একজন স্বৈরাচার একজন ‘শহীদ’

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৫:০৩, জুলাই ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০১, জুলাই ২২, ২০১৯

মোস্তফা হোসেইনসাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মরে গিয়েও বাঁচতে পারলেন না। তাকে নিয়ে আলোচনায় মুখর দেশবাসী। কিছু কাজ করেছেন, এটা স্বীকার করেও স্বৈরাচার খ্যাতির কথা মনে করিয়ে দিতে ভুল করছেন না আলোচকরা। সমালোচনার প্রথম দিক স্থান করে নিয়েছে—তার হাতে রক্ত কতটা? ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এবং ক্ষমতায় আসার জন্য কত রক্ত তিনি ঝরিয়েছেন। আসলেই এরশাদের জন্য এটা দুর্ভাগ্যজনক। কপাল খারাপ হলে যা হয়, এই আর কী। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন তার পূর্বসূরি রক্ত ঝরিয়েও শহীদ হতে পেরেছেন, তিনি নিশ্চয়ই গাজী হবেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই জন সামরিক শাসকই তাদের পাকিস্তানি গুরু ইস্কান্দার মির্জা, আইয়ুব খাঁ ও ইয়াহিয়া খাঁ’র পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তারা দুই জনই তাদের গুরুদের অসমাপ্ত কাজ শেষ করেছেন। এবং অবশ্যই সফলভাবে। পুনরুক্তি হলেও বলতে হয়, আইয়ুব-ইয়াহিয়া যেভাবে দেশে সাম্প্রদায়িকতাবাদ প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, তাদের যোগ্য উত্তরসূরি দুই জেনারেল অনেকাংশে তাই প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশে।
জিয়াউর রহমান সর্বদলীয় গণতন্ত্রের জনক (!) হিসেবে আইয়ুব খাঁর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগসহ সব পাকিস্তানি রাজনৈতিক দলগুলোকে বাংলাদেশে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। একবারও ভাবলেন না, একাত্তরে তিনি এই অপশক্তির বিরুদ্ধেই অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর মতো ঘৃণ্য দলকেও রাজনীতিতে এনেছিলেন জিয়াউর রহমান। একাত্তরের খুনিদের প্রশ্রয় দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি, স্বাধীনতা লাভের পর যারা দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করার জন্য বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল, সেই বাংলাদেশবিরোধীদেরও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

ক্যু পাল্টা ক্যু-তে একে একে শত শত সৈনিককে জীবন দিতে হলো। নির্বিচারে মুক্তিযোদ্ধাদের খুন করে তিনি ইয়াহিয়ার অসমাপ্ত কাজটিই চালিয়ে গেলেন। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে যে ক্যুর মাধ্যমে তাকে খুন করা হয়, সেটাও যে পাকিস্তানি অপকর্মেরই ধারাবাহিকতা। আর এই খুন হওয়াটা একদিক দিয়ে বিবেচনা করলে জিয়াকে রাজনৈতিক বীরেও পরিণত করে। বাস্তবতা হচ্ছে তার এই মৃত্যু তাকে বীরত্বের আসন না দিলেও ওই যে রক্তের দাগ ছিল, তা সাময়িক মুছে দিতে সক্ষম হয়। মুক্তিযুদ্ধের বীর মেজর জিয়ার নামের সঙ্গে তার অনুসারীরা শহীদ শব্দ জুড়ে দেয়।

কিন্তু জিয়াউর রহমানের নিয়োজিত সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জিয়াউর রহমানের মতোই ক্ষমতা ছিনিয়ে নেন বিচারপতি আবদুস সাত্তারের কাছ থেকে। জিয়াউর রহমান যেমন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকাকালে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি নির্বাচন দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাবেন, তিনি রাজনীতির লোক নন, তাই ব্যারাকই হবে তার ঠিকানা। একই কথা বললেন এরশাদও। তিনিও বললেন, তিনি নির্বাচন দেবেন। দুই জনের একজনও প্রথম অবস্থায় বললেন না, তারা দল গঠন করবেন।

বাস্তবতা হচ্ছে—দুই জনই সামরিক আইন শাসক হিসেবে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে নিজেরা দল গঠনের ব্যবস্থা করলেন। জিয়াউর রহমানের মতো এরশাদও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করলেন। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় যান হেলিকপ্টার দিয়ে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে বেড়ালেন উন্নয়নের কথা বলে। আর কর্মী সংগঠিত করতে থাকলেন দল গঠন করার উদ্দেশ্যে। একপর্যায়ে জিয়াউর রহমান জাগদল তৈরি করলেন, হালুয়া-রুটি লোভী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দিয়ে। সেটিই একসময় বিএনপি নাম ধারণ করে।

এরশাদও উন্নয়নের নামে হেলিকপ্টার ও বিমানে চড়ে দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ালেন কর্মী সংগঠিত করার জন্য। তিনিও পূর্বসূরির পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন। গুরুর জাগদলের অনুকরণে জনদল তৈরি করলেন। এখানেও হালুয়া-রুটি লোভীর অভাব হলো না। তিনি দল গঠন করতে সফল হলেন। সেটিই আজকের জাতীয় পার্টি। দুটি দলই বাংলাদেশে রাজনীতি করছে।

সাম্প্রদায়িকতাবাদের দুই গুরু আইয়ুব খাঁ মুসলিম লীগকে ভাগ করে নিজে একটি অংশের নেতা হয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান আইয়ুবের মতো ক্ষুদ্র পর্যায়কে পছন্দ করলেন না। তিনি তাবৎ সাম্প্রদায়িকদের একীভূত করলেন একটি ছাতার নিচে। সেখানে আইয়ুবের মুসলিম লীগসহ জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, পিডিপির মতো ইতিহাসে কুখ্যাতদের এক মঞ্চে জায়গা দিলেন। ফলে ধর্মনিরপেক্ষতাসহ মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাগুলোর কবর হলো। সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালানোর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী একাত্তরের প্রতিশোধ নিতে থাকে। ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা হিসেবে মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এই সাম্প্রদায়িক কর্মী-নেতারা মরিয়া হয়ে ওঠে। বলা যায়, তারা কিয়দংশ সফলও হয়। সংবিধানকে সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে ঢেকে দিলেন তিনি।

এরশাদও তাই করলেন। তিনিও সাম্প্রদায়িকতাবাদে বিশ্বাসীদের দলে ভিড়িয়ে আইয়ুব-ইয়াহিয়া ও জিয়ার অসমাপ্ত কাজটিই করলেন। তিনি বিশ্বে বিরল ঘটনা ঘটিয়ে দিলেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণার মাধ্যমে। মসজিদে মাজারে গিয়ে নিজেকে ইসলামের খেদমদগার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সবটাই করলেন তিনি। কখনো কখনো এই কাজে হাস্যরসের উপাদানও সৃষ্টি করলেন। যেমন ঢাকার তারা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গেলেন তিনি। সেখানে বললেন, তিনি গত রাতে স্বপ্ন দেখেছেন তাকে তারা মসজিদে নামাজ পড়তে হবে। তাই তিনি জুমার নামাজ পড়তে এসেছেন। অথচ দুই দিন আগে থেকেই গোয়েন্দা বাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা বিধানে তৎপর ছিল সাদা পোশাকে।

এরশাদের পূর্বসূরি জিয়াউর রহমান যেভাবে মুক্তিযোদ্ধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অনেককে খুন করেছেন নিজের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য। এরশাদের ভাগ্য ভালো নিজ বাহিনীকে তিনি সুসংহত রাখতে পেরেছিলেন। যে কারণে জিয়াউর রহমান যেমন ১৯টি সামরিক অভ্যুত্থান দমন করতে বাধ্য হয়েছেন, এরশাদকে তেমন ধকল সইতে হয়নি। তিনি সেই পথে খুন করার প্রয়োজন বোধ করেননি। তার পূর্বসূরি জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ওইভাবে পড়েননি। কারণ আওয়ামী লীগকে কারাগারের গরাদে ঢুকিয়ে নিজের পথকে নিষ্কণ্টক করেছিলেন। আর তার ঐতিহাসিক বাণী রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করার কাজটি তিনি সফলভাবেই সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। এদিক থেকে এরশাদ দুর্ভাগা। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী দলগুলো এরশাদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হতে থাকে। এমনকি তার পূর্বসূরি জিয়াউর রহমানের দল বিএনপিও গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে। বলতে গেলে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সৃষ্ট দলটি গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে পরিবর্তিত হয় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। ছোট দলগুলোও এরশাদের বিপক্ষে যায় সঙ্গত কারণেই। (বলতেই হবে, জিয়াউর রহমান সামরিক সরকারের ছায়ায় বিএনপি সৃষ্টি করলেও খালেদা জিয়া কিন্তু গণতান্ত্রিকভাবেই ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন।)

সম্মিলিত রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখে এরশাদকে পদত্যাগ করতে হয়। এবং পরবর্তী অধ্যায়ে গণতান্ত্রিক সরকারই প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে। সেদিক থেকে এরশাদের বিদায়ের পরিণতিকে গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবে গণ্য করতে হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমান জামানার পরিসমাপ্তি ঘটে তারই মতো আরেক জেনারেলের ক্ষমতাগ্রহণের মধ্য দিয়ে।

এরশাদের বিদায়ের পরও এরশাদ রাজনীতিতে শেষ হয়ে যাননি। গণতান্ত্রিক দলগুলো ভোট রাজনীতির ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে এরশাদকে। বিএনপি দৌড়ে যায় এরশাদের কাছে। আহ্বান জানায় বিএনপির সঙ্গে থেকে রাজনীতি করার জন্য। ভাগ-বাটোয়ারার বিষয়টিও আলোচনা হয়। যে কারো মনে থাকার কথা—নাজিউর রহমান মঞ্জু, শামসুল ইসলাম ও খালেদা জিয়ার বৈঠকের ছবিও প্রকাশিত হয়েছিল গণমাধ্যমে। যা এখনো গুগলে পাওয়া যায়। এরশাদ হয়তো ভেবেছেন খালেদা জিয়াকে বিশ্বাস করা যায় না। কারণ খালেদা জিয়া তাকে কারাগারের বাইরে আসতে দেননি বছরের পর বছর। তিনি ঝুঁকলেন আওয়ামী লীগের দিকে। আওয়ামী লীগও দেখলো ১৬ শতাংশ ভোটের মালিক এরশাদ। তাকে ছাতার নিচে নিলে মন্দ না। কৌশলে জয়ী হন শেখ হাসিনা। এরশাদকে কাছে টানেন ভোটের রাজনীতির প্রয়োজনে।

ইতিহাস বলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয়ের কাছেই অতি প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত। এটাও বলে, দুটি দলই এরশাদকে স্বৈরাচার হিসেবে চিহ্নিত করতে কসুর করে না। তবে এরশাদকে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি একটু বেশি বলে এবং আওয়ামী লীগ হয়তো নূর হোসেনদের কথা ভুলতে পারে না, তাই নিচু স্বরে হলেও স্বৈরাচার শব্দটি উচ্চারণ করে।

রাজনীতির তুরুপের তাস হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য হচ্ছে—তার স্বাভাবিক মৃত্যু। সৌভাগ্য হচ্ছে—তিনি ক্রোধের পরিণতিতে নিজের লোকদের হাতে নিহত হননি। কিন্তু তার পূর্বসূরি জিয়াউর রহমান নিজ লোকদের হাতেই খুন হলেন। মৃত জিয়াউর রহমানের সৌভাগ্য—তিনি মৃত্যুর পর শহীদ হিসেবে পরিচিতি পেলেন। স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণকারী এরশাদকে যুগের পর যুগ বহন করতে হবে স্বৈরাচার খেতাব।

ইতিহাসের অবিচারই বলতে হবে—একই কাজের পরিণাম একজনের জন্য স্বৈরাচার খেতাব, একজনের জন্য হয় শহীদ। আসলে রাজনীতিটাই জিলিপির প্যাঁচের মতো। বড়ই প্যাঁচালো। কেউ এর প্যাঁচে পড়ে রক্তবমি করে কেউ হয়তো টিকে থাকে।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক। 

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ