারতে মারতে তাকে অজ্ঞান করে ফেলা হয়। তার ওপর এই নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিলেন খোদ গোয়েন্দা পুলিশের কিছু সদস্য। ওই ঘটনায় কি অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের কোনও শাস্তি হয়েছিল নাকি ওই ঘটনাটিকে ‘পেনাল কোড অনুযায়ী ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বলে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল? এটা ঠিক যে, ঘটনার পরে অভিযুক্ত সদস্যদের ক্লোজড বা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। কিন্তু কর্মস্থল থেকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা যে আদতে কোনও শাস্তি নয়, সেটি সবার জানা।

আইন যত কঠোরই হোক না কেন, সেখানে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বলে এই যে ধারাটি থাকে,সেখানে সরকারি কর্মচারীদে দায়মুক্তির এত বেশি সুযোগ থাকে যে, যেকেউ চাইলে এটির অপপ্রয়োগ করতেই পারেন।

হাল আমলের সবচেয়ে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও এই সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধের বিধান যুক্ত আছে। ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীন দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসে কৃত কোনও কার্যের ফলে কোনও ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হইবার সম্ভাবনা থাকিলে, তজ্জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনও কর্মচারী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনও দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনও আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না।’ অর্থাৎ বায়বীয় অভিযোগে পুলিশ যদি কারও বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা নেয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হয়রানির শিকার হন, তাতে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। কারণ তিনি এটা প্রমাণ করে দেবেন যে, কাজটি তিনি সরল বিশ্বাসে করেছেন।

সম্প্রতি পুলিশের ডিআইজি মিজান এবং দুদক পরিচালক এনামুল বাছিরের ঘুষ লেনদেনের বিষয়টিও গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিতর্কের ঝড় তোলে। খবরে বলা হয়, দুর্নীতির অনুসন্ধান থেকে দায়মুক্তি পেতে এনামুল বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন ডিআইজি মিজান। এ অভিযোগে মামলাও হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এনামুল বাছির কি ওই ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন সরল বিশ্বাসে নাকি সরল বিশ্বাসে টাকাটা দিয়েছিলেন ডিআইজি মিজান?

প্রশ্ন হলো, সরল বিশ্বাসের সংজ্ঞা কী এবং এটা কে ঠিক করবেন যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কাজটি না বুঝে করেছেন? আইনে সরল বিশ্বাসের কোনও ব্যাখ্যা নেই। এটা নির্ভর করে যিনি ঘটনাটি তদন্ত করবেন এবং যিনি বিচার করবেন, তাদের ওপর। ফলে পুলিশ বা অন্য কোনও বাহিনীর সদস্য অথবা প্রজাতন্ত্রের অন্য যেকোনও পর্যায়ের কোনও কর্মচারী যদি কোনও নাগরিককে হয়রানি করেন, বিপদে ফেলেন, ফাঁসিয়ে দিয়ে পয়সা খান অথবা কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে একজন নাগরিকের জীবন বিপন্ন হয়, তারপরও ওই কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে সুরক্ষা দেওয়ার বিধান আমাদের প্রচলিত আইনেই রয়েছে। বাস্তবতা হলো, আমাদের সব আইন সরকারি কর্মচারী এবং আইন প্রয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে যতটা আন্তরিক, নাগরিককে সুরক্ষা দিতে ততটা নয়।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ